স্ত্রী রাইসার গা থেকে আসা মাছের আর ঘামের গন্ধ আমার আজ বেশ বিরক্ত লাগছে।
অথচ বিয়ের আগে যখন আমরা কোন উদ্যানে বা রেস্টুরেন্টে দেখা করতাম মনে হতো যেন ফুল পরীদের রাজ্য থেকে কোন মিষ্টি,ছোট্ট পরী এসে আমার সামনে বসে আছে।যার সমস্ত শরীর থেকে আসছে তাজা সহস্র গোলাপের সুরভী আর সেই সুরভীতে আমি বিমোহিত হয়ে রয়েছি।আমার সমস্ত নিঃশ্বাস যেন সেই সুঘ্রাণ শুষে নিতে চাইছে।
তবে কি সব পারফিউমের যাদু ছিল!!
তার চুলের দিকে এবার ভালো করে লক্ষ্য করলাম।
একি তার অমন সজারুর কাঁটার মতো সোজা,চকচকে,মসৃণ চুলগুলো কোথায়!!
এতো অর্ধেক সোজা অর্ধেক এঁকেবেঁকে থাকা পাটের মতো শক্ত হয়ে রয়েছে,যা একত্রিত করে প্যাচিঁয়ে রাখার মতো কিছু যাকে খোপা বললে খোপার অবমাননা হবে।কেননা,রাইসাকে আমি খোপা করা অবস্থায় দেখেছিলাম একবার।আহা!কি সুন্দর করে ১০০টি ক্লিপ লাগানো গোছানো খোপা আর তাতে ঠাঁই পেয়েছে গোলাপগুচ্ছ। গোলাপগুলোও হয়তো সেদিন নিজেকে এমন সুন্দর খোপায় ঠাঁই দিতে পেরে ধন্য মনে করছিলো।
তবে কি সব ছিলো স্ট্রেইটনারের কেরামতি!!
আমার আর রাইসার ১বছরের প্রেমের পর বিয়ের আজ ৩ মাস হলো।
প্রথম ১ মাস সে রান্না ঘরে ঢুকেনি,কাজটাজও তেমন একটা করেনি যা করার আমার মা আর বুয়া ছিল তারাই করতো।
মা গ্রামে আর বুয়া ছুটিতে যাওয়ায় সব ভার এসে পরলো এবার রাইসার উপর।
আমার আবার গুড়া মাছ খুব পছন্দ।কমদামে পাওয়ায় কাল ৫ কেজি গুড়ামাছ কিনে এনেছিলাম।বেচারি রাইসার এগুলো কাটতে কাটতেই আজ আসল রুপ বেরিয়ে এলো।
মনে হচ্ছে ধোকা,সবই ধোকা!
রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলাম মাথায় ঘুরতে থাকলো বিয়ের দিন আত্মীয়দের বলা অগণিত কথা
"রাফিদের বউটা কি সুন্দরটাই না হয়ছে"
"আরে রাফিদ তো পুরা পরী ঘরে তুলতেছে বিয়ে করে"
"আহা মেয়েতো নয় যেন ফুটন্ত ফুল"
আজ সবকিছুকে মিথ্যা আর মেকাআপের যাদু মনে হচ্ছে।
এমন সময় পাশের ফ্ল্যাটের রাত্রি ভাবির সাথে লিফটের ভেতর দেখা।
দেখেই চমকে ওঠলাম!শুনেছিলাম ভাবির নাকি ৭ মাস আগে সিজারে বেবিও হয়েছে কিন্তু একি ভাবিকে দেখে তো বুঝাই যাচ্ছে না যে একটা ৭ মাসের বাচ্চা আছে।মনে হচ্ছে যেন,গালের ভেতর থেকে আলোর রিফ্লেকশন আসছে..আর ঠোঁটের নিচের তিলটা সত্যিই মায়াবী লাগছে।যখন আমাকে দেখা মাত্রই হাসলো তিলটা কিছুটা প্রসারিত হয়ে হাসিকে এক অপরুপ মাত্রা এনে দিল।আর কোন পারফিউমের ঘ্রাণ না পেলেও এক হালকা সুন্দর ভালো লাগার সুবাস ভেসে আসছিলো।এসব ভাবতে ভাবতেই লিফট ৮ তলা থেকে ২ তলায় পৌঁছে গেলো আর ভাবিও নেমে গেল।
মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেলো!!
পরক্ষণেই নিজেকে ধমকে বললাম:
"ছিহ কি ভাবছি এসব আমার বউ আছে"
আবার বউয়ের গায়ের মাছের গন্ধ মনে পরে গেলো।
আমরা বাঙালীরা মাছ খেতে ভালোবাসি কিন্তু মাছের গন্ধকে নয়।
রাত্রি ভাবির কথা এখনও মন থেকে যাচ্ছে না।
আসলে মানুষের নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই থাকে তিব্র আর্কষণ।
আমি যখন বুঝতে পারলাম আমার ভাবনাগুলো ঠিক নয়,নিষিদ্ধ ভাবনা তখনি তা আমায় আরোও বেশি করে যেন টানছে।
এবার তো মাথায় আরোও একটা দুষ্টু বুদ্ধি এসে চাপলো!রাত্রি ভাবির রান্নাঘরে উঁকি মেরে দেখতে হবে ভাবিকে কেমন দেখায়!আমার বউয়ের মতো নাকি সত্যিই অপরুপা।
মাথা বলছিলো করিস না আর মন বলছিলো কর নাহলে আফসোস থাকবে।
আর আমি বলছিলাম,আমি মনের কথা শুনি,তাছাড়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস ভাবি আসলেই সুন্দর দেখতে কেননা আমার ভাবির সাথে ছাদেও দেখা হয়েছিল।ভাবি গোসল করে কাপড় শুকাতে এসেছিলো সেদিন তো মেকআপ করা ছিল না তবুও বেশ সুন্দরই লেগেছিল।
মনের এই অস্থিরতা কমাতে পাইপ বেয়ে ওঠে গেলাম ২ তলায় ভাবির রান্নাঘরের জানালার পাশে।
এমন পাইপ বেয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা আমার আগেরও আছে অবশ্য। রাইসার জন্য ওর বাসায় পাইপ বেয়ে ওঠে ফুল দিয়ে এসেছিলাম ১ দিন।
সে যাইহোক,রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই আমি যা দেখলাম রাসেল ভাই বিশ্বাস করেন আমি মোটেও তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না.....
ভাবি বুয়ার সাথে রান্নাঘরে বসেই বাচ্চার জন্য হয়তো রান্না করছে।দেখে মনে হলো খিচুড়িই হবে।ভাবির কপাল দিয়ে টপটপ করে ঘাম বেয়ে পরছে!
রান্নাঘরে বসে থেকে ভাবি কিছুটা কালসেটে হয়ে গিয়েছে আর চুলগুলো শক্ত করে বাঁধা থাকায় তার আসল সৌন্দর্য হারিয়েছে।
কি অদ্ভুত ভাবিকেও দেখতে নরমাল লাগছে।আর ছাদে দেখা সেই সতেজতা এই রান্নাঘরের ধোয়ায় চাপা পরে গিয়েছে।
আহামরি কিছুই নেয়!
তবে হ্যাঁ খিচুড়িতে সব ঠিকঠাক আছে নাকি,বাচ্চা ঠিকভাবে খেতে পারবে নাকি এসব নিয়ে ভাবির উৎকন্ঠা দেখে ভাবির মাঝে যে মাতৃত্বের দিকটা ফুটে ওঠেছে তা যেন সমস্ত সৌন্দর্যকে হার মানায়।
এবার পাশের বাথরুমের পাইপ ধরে নিচে নামতে যাবো তখন বাথরুমের থেকে পুরুষকন্ঠ শুনতে পেয়ে থেমে গেলাম।ভাবির বরের গলা বলে মনে হচ্ছে।কার সাথে যেন কথা বলছে...
ঘটনা কি বুঝতে থেমে গিয়ে কথা শোনায় মনোযোগ দিলাম।ওপাশ থেকে শোনা যাচ্ছে:
"অহ রিটা তোমার মতো সুন্দরী আমি আর দ্বিতীয়টা দেখিনি জানো,আর আমার রাত্রিকে দেখো কেমন কালসেটে দেখাচ্ছে একটু আগেও রান্নাঘরে গিয়ে দেখে আসলাম,তখনই আজ অফিসের ফর্সা,গ্লেমারাস সুন্দরী রিটার কথা মনে পরলো"
তার মানে সবই সন্তুষ্টির অভাব!আমরা যখন কারো সাথে সবসময় থাকি,তাকে দেখি তখন তার প্রতি আগ্রহ কমে যায়!
এসব ভাবতেই হাত পিছলে সোজা গিয়ে পরলাম নিচে আর নিজেকে আবিষ্কার করলাম হাসপাতালের বিছানায়।
অনেকদিন হাসপাতালে থেকে এবার বাসায় ফিরে বউএর সেবা যত্নের পর এবার আমি কিছুটা সুস্থ।
রাইসা যখন আমার সেবায় ব্যস্ত হয়ে নিজের চুল,চেহারা ঠিক করতে ভুলে যায়,নিজের ঘাম মুছতে ভুলে যায় তখন তার দিকে মনের দৃষ্টি খুলে এই প্রথম ওকে দেখছি আর বড্ড বেশি অনুভব করছি।যতই অনুভব করছি অনুভবে তাকে আরোও বেশি মায়াবী লাগছে।তার ঘামগুলো নিজ হাতে মুছে দিতে ইচ্ছা করছে...
আনমনে নিজেই নিজেকে বলতে লাগলাম:
"মেয়েরাও মানুষ।মেয়ে পরিচয় হওয়ার আগের পরিচয় তারাও মানুষ.. তারাও ঘামে,তারাও অগোছালো থাকে।তাদের হরিণী চোখ বা চকচকে গাল বলতে কিছু নেই সবই আইলাইনার বা হাইলাইটার।এসব শখে ব্যবহারযোগ্য যা হয়তো ৩-৪ ঘন্টা নিজেকে অপ্সরা বানিয়ে রাখতে পারে কিন্তু দিনশেষে তারাও পরিশ্রমী মানুষের মতো দেখতে।সকলেই সাধারণ। আর কি অদ্ভুত আমি যেই গোছানো রাইসাকে ভালোবাসতাম সেই রাইসাকে না পেয়ে আমি রাত্রি ভাবির সৌন্দর্যের কদর করতে থাকলাম।তবে কি দোষটা আমার চোখের!রাইসার শখের সাজুগুজুর প্রেমে পরেছিলাম কি!তবে হ্যাঁ এইবার এই সাধারণের মাঝে অসাধারণত্ব আমাকে খোঁজে নিতে হবে রাইসার থেকে,তবেই না আমি ওকে ভালোবাসি"
গল্পঃসাধারণ
নওরীন খান
কপি
পেস্ট
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন