আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগের কথা। ডিসেম্বর মাসের কনকনে শীতে বার্ষিক পরীক্ষা শেষের ছুটি কাটাতে ভদ্রমহিলা তিন সন্তান নিয়ে গ্রামের বাড়ী রওনা দিলেন চট্টগ্রাম থেকে।
সাথে তার স্বামী। প্ল্যান হচ্ছে ১৫ দিন বাবার বাড়ী, শ্বশুরবাড়ি ঘুরে আবারও স্বামীর কর্মস্হল চট্রগ্রামে ফিরে যাওয়া।
সব ভালোয় ভালোয় চলছিলো! আনন্দ উৎসবের কমতি নেই। ভাপা পিঠা হতে কবুতের ঝোল, চিতই পিঠা থেকে গরু ভুনা কি নেই সে আয়োজনে!!
বাচ্চারা তখন দাদা বাড়ী মাতিয়ে তুলেছিলো। আর ৪ দিন পরেই বাবা এসে নিয়ে যাবে, কাজেই যতো পারো হুল্লোড় করে নাও! শাপলা তোলা, মাছ ধরা, পুকুরে দাপানো, কুতকুত খেলা স্বপ্নের মতো সময় কাটছিলো সবার।
একদিন দাদীমা ঘরের তেল চকচকে দুটো হাঁস জবাই দিলেন। আজ রাতে তাঁর ছেলে আসবে। ছেলে সহ বৌমা, নাতি নাতনীরা হাঁস আর চালের রুটির আসর জমাবে।
বড় উঠানে জবাই করা হাঁস রেখে বড় গামলায় উতরানো টগবগে পানি রেখে তিনি গেলেন বসার চৌকি আনতে রান্না ঘরে। তার একটু আগে এক পশলা হালকা বৃষ্টিতে উঠোন ছিলো ভয়ংকর পিচ্ছিল। রান্নাঘর থেকে বের হবার মুহূর্তে তিনি এক গগনবিদারী চিৎকার শুনলেন। ফিরে তাকাতেই তার পুরোটা শরীর অবস হয়ে গেলো।
বাড়ীর সবচেয়ে ছোট নাতনিটি তাঁর, মাত্র চার বছরের, উঠোনে পা পিছলে টগবগে গরম পানিতে পড়ে গেছে। একা একা কখন সে উঠোনে নামলো কেউ খেয়াল করেনি। বিপদ তো না জানিয়েই আসে।
এরপরের দৃশ্যপট ভয়াবহ হৃদয়বিদারক। সবাই দৌড়ে এসে দেখে বাচ্চার পুরো বাম হাত গরম পানিতে প্রায় সিদ্ধ হয়ে গেছে। পরনে ছিলো ফুল হাতার সোয়েটার। কারা যেনো টেনে সোয়েটার উপরে ওঠাতেই হাতের চামড়াসহ কিছু মাংস সোয়েটারের সাথে পেঁচিয়ে উঠে গেলো। আর কিছু চামড়া হাতের নিচে ঝুলতে লাগলো।
বাবুর চাচারা পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে তাকে পিঠে ফেলে হাসপাতালে দৌড় দিলো। পুরনো এক সদর হাসপাতাল। ৪০ বছর আগে ওখানে ভালো ক্লিনিক বা চিকিৎসা সেবা তেমন ছিলো না। তবুও ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এটুকু বলে দিলেন, যেহেতু ডীপ বার্ণ জয়েন্ট সহ, পুরো হাত বাঁকা হয়ে যাবে। যদি প্রাণেও বেঁচে যায় কিন্ত পঙ্গুত্ব মেনে নিতেই হবে।
ততোক্ষণে বাবাও চলে এলেন। সবার এক কথা বাচ্চাকে শুধু প্রাণে বাঁচাও। শুরু হলো চিকিৎসা, তৎকালীন যা সুযোগ ছিলো তাই দিয়ে। ডাক্তার বারবার সাবধান করেছিলেন,,মশারীর নিচে রাখবেন, ইনফেকশন হলে অবস্হা আরও খারাপ হবে। বাচ্চার সাথে অর্ধ পাগল মাও তখন আশ্রয় নিলেন মশারীর নিচে।
একদিন পর পর ডাক্তার এসে ড্রেসিং করতো, বাচ্চার গগনচুম্বী চিৎকারে সবাই কাঁদতো, মা কানে আঙ্গুল চেপে রাখতেন। ড্রেসিং এর সময় উঠে আসতো পুড়ে যাওয়া চামড়া, সফট টিসু। আঙ্গুল যেনো একটার সাথে একটা জোড়া না লাগে সেজন্য ফাঁকে ফাঁকে বোর্ড দিয়ে রাখতেন ডাক্তার। আর মা দিন রাত অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দিতেন যেনো বোর্ড সরে না যায়। নিয়ম করে ঔষধ খাওয়ানো, মলম লাগানো নিজের হাতের ওপর বাচ্চার হাত কায়দা করে ধরে রাখা, রাত দিন বসে কাটানো, ঘুম নেই, ঝিমুনি এলেও হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে একটু......যদি বাচ্চার হাত নড়ে যায়! যদি ব্যথা পায়! যদি আঙ্গুল জোড়া লেগে যায় একের সাথে অন্যের!!.....এভাবে এক মাস!!
হুম। পুরো একমাস একই ভাবে বাচ্চার সাথে লেগে ছিলেন সেই মা। এক মাস পরে হাত কিছুটা শুকিয়ে এলো। বোর্ড সরিয়ে ডাক্তার শুধু মলম আর হালকা কিছু জয়েন্টের ব্যায়াম শিখিয়ে দিয়েছিলো। মা সেটাই করতো।
দেড় মাস পরের ঘটনা। আজ সেই মা ভাত খাবেন। উনি ওয়াদা করেছিলেন যতোদিন তার বাচ্চা সুস্হ না হবে, যতোদিন বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনবেন, ততদিন তিনি বাচ্চা ছেড়ে কোথায় যাবেন না, ভাত স্পর্শ করবেন না, আল্লাহর কৃপা চাওয়া বন্ধ করবেন না। শুধু চা, একটু রুটি খেয়ে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
আস্তে আস্তে বাচ্চাটির হাত পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। সেই মা করেছেন অকল্পনীয় কষ্ট, আর একজন চিকিৎসক ঢেলে দিয়েছিলেন তাঁর সবটুকু মমতা এবং যত্ন। নিরলস ভাবে বাড়ীতে এসে ড্রেসিং করতেন, যত্ন নিতেন.... আর খারাপ এক আশংকা নিয়ে ফিরে যেতেন।
কিন্ত, অবিশ্বাস্য ভাবে বাচ্চাটির বার্ন কনট্রাকচার হয়নি। পঙ্গু হয়ে যায়নি শিশুটি।
আজ যখন আমি সেই হাত দিয়ে অপারেশন করি, রোগী দেখি, আল্ট্রাসনোগ্রাম করি, সেলাই, রান্না,বাগান, লেখালেখি সব, সব করি.... তখন প্রতিমুহূর্তেই আমার কর্মঠ হাত আমার মায়ের জন্য, সেই ডাক্তারের জন্য দোয়া করতে থাকে অবচেতন মনেই।
আমার যা কিছু পারফেক্ট, যা কিছুতে আমার অর্জন, সে আমার আম্মুর সেই চার বছর বয়সের অবিশ্বাস্য এক অবদান। রূপকথা হার মানে যেখানে।
রিনু।
কপি
পেস্ট
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন