কি গো ঢাকার মৌমাছি(বউ), কী রান্না আজ?
বউ- তেমন কিছু না। এই জয়দেবপুরের কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ধানের চাল>ভাত, শিবগঞ্জের মসলা দিয়ে ঈশ্বরদীর ডাল, গাজীপুরের তেলবীজ (সরিষা, সয়াবিন, সূর্যমুখী প্রভৃতি) থেকে তৈরি সদ্যোজাত তৈল দিয়ে মানিক মিয়ার পাট শাক ভাজি, আর তোমার প্রিয় সিলেটের ব্ল্যাকবেঙ্গল ছাগলের মাংস।
আর খাবার শেষে বগুড়ার দই, নাটরের কাঁচাগোল্লা, নওগাঁর প্যারাসন্দেশ। এই তো সামান্য আয়োজন।
আমি- 🤔🤔। কি মতলব?
বউ- কিছু না গো, ওই একটু সাহেবপ্রতাপ, নরসিংদির তাঁতের শাড়ি আর রাজশাহীর রেশমিসুতোর শাড়ির নতুন কালেকশন দেখে মনটা কেমন করছে। শোনো নাহ! সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময় জয়দেবপুর উদ্যান থেকে আমার জন্য ১১ ধরনের ফুলগাছ নিয়ে এসো। জানোই তো আমার বাগান করার সখ।
ওহ ভালো কথা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম আছে ফ্রিজে, কেটে দিবো? নাকি শ্রীমঙ্গলের চা খাবে? রাতে কি রুটি করবো। নশিপুরের গমের?
ওই, একটু শোনো নাহ! আমার তাই জাদুঘর দেখার সখ হইছে। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর, আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দিয়ে বিজয় সরণিতে যাবো সামরিক জাদুঘর দেখতে। তারপর, কুষ্টিয়ার কুঠিবাড়ি রবীন্দ্র ও লালন জাদুঘর দেখে রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘর ঘুরে মহাস্থানগর জাদুঘরের দিক রওনা হবো। সেখান থেকে এসে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর আর কুমিল্লার ময়নামতি দেখে আর কোত্থাও যেতে চাইব না প্রমিস্।
আমি শুনেও না শোনার ভান্ করে ভাত খেয়ে যাচ্ছি। সে আমার সাড়া না পেয়ে-
তুমি আমাকে কোথাও নিয়ে যেতে চাও না। কেন? কেন? আমি তো তেমন ঘুরিও না। সেই ছয়মাস আগে কুমিল্লা গেছি শালবন ও আনন্দ বিহারে, আর চট্টগ্রামে মহামুনি বিহারে আধাঘন্টা, রাঙ্গামাটি রাজবন বৌদ্ধ বিহারে আধাঘন্টা। ব্যাস শেষ। নওগাঁর সোমপুর বিহার, জগদ্দল বিহার, বগুড়ার বাসু বিহার, দিনাজপুরের সীতাকোট বিহার যাওয়াই হলো না আমার। এ জীবনে হবে কিনা কে জানে! 😢
কথা শুনে এবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। মেজাজ গরম, রক্তের গতি চরম। বললাম-
ইউনেস্কো ঘোষিত ষাট গম্বুজ মসজিদ আর সুন্দরবন/টাইডাল বন/বাদাবন বাদ দিলে যে? বলো? সরকারি আটটা ইপিজেট (হালিশহর, কুমিল্লা ২টা, সাভার, বাগেরহাট, পাকশি,নীলফামারী,নারায়ণগঞ্জ) এ যাবো। বলো বলো? কর্ণফুলি নদীর তীরে চট্টগ্রাম বন্দর, পশুর নদীর তীরে মংলা বন্দর, কলাপাড়ার পায়রা বন্দর (সমুদ্রবন্দর)। সাথে ২৮টা স্থলবন্দর, নারায়ণগঞ্জের প্রধান নদী বন্দর।
তেল শোধনাগার আছে, কয়লা শোধনাগার আছে, মানুষ শোধনাগার থাকলে এটাকে শোধন করে নিতাম। (মনে মনে বিড় বিড় করছি 🤔)
বউ- তোমার সংসারে আমার মত মেয়ে দেখে আছে, অন্য কেউ হলে.......। (কমন ডায়লগ)
কোথাও নিয়ে যেতে চাওনা। একটা মুভি দেখাইছো বিয়ের পর? চিত্রা বউদিকে তার বর অস্কারে যাওয়া মাটির ময়না, শ্যামল ছায়া, ঘেটুপুত্র কমলা, অজ্ঞাতনাম সব কয়টা দেখিয়েছে। ওমা ভাবি সেদিন আমাকে এক নিঃশ্বাসে ১০টা ছবির নাম বললো। বৃত্তের বাহিরে, জালালের গল্প, রেহেনা মরিয়ম নূর, জোনাকির আলো, সপ্নডানায় আরও কত কী। তোমার মত হুমু সেপিয়েন স্বামী আমি জীবনেও দেখিনি। (কাঁন্না শুরু)।
আমার ছোটবোন বিয়ের পর সর্ব দক্ষিণের ছেঁড়াদ্বিপ, উত্তরের জায়গীরজোত, পূর্বের আখাইনঠং, পশ্চিমের মনাকষা ঘুরে এলো। বাংলার ভেনিস/শস্যভান্ডর, সাগরকন্যা, কুমিল্লার দুঃখ, ৩৬০ আওলিয়ার দেশ, উত্তর বঙ্গের প্রবেশদ্বার, পাহাড়-পর্বত ও রহস্যের লীলাভুমি কি দেখেনি সে। নদীয়া, বিক্রমপুর, জাহানাবাদ, শ্রীহট্ট, শমশেরনগর, সিংহজানী, পালংকি, গন্ডোয়ানাল্যান্ড কত শত নাম বললো।
বউ এর কথা শুনে আমার তো আক্কেলগুড়ুম। মনে হচ্ছে সাগরে ডুব দিয়ে মরি।
বউ: সাগর পাবে কই। বঙ্গো উপসাগর আছে। যার অর্থনৈতিক সীমা ২০০ ন.মা, রাজনৈতিক সীমা ১২ ন.মা। ১ নটিকাল মাইল =১.১৫ মাইল/১.৮৫ কিমি। তুমি তো ১০০ মিটারও হাটতে চাও না। আর সাগরে নামতে এই দুরত্ব পায়ে হেটে যেতে পারবে তো?
আমি: এরে! বিসিএস বইগুলি কই? এসব পড়ে ওর মাথা গেছে। বাড়িতেই থাকবো না যাহ! দরকার হয় বনবাসে যাবো, নয়তো এভারেস্টে চলে যাবো।
বউ: বাংলাদেশে বন ২৫%ও নেই। ৭-১২% মাত্র। যাবে কই। বড় বন একটাই সেটাও মাত্র ৬০১৭ বর্গকিমি। এটুকু জায়গায় যেখানেই যাও খুঁজে বের করবো। আর এভারেস্টের কথা বলছো। মুসা ইব্রাহিম (২০১০), নিশাত মজুমদার (২০১২) এই দুজন ছাড়া আর কেউ জয় করতে পারেনি বাংলাদেশ থেকে। আর তুমি তো রিপণ! কিউকারাডং এ যাওয়ার মুরুদ নেই, আবার এভারেস্ট জয়ের ঠাকুর। তোমার মতো ছা-পোষা সরকারি চাকুরিজীবীর দ্বারা ওই চাকরিই করতে হবে, জীবনে আর কিছু করতে পারবে না। তোমার............ .. .. (মুখ চলমান)।
আরও আধাঘন্টা বক বক চললো তার। আমি বালিশ্ নিয়ে এই অগ্রহায়ণ মাসের শীতে ছাঁদবাসী হয়ে গেলাম।
😔😢
©Riponarya Kormokar (রিপণার্য কর্মকার)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন