একাধিক বিবাহ অথবা যে কোন সুন্নত, মুস্তাহাব, মুবাহ আমল নিয়ে বাড়াবাড়ি কিংবা বিতর্ক করার পূর্বে ইমামগণের নিম্নোক্ত নীতিমালা লক্ষ্য করা উচিত:
“المسنون إذا صار شعارًا لبلدٍ أو قومٍ فمراعاةُ الألفة وتركُ التشويش أولى” —
অর্থাৎ, কোনো সহীহ সুন্নত যদি কোনো অঞ্চলের প্রচলিত আমল হয়ে যায়, তাহলে অযথা ভিন্ন পদ্ধতি চালু করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করাই উত্তম।
এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আরবি রেফারেন্স:
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন:
“وَيُسْتَحَبُّ لِلرَّجُلِ أَنْ يَقْصِدَ تَأْلِيفَ الْقُلُوبِ بِتَرْكِ هَذِهِ الْمُسْتَحَبَّاتِ؛ لِأَنَّ مَصْلَحَةَ التَّأْلِيفِ فِي الدِّينِ أَعْظَمُ مِنْ مَصْلَحَةِ فِعْلِ مِثْلِ هَذَا.”
অর্থ: “কখনও কখনও মানুষের হৃদ্যতা ও ঐক্য রক্ষার জন্য কিছু মুস্তাহাব আমল ছেড়ে দেওয়া উত্তম; কারণ দ্বীনের ঐক্যের কল্যাণ ঐ মুস্তাহাব আমল করার কল্যাণের চেয়ে বড়।”
— مجموع الفتاوى (22/407)
শাতেবী রহ. বলেন:
“النظرُ إلى مآلات الأفعال معتبرٌ مقصودٌ شرعًا”
অর্থ: “কোনো কাজের পরিণতি বিবেচনা করা শরিয়তে স্বীকৃত ও উদ্দেশ্যমূলক নীতি।”
— الموافقات (5/177)
এ নীতির ভিত্তিতে আলেমরা বলেন, সহীহ সুন্নতের একাধিক ধরন থাকলে এমনভাবে আমল করা উচিত যাতে ফিতনা, বিরোধ বা সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি না হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. থেকে বর্ণিত:
“الخلاف شر”
অর্থ: “বিবাদ/মতবিরোধ অনিষ্টকর।”
— سنن أبي داود، كتاب المناسك
এটি তিনি উসমান রা.-এর পেছনে ভিন্ন ইজতিহাদ থাকা সত্ত্বেও নামাজ পূর্ণ আদায় করার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, উম্মাহর ঐক্যের স্বার্থে।
ইবনুল কাইয়্যিম রহি. বলেন:
“فإنَّ النبيَّ ﷺ كان يحب موافقة أهل الكتاب فيما لم يُؤمر فيه بشيء؛ تأليفًا لقلوبهم”
— زاد المعاد (2/95)
এখান থেকেও আলেমরা “تأليف القلوب” তথা মানুষের অন্তর একত্র রাখার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।
এই নীতির ভিত্তি কুরআন, হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং উসূলুল-ফিকহের বহু বক্তব্যে পাওয়া যায়। বিশেষ করে যেখানে “مراعاة الألفة” (ঐক্য রক্ষা), “ترك التشويش” (বিভ্রান্তি এড়ানো), এবং “اعتبار العرف والعمل الجاري” (প্রচলিত সহীহ আমলকে বিবেচনা করা) আলোচিত হয়েছে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল:
কুরআন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا﴾
“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।”
— সূরা آل عمران : 103
আরও বলেন:
﴿وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ﴾
“তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, তাহলে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি বিলীন হবে।”
— সূরা الأنفال : 46
এ আয়াতগুলো থেকে ফুকাহা ঐক্য রক্ষার গুরুত্ব গ্রহণ করেছেন, বিশেষত ইখতিলাফে তানাও্উ‘ (বৈধ বিভিন্নতা)-এর ক্ষেত্রে।
হাদিস ও সাহাবীদের আমল
১. কাবা পুনর্নির্মাণ না করা
আয়েশা রাদি. থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
“لولا أن قومك حديثو عهد بجاهلية لهدمت الكعبة ولجعلت لها بابين”
“তোমার কওম যদি নতুন মুসলিম না হতো, তাহলে আমি কাবা ভেঙে ইবরাহীম আ.-এর ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতাম...”
— صحيح البخاري (1586), صحيح مسلم (1333)
এখানে উত্তম কাজ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের বিভ্রান্তি এড়াতে তা স্থগিত রাখা হয়েছে।
২. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও উসমান রা.-এর পেছনে নামাজ
ইবন মাসউদ রা. মিনায় চার রাকাত নামাজ পড়েন, যদিও তাঁর মত ছিল দুই রাকাত। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেন:
“الخلاف شر”
“বিরোধ অনিষ্টকর।”
— سنن أبي داود (1960)
এটি ঐক্যের স্বার্থে নিজের পছন্দের আমল ত্যাগের বড় দলিল।
৩. জামাআতে ভিন্ন কিরাআত নিয়ে বিরোধ নিষেধ।
ওমর ইবনুল খাত্তাব ও হিসাম ইবনে হাকিম-এর ঘটনায় নবী ﷺ বলেন:
“كلاكما محسن”
“তোমরা উভয়েই সঠিক।”
— صحيح البخاري (2419)
অর্থাৎ, সহীহ বিভিন্নতা থাকলে সেটিকে বিবাদের কারণ বানানো উচিত নয়।
ফিকহ ও উসূলের বক্তব্য
ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন-
“وتركُ الأفضلِ لتأليف القلوب سنة”
“মানুষের অন্তর একত্র রাখার জন্য কখনও উত্তম কাজ ছেড়ে দেওয়াও সুন্নত।”
— مجموع الفتاوى (22/268)
আরও বলেন:
“إذا كان في فعل المستحب مفسدة راجحة لم يُستحب”
“কোনো মুস্তাহাব কাজ করলে যদি বড় ধরনের ক্ষতি সৃষ্টি হয়, তবে তা আর মুস্তাহাব থাকে না।”
— مجموع الفتاوى (24/195)
ইমাম নববী রাহ. বলেন:
“المستحبات إذا أدت إلى فتنةٍ أو شقاقٍ تُركت”
“মুস্তাহাব আমল যদি ফিতনা বা বিরোধ সৃষ্টি করে, তবে তা ছেড়ে দেওয়া হয়।”
— এর অর্থবোধক আলোচনা সহীহ মুসলিম ও আল মাজমূ গ্রন্থে পাওয়া যায়:
শাতেবী রহ.
“مآلات الأفعال معتبرة شرعًا”
“কাজের পরিণতি শরিয়তে বিবেচ্য।”
— الموافقات (5/177)
এসব দলিল মিলিয়ে ফুকাহারা বলেন:
“الاختلاف في سنن العبادات إذا كانت كلها مشروعة فلا يُنكر بعضها على بعض، ويراعى ما عليه عمل الناس إذا خيفت الفتنة.”
অর্থাৎ, ইবাদতের যেসব সুন্নতের একাধিক সহীহ পদ্ধতি আছে, সেগুলোর একটিকে অন্যটির উপর অস্বীকার করা হবে না; আর ফিতনার আশঙ্কা থাকলে মানুষের প্রচলিত সহীহ আমল বিবেচনায় রাখা হবে।
এর মর্মবস্তু নিম্নোক্ত কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়:
ابن تيمية — مجموع الفتاوى (22/268, 24/195)
الشاطبي — الموافقات (5/177 وما بعدها)
ابن القيم — إعلام الموقعين ও زاد المعاد
النووي — شرح صحيح مسلم ও المجموع
বিশেষভাবে ابن تيمية-এর এই কথাটি খুব নিকটবর্তী:
“وتركُ الأفضلِ أحيانًا لتأليف القلوب واجتماع الكلمة مشروع”
(কখনও মানুষের হৃদ্যতা ও ঐক্য রক্ষার জন্য অপেক্ষাকৃত উত্তম আমল ত্যাগ করাও শরিয়তসম্মত।)
— مجموع الفتاوى 22/407 এর আলোচনার মর্ম
এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদি. -এর:
“الخلاف شر”
— سنن أبي داود
এ দুটির সমন্বয় থেকেই পরবর্তী আলেমরা এ ধরনের ফিকহি নীতিবাক্য প্রকাশ করেছেন।
বি: দ্র: ভুল হলে আলেমগণ সংশোধন করবেন।