# **ফরজ গোসল না ধৌত করা?*
পবিত্রতা অর্জনের বিষয়টি কুরআনে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো—কুরআন কি আসলেই যৌন সম্পর্কের পর পূর্ণাঙ্গ গোসল করা ফরজ করেছে, নাকি কেবল অপরিচ্ছন্ন স্থানগুলো ধৌত করার নির্দেশ দিয়েছে?
কুরআনের আয়াতগুলোর আভিধানিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ করলে আমরা প্রচলিত বিশ্বাসের চেয়ে ভিন্ন একটি চিত্র দেখতে পাই।
# **সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াতের সঠিক পাঠ**
পবিত্র কুরআনের সূরা আন্-নিসার ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
**"হে মুমিনগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটে যেও না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পারছ যা তোমরা বলছ। এবং 'জুনুব' (যৌন সম্পর্ক পরবর্তী) অবস্থায়ও নয়, যতক্ষণ না তোমরা ****'তাগতাসিলু' (নিজেদের ধৌত)**** কর; অবশ্য যদি তোমরা পথ অতিক্রমকারী (মুসাফির) হও তবে ভিন্ন কথা। আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি শৌচাগার (প্রস্রাব-পায়খানা) থেকে এসে থাকে কিংবা তোমরা নারীদের স্পর্শ (সহবাস) করে থাক, এরপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও—তা দিয়ে তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত মাসেহ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপ মোচনকারী, ক্ষমাশীল।" (৪:৪৩)**
প্রচলিত অনেক অনুবাদে **'তাগতাসিলু' **শব্দটির অর্থ করা হয়েছে ‘গোসল করা’ বা ‘পূর্ণাঙ্গ স্নান করা’। কিন্তু এই শব্দের মূল ধাতু হলো **‘গাসালা’**, যার সরল অর্থ হয় **‘ধৌত করা’** বা **‘ধুয়ে ফেলা’**। এখানে পূর্ণাঙ্গ গোসলের কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি।
# **৪টি অবস্থা ও ১টি নির্দেশ**
সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াতের পরের অংশটি লক্ষ্য করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। আল্লাহ তায়ালা এখানে পানি না পাওয়া গেলে তায়াম্মুম করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পবিত্রতা অর্জনের জন্য ৪টি পরিস্থিতির উল্লেখ করেছেন:
* **অসুস্থতা**
* **ভ্রমণ বা সফর**
* **শৌচকর্ম (টয়লেট) থেকে ফিরে আসা**
* **নারীদের স্পর্শ করা (যৌন সম্পর্ক)**
উক্ত আয়াতে এই চারটি কাজের জন্য একটিই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তা হলো **‘ধৌত করা’** বা ‘**পরিচ্ছন্ন হওয়া’**। এখন চিন্তা করুন: আমরা কি টয়লেট থেকে আসার পর পুরো শরীর ধুয়ে গোসল করি? নিশ্চয়ই না, আমরা কেবল নির্দিষ্ট কিছু স্থান ধৌত করি। ভ্রমণের পরও আমরা কেবল ধুলোবালি লাগা অংশগুলো ধুয়ে ফেলি।
তাহলে একই আয়াতে উল্লেখিত ‘নারীদের স্পর্শ’ বা যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেন হঠাৎ করে পুরো শরীর ধোয়ার বা পূর্ণাঙ্গ গোসলের নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হবে? আল্লাহ তায়ালা এখানে ‘ধৌত করা’র নির্দেশ দিয়েছেন, যার অর্থ হলো—যে অঙ্গে নাপাকি লেগেছে বা যে কারণে পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন, সেই নির্দিষ্ট স্থানটি ধুয়ে ফেলা।
# **সূরা মায়েদার ৬ নং আয়াতের বার্তা**
একইভাবে সূরা মায়েদার ৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
**"...আর যদি তোমরা 'জুনুব' (অপবিত্র) অবস্থায় থাকো, তবে 'ফাত-তাহহারু' (নিজেদের পবিত্র করো)..." (৫:৬)**
এখানেও **‘ফাত-তাহহারু’** শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ নিজেকে পবিত্র বা পরিচ্ছন্ন করা। আল্লাহ এখানেও নির্দিষ্ট করে বলেননি যে, মাথার চুল থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত পানি ঢালতে হবে। বরং শরীরের যে অংশগুলো অপরিচ্ছন্ন হয়েছে, তা ধুয়ে ফেলাই পবিত্রতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট।
# **উপসংহার**
আল্লাহর দ্বীন সহজ এবং স্বভাবজাত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ কোথাও বলেননি যে যৌন সম্পর্কের পর সম্পূর্ণ শরীর ধুয়ে ফরজ গোসল করতে হবে। প্রচলিত ফরজ গোসলের বিধান বা নিয়ম – কোনোটাই আল্লাহ কুরআনে বর্ণনা করেননি। বরং তিনি **ধৌত (Wash**) করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রচলিত ব্যাখ্যায় ইসলামের এই সহজ বিধানটিকে কঠিন করে ফেলা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য পালন করা অধিকাংশ সময়ই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।