অফিস পলিটিক্স: ৩টি অভিজ্ঞতা, কিছু পরামর্শ
বাদল সৈয়দ
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন পড়াতাম। সে সূত্রে সে আমার ছাত্র। ভালো একটি কর্পোরেট চাকরি করত। প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক প্রধানও হয়েছিল।
হঠাৎ একদিন তার মেসেজ পেলাম। সে লিখেছে- ‘স্যার, অফিস পলিটিক্সের শিকার হয়ে আমার চাকরি চলে গেছে। এখন ছোটখাট ব্যবসা করার চেষ্টা করছি। আমার জন্য দোয়া করবেন।‘
প্রায় প্রত্যেক চাকরিজীবীকে অফিস পলিটিক্সের শিকার হতে হয়। তাই ভাবলাম এ ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লিখি।
অফিস পলিটিক্স অনেক ধরনের হতে পারে। প্রথমে দুটো সত্য ঘটনা বলি।
১ ) আমার চাকরিজীবনের প্রথম দিকের ঘটনা। একজন কমিশনার একটি ভুল করলে তাঁকে সচিব মহোদয় ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ঢাকায় ডেকে পাঠালেন। কমিশনার সাহেব অবলীলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বললেন, ‘স্যার, সিদ্ধান্তটি আমার নয়, আমার এক অতি উৎসাহী ডেপুটি কমিশনারের। আমি সেটা আপনার কাছে অনুমোদনের জন্য ফরোয়ার্ড করেছি মাত্র।'
সে হতভাগ্য ডেপুটি কমিশনার ছিল আমার এক ব্যাচমেট। কাজটিতে তার কোনো ভূমিকাই ছিল না। কমিশনারের স্টাফ অফিসার হিসেবে তার অন্যতম দায়িত্ব ছিল আঞ্চলিক অফিসের চিঠিপত্র হেড অফিসে পাঠানো। সে শুধু সেটাই করেছিল।
কমিশনার সাহেবের কথা শুনে সচিব মহোদয় বললেন- 'তুমি যদি তোমার ছোকরা ডেপুটি কমিশনারের কথায় চলো, তাহলে তো সবার আগে তোমাকে স্যাক করা উচিত।‘
সে সচিবের নাম ছিল, আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী।
চাকরিজীবনে এ রকম বলির পাঁঠা হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের হয়। কিন্তু মুয়ীদ চৌধুরী স্যারের মতো সুবিবেচক সর্বোচ্চ বস সবার ভাগ্যে জোটে না।
(সে সময় সেখানে উপস্থিত ঢাকার একজন কমিশনার পরে আমাদের ঘটনাটি জানিয়েছিলেন)
২ ) আমার এক তরুণ আত্মীয় খুব নামকরা মাল্টিন্যাশনালে মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। সে একবার তার বসের সাথে চমৎকার একটি আইডিয়া শেয়ার করল। বস খুব নির্লিপ্ত ভাব করলেন। তাঁর আচরণ দেখে আমার আত্মীয় ব্যাপারটি নিয়ে আর এগোলো না। ভাবল, আইডিয়াটি কাজের না। কিন্তু পরের টিম মিটিংয়ে সে খুব বিস্ময়ের সাথে দেখল, বস তার আইডিয়াটিকে নিজের আইডিয়া বলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে উপস্থাপন করছেন!
অফিস পলিটিক্সের দুটো উদাহরণ দিলাম। এছাড়াও এ পলিটিক্স আরো অনেক রকম হতে পারে।
যেমন-
ক) বসের কানভারি করা হয়।
খ) ইচ্ছে করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখা হয় বা সরবরাহ করা হয় না।যাতে সহকর্মী ঠিকভাবে কাজটি করতে না পারেন।
গ) মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে সুনাম নষ্ট করা হয়।
ঘ) অনেক সময় অফিসে কয়েকটি গ্রুপ থাকে, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে থাকে।
ঙ) ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, ইমেইল থেকে দূরে রাখা হয়, যাতে সহকর্মী অফিসিয়াল ব্যাপারে আপ টু ডেট না থাকেন।
কীভাবে মোকাবেলা করবেন?
১) নিজস্ব আইডিয়া একান্তে শেয়ার না করে মিটিংয়ে উপস্থাপন করুন।
২) কোনো কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য না পেলে তা জানানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সহকর্মীকে মেইল করুন এবং তার রেকর্ড রাখুন। প্রয়োজনে ব্যাপারটি বসকেও জানিয়ে রাখুন।
৩) মিথ্যা গুজব ছড়ালে তা যদি গুরুতর না হয় নির্লিপ্ত থাকুন। এটাই হলো বদনামকারীদের মুখে সবচেয়ে কঠিন চপেটাঘাত। তবে তা যদি খুব ক্ষতিকর হয় তবে সে ব্যাপারে নিজেই বসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সত্যতা যাচাই করার অনুরোধ জানান। এতে আপনার সৎ সাহস প্রমাণিত হবে।
৪) অফিস গ্রুপিংয়ে কোনো পক্ষই অবলম্বন করবেন না।
৫) কেউ জানাবে, তার জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই অফিসের ব্যাপারে আপ টু ডেট থাকুন।
৬) মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। অফিস পলিটিক্সে মাথা গরম করলে হেরে যাবেন। ঠাণ্ডা মাথার পায়ের নিচে পৃথিবী গড়াগড়ি দেয়, আর গরম মাথার মানুষ মাটিতে গড়াগড়ি খায়।
৭) সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত দুর্বলতা শেয়ার করবেন না। তা পরে আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। ( খুব বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত হলে ব্যতিক্রম হতে পারে )
৮) আপনার রিপোর্টিং অথরিটিই আপনার ইমিডিয়েট বস। তাঁর মাধ্যমেই টপ ম্যানেজমেন্ট আপনার মূল্যায়ন করবেন। তাই তাঁর সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখুন। তাঁকে কাজের অগ্রগতি ও ব্যর্থতা নিজেই জানান। তা হলে তাঁর কান ভারী করা সহজ হবে না।
৯) সবার সাথে সৌজন্য বজায় রাখুন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ শুভাকাঙ্ক্ষী সিনিয়র কারো পরামর্শ নিন।
১০ ) নিজ ব্যক্তিত্ব ধরে রাখুন। কারণ, সমুদ্রের ঢেউ যেমন শক্তভাবে বাঁধাই করা তীরে বাড়ি খেয়ে সমুদ্রেই ফিরে যায়, ঠিক তেমনি ব্যক্তিত্বের উচ্চতার সাথে ধাক্কা খেয়ে চক্রান্তও ফিরে যায়।
অফিস এক ধরনের দাবার বোর্ড। আপনি না চাইলেও এখানে কেউ কেউ আপনার বিরুদ্ধে চাল দিতে পারে। সেটা ঠেকাতে হলে আপনাকেও পাল্টা চাল দিতে হবে।
তবে মনে রাখবেন-
'One careless move can cost the king.'
'একটা ভুল চাল আপনার রাজাকে রাজ্যহারা করবে।'
আরেকটি কথা, দয়া করে অফিস পলিটিক্সের প্রথম চাল আপনি দেবেন না। শুধু প্রয়োজনে আত্মরক্ষায় পাল্টা চাল দেবেন।
অফিস পলিটিক্সের প্রথম চাল দেয় নোংরা লোকেরা।
#আসুনমায়াছড়াই
#BadalSyed
#CareerGrowth
#life