তরকারি রান্নায় নিরাপদ কোনটা, লোহার কড়াই, এ্যালুমিনিয়ম কড়াই, স্টিল কড়াই, মাটির কড়াই,নন স্টিক কড়াই
A i এর উত্তর
। তরকারি রান্নায় কড়াই বাছার সময় শুধু দাম বা দেখতে সুন্দর দেখলে হবে না। দেখতে হবে রান্নার সময় কড়াই থেকে খাবারে কী মিশছে, কতটা গরম সহ্য করতে পারে, আর টক-ঝাল-লবণের সাথে কেমন প্রতিক্রিয়া করে। কারণ তরকারি আমরা প্রতিদিন খাই, অল্প অল্প করে ক্ষতিকর জিনিস জমলে সেটাই পরে বড় সমস্যা হয়।
*১. লোহার কড়াই*
লোহার কড়াই আমাদের দাদি-নানিদের আমল থেকে চলে আসছে, আর এখনও তরকারির জন্য এটাকে সবচেয়ে উপকারী ধরা হয়। লোহার কড়াইয়ে রান্না করলে খাবারের সাথে খুব অল্প পরিমাণে আয়রন মিশে যায়। আমাদের দেশে অনেকেরই, বিশেষ করে মেয়েদের আর বাচ্চাদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকে। তাদের জন্য এটা একটা প্রাকৃতিক উপকার।
লোহার কড়াইয়ে তরকারি কষানো খুব সুন্দর হয়। গরমটা সমানভাবে ছড়ায়, তরকারির রঙ আর স্বাদ গাঢ় হয়। মাংস ভুনা, কলিজা ভুনা, শাক ভাজি এই কড়াইয়ে সবচেয়ে ভালো হয়।
তবে এর যত্ন আছে। রান্নার পর ভিজিয়ে রাখলে মরিচা ধরে যাবে। রান্না শেষে সাথে সাথে ধুয়ে, চুলায় একটু গরম করে শুকিয়ে, সামান্য তেল মাখিয়ে রাখতে হয়। এটাকে বলে সিজনিং। নতুন কড়াই প্রথম প্রথম একটু কালচে হয়, খাবার একটু লেগে যেতে পারে। ১০-১৫ দিন ব্যবহারের পর কড়াইটা মসৃণ হয়ে যায়, তখন আর লাগে না।
একটা সতর্কতা আছে। যাদের শরীরে আয়রন জমে যাওয়ার রোগ আছে, বা ডাক্তার আয়রন কম খেতে বলেছে, তারা প্রতিদিন লোহার কড়াইয়ে রান্না না করাই ভালো। আর টক জাতীয় জিনিস যেমন টমেটো, তেঁতুল, আমড়া, আচার অনেকক্ষণ লোহার কড়াইয়ে রাখলে খাবারের স্বাদ একটু ধাতব লাগতে পারে, কড়াইও তাড়াতাড়ি ক্ষয় হয়।
*২. অ্যালুমিনিয়াম কড়াই*
অ্যালুমিনিয়াম কড়াই হালকা, দাম কম, তাড়াতাড়ি গরম হয় বলে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি চলে। কিন্তু তরকারির জন্য এটাই সবচেয়ে সতর্ক থাকার মতো কড়াই।
অ্যালুমিনিয়াম একটা নরম ধাতু। লবণ, টক, ঝালের সাথে বিক্রিয়া করে এটা খুব সহজে খাবারে মিশে যায়। বিশেষ করে টমেটোর তরকারি, তেঁতুলের টক, আমের টক, আচার, ডাল — এগুলো অ্যালুমিনিয়ামে রান্না করলে অ্যালুমিনিয়াম বেশি মাত্রায় খাবারে চলে আসে। দীর্ঘদিন ধরে শরীরে অ্যালুমিনিয়াম জমলে হাড়, কিডনি আর মস্তিষ্কের উপর খারাপ প্রভাব পড়তে পারে বলে গবেষকরা বলেন।
আরেকটা সমস্যা হলো, অ্যালুমিনিয়ামের কড়াই ঘষে মাজলে উপরের স্তর উঠে যায়, ভেতরের কাঁচা অ্যালুমিনিয়াম বেরিয়ে আসে। তখন আরও বেশি মিশতে থাকে। বাজারে অনেক অ্যালুমিনিয়াম কড়াইয়ে ভেজাল ধাতুও মেশানো থাকে, সেটা আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
যদি আপনার ঘরে অ্যালুমিনিয়াম কড়াই থাকেই, তাহলে সেটা দিয়ে শুধু পানি গরম করা, ভাত রান্না করা বা অল্প সময়ের ভাজি করতে পারেন। তরকারি কষানো বা টক তরকারি রান্না এই কড়াইয়ে না করাই নিরাপদ।
*৩. স্টিলের কড়াই*
প্রতিদিনের রান্নার জন্য নিরাপত্তার দিক থেকে স্টিলের কড়াইকে সবচেয়ে ঝামেলাহীন বলা যায়। ভালো মানের স্টেইনলেস স্টিল খাবারের সাথে প্রায় কোনো বিক্রিয়া করে না। টক, ঝাল, লবণ যাই রান্না করেন, স্টিল থেকে খাবারে কিছু মেশে না বললেই চলে।
স্টিলের কড়াইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো যত্ন লাগে না। মরিচা ধরে না, ভাঙে না, ঘষে মাজলেও নষ্ট হয় না। রান্নার পর ভিজিয়ে রাখলেও সমস্যা নেই। যারা ব্যস্ত থাকেন, প্রতিদিন রান্না করতে হয়, তাদের জন্য এটা সবচেয়ে সুবিধার।
তবে স্টিলের দুইটা দুর্বলতা আছে। এক, স্টিলে গরম সমানভাবে ছড়ায় না, তাই নিচে লেগে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তরকারি কষানোর সময় একটু বেশি নাড়তে হয়। দুই, লোহার কড়াইয়ের মতো তরকারিতে সেই ভাজা ভাজা ঘ্রাণটা স্টিলে আসে না। এই সমস্যা কমাতে এখন ট্রাই-প্লাই বা স্যান্ডউইচ বটমের স্টিলের কড়াই পাওয়া যায়, যার তলায় স্টিলের মাঝে অ্যালুমিনিয়াম বা তামার স্তর থাকে। সেগুলোতে গরম সমানভাবে ছড়ায় আর লেগেও যায় কম। কেনার সময় খেয়াল করবেন কড়াইয়ের গায়ে ১৮/৮ বা ৩০৪ লেখা আছে কিনা। এটা ভালো মানের ফুড গ্রেড স্টিলের চিহ্ন।
*৪. মাটির কড়াই*
স্বাদ আর নিরাপত্তা দুই দিক থেকে মাটির কড়াইকে অনেকেই সেরা বলেন। মাটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। এতে কোনো ধাতু বা কেমিক্যাল নেই, তাই খাবারে কিছু মেশার ভয় নেই। মাটির কড়াইয়ে রান্না ধীরে ধীরে হয়, গরমটা ভেতরে অনেকক্ষণ ধরে থাকে। এ কারণে তরকারির মসলা ভালোভাবে মিশে যায়, স্বাদ গভীর হয়। বিশেষ করে মাংসের ঝোল, খিচুড়ি, ডাল, ভুনা খিচুড়ি মাটির কড়াইয়ে রান্না করলে স্বাদ একদম আলাদা লাগে।
মাটির আরেকটা ভালো দিক হলো, এটা খাবারের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে না। বেশি তাপে রান্না হয় না বলে ভিটামিন কম নষ্ট হয়।
কিন্তু মাটির কড়াই ব্যবহারে ধৈর্য লাগে। এটা ভারী, হাত থেকে পড়লেই ভেঙে যায়। নতুন কড়াই কিনে সরাসরি রান্না করা যায় না, প্রথমে পানিতে ভিজিয়ে, তেল মাখিয়ে সিজন করতে হয়। রান্নার সময়ও হুট করে বেশি আঁচ দেওয়া যায় না, ধীরে ধীরে গরম করতে হয়। পরিষ্কার করার সময় সাবান বা তারের মাজুনি ব্যবহার করা যায় না, শুধু পানি আর নরম কাপড় দিয়ে ধুতে হয়। আর প্রতিদিনের তাড়াহুড়োর রান্নার জন্য মাটির কড়াই একটু ঝামেলার। তাই অনেকে প্রতিদিনের জন্য স্টিল বা লোহা রাখেন, আর সপ্তাহে এক-দুই দিন স্পেশাল রান্নার জন্য মাটির কড়াই ব্যবহার করেন।
একটা জিনিস খেয়াল রাখবেন, বাজারে অনেক রঙিন চকচকে মাটির পাত্রে সিসা মেশানো রঙ ব্যবহার করা হয়। সেগুলো কিনবেন না। কালো বা লালচে, ভেতরে কোনো চকচকে প্রলেপ নেই এমন মাটির কড়াই কিনবেন।
*৫. নন-স্টিক কড়াই*
নন-স্টিক কড়াই দেখতে সুন্দর, তেল কম লাগে, পরিষ্কার করা সহজ। এই কারণে অনেকেই এটা পছন্দ করেন। কিন্তু তরকারি রান্নার জন্য এটা সবচেয়ে কম উপযুক্ত।
নন-স্টিক কড়াইয়ের উপরে টেফলন নামে একটা কেমিক্যালের প্রলেপ থাকে। এই প্রলেপটা বেশি গরম সহ্য করতে পারে না। তরকারি কষানোর সময় আমরা যেভাবে হাই হিটে অনেকক্ষণ রান্না করি, তাতে এই প্রলেপ নষ্ট হতে থাকে। আর স্টিলের খুন্তি বা চামচ দিয়ে জোরে নাড়লে প্রলেপে দাগ পড়ে, উঠে যেতে শুরু করে। একবার প্রলেপ উঠে গেলে সেই কড়াই আর ব্যবহার করা নিরাপদ না, কারণ উঠে যাওয়া কেমিক্যাল খাবারের সাথে মিশে যায়।
নন-স্টিকের আরেকটা সমস্যা হলো, এতে তরকারি ভালো কষানো যায় না। তরকারি কষানোর জন্য যে গরম আর শুকনো ভাব দরকার, নন-স্টিকে সেটা হয় না। তরকারি কেমন পানসে লাগে।
তাই নন-স্টিক কড়াই শুধু ডিম ভাজি, প্যানকেক, অল্প তেলে মাছ ভাজা, এই ধরনের হালকা কাজে ব্যবহার করাই ভালো। ব্যবহারের সময় কাঠের বা সিলিকনের খুন্তি ব্যবহার করবেন, কখনোই তারের মাজুনি দিয়ে মাজবেন না, আর মাঝারি আঁচের বেশি গরম করবেন না। প্রলেপে একটুও দাগ দেখলেই কড়াইটা বদলে ফেলবেন।
*শেষ কথা হিসেবে*
আপনি যদি একটাই কড়াই কিনতে চান, যেটা দিয়ে প্রতিদিন নিরাপদে তরকারি রান্না করা যাবে, তাহলে ভালো মানের স্টিলের কড়াই নিন। স্বাদ আর স্বাস্থ্য দুটোই একসাথে চাইলে লোহার কড়াই নিন, একটু যত্ন করলেই এটা বছরের পর বছর চলবে। আর স্বাদকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিলে মাঝে মাঝে মাটির কড়াইয়ে রান্না করুন। অ্যালুমিনিয়াম আর পুরনো নন-স্টিক কড়াই দিয়ে তরকারি রান্না করাটা এখন থেকে এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ হবে।