মসলিন শিল্পের বিলুপ্তি: এক অন্যতম সংবেদনশীল কাপড় বোনার প্রক্রিয়ার হারিয়ে যাওয়া!
১৮৫১ সালে মসলিন ব্যবসা যখন ব্রিটিশ বণিকদের হাতে, তখন ব্রিটেনে রানী ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স আলবার্টের উদ্যোগে একটি ‘গ্রেট এক্সিবিশন’ করা হয়, যেখানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় এক লাখ চমকপ্রদ জিনিস যোগাড় করে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক বিশালতা ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির ব্যাপারে ইউরোপীয় অভিজাতদের ধারণা দেওয়া। আশ্চর্যজনকভাবে অনুষ্ঠানের আলো কেড়ে নেয় ‘ঢাকাই মসলিন’। ব্যাপক আলোচনা হয় এর সূক্ষ্মতা নিয়ে। একে আলোয় নিয়ে আসার জন্য বাহবার অংশীদার হয় ব্রিটিশ অভিজাতেরা। আর নেটিভরা থাকে প্রাদপ্রদীপের আড়ালে।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ বণিকদের আগমনের পূর্বে দীর্ঘদিন ঢাকাই মসলিনের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে মুঘলরা। বংশানুক্রমে তাঁতিরা মসলিন তৈরি করে গেছে, তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে মধ্য এশিয়া, আরব, ইউরোপীয় বণিকেরা বিপুল মুনাফায় বিক্রি করেছে। মুঘলরা আয় করেছে এ বাণিজ্যের শুল্ক থেকে। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মসলিন বোনা হতো, গুজরাট থেকে শুরু করে বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল তালিকায়। এর মধ্যে কদর বেশি ছিল ঢাকাই মসলিনেরই।
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের গোড়াপত্তন ও দিল্লীর কেন্দ্রে মুঘল শাসনের কঙ্কালসার দশার ফলে পুরো ব্যবসার চক্রটি বদলে যায়, ফুটি কার্পাস চাষি ও মসলিন তাঁতিদের স্বার্থের চেয়ে লাভের ব্যাপারটি মুখ্য হয়ে উঠে, একেকটি মসলিনের সূক্ষ্ম কারুকার্য করতে দরকার ছিল এক বছরের কাছাকাছি সময়, কিন্তু সেই তুলনায় ছিল না পারিশ্রমিক বা স্বীকৃতি। গবেষকদের ধারণা, কঠিন এবং বিশেষায়িত এই শ্রমের যোগ্য মজুরি না পেয়ে ও ঋণের বোঝায় পিষ্ট হয়ে কাজ ছেড়েছে মসলিন তাঁতিরা।
তাঁতিদের কাছ থেকে মসলিন কেনার ব্যবসাটিকে ব্রিটিশরা নিজেদের করে নেয়, দামের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তাদের হাতে। দীর্ঘ সময় নিয়ে সূক্ষ্ম কাজের পুরো সময়টায় তাঁতির হাত খালি, প্রয়োজন মেটাতে তার দরকার ঋণ, সরল চাষিদের দাদন বা অগ্রীম ঋণ দিয়ে শোষণ করার ঘটনা শুধু মসলিনে নয় সব স্থানীয় শিল্পেই ঘটেছে। এছাড়া ভারতবর্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল সরিয়ে নেওয়া। ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের ফলে মেশিনে বোনা সূক্ষ্ম বস্ত্র বাজারে আসতে শুরু করে, আর বংশানুক্রমে আঁকড়ে ধরে থাকা মসলিন তাঁতিরা পেশা পরিবর্তন করে, কেউ ঋণের চাপে, কেউ মুনাফালোভী বণিকদের অত্যাচারে হারিয়ে যেতে থাকে।
এভাবেই সময়ের সাথে ঢাকাই মসলিন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, বংশানুক্রমে কয়েকশত বছর ধরে চলে আসা মসলিনের তাঁতগুলো বন্ধ হয়ে যায়, হারিয়ে যায় পৃথিবীর অন্যতম সংবেদনশীল এক কাপড় বোনার প্রক্রিয়া।
তথ্যসূত্র:
ক। বিবিসি ফিউচার, জারিয়া গোরভেট
খ। উইকিপিডিয়া
গ। রোর বাংলা, শাহ মো. মিনহাজুল আবেদীন।
ফেইসবুক থেকে নেওয়া
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন