এক_ছোট্ট_সাম্রাজ্য
সময়টা ২০১২ সাল। ইউরোপের কিছু আগ্রহী মানুষ হঠাৎ গিয়ে হাজির হলেন সিসিলিয়ান আইল্যান্ডে। যাবার আগে তারা শুনেছিলেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে যা খুঁজে পেলেন তা জন্ম দিল এক নতুন ইতিহাসের। ইউরোপিয় অভিযাত্রীরা চাক্ষুস করলেন হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন গ্রাম, শুধু গ্রামই নয় এক হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্য। অনেক বছর আগেই এই সাম্রাজ্য আবিষ্কৃত হয়েছিল, হিসেব মতন তাও প্রায় একশো বছর আগে। তবে তা প্রচারের আলো পায়নি, ২০১২ সাল পর্যন্ত। ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের সেই অভিযান থেকেই শুরু হয়েছিল সারা পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে ছোট প্রাচীন সাম্রাজ্যের নিদর্শন তুলে ধরার যাত্রা।
মাত্র তেইশটা বাড়ি ছিল সেই আশ্চর্য সাম্রাজ্যে। এখনো অবধি খুঁজে পাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের মার্বেলের নমুনা রয়েছে সেই সবকটা বাড়ির আনাচে কানাচে। সিসিলিয়ান গ্রাম্য পরিবেশে ১৯শো শতকের গোড়ার দিকে আরকিওলজিস্টরা খুঁজে পেয়েছিলেন এই সাম্রাজ্য। পাহাড়ের ঢালে মাটি চাপা পড়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ করেই একদিন নিজের অস্তিত্ব জানান দেয় এই ছোট্ট সাম্রাজ্য, যার নাম "ভিলা রোমানা দেল কাসাল"।
ঐতিহাসিকদের অনুমান আশ্চর্য এই সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছিল আনুমানিক তৃতীয় থেকে চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি কোনও এক সময়ে। ধ্বংস হয়ে যাবার পর প্রায় সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে তা মাটিচাপা অবস্থায় পড়েছিল সিসিলিয়ান আইল্যান্ডের পাহাড়ের ঢালে। প্রাচীন রোমের সবচেয়ে ধনী কয়েকটি পরিবার মিলে স্থাপন করেছিল এই সাম্রাজ্য, গোপনে। উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের গোপন ধনসম্পত্তি এবং অনৈতিক জীবন যাপনকে রোমান সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে রাখা। সেই সময়ের পৃথিবীর অন্যান্য বেশিরভাগ অঞ্চলের তুলনায় সিসিলিয়ান এই ছোট্ট গ্রামের বৈভব ছিল চোখে পড়ার মতন। পরবর্তীকালে রোমান সিনেট এবং সাম্রাজ্যের নজর পড়ে এই ছোট্ট গ্রামটির উপর। বিশেষ করে রাজনৈতিক কারণে, ক্ষমতা দখলের ঠান্ডা লড়াইকে কেন্দ্র করে। পাহড়ের গায়ে গড়ে ওঠা এখানকার অট্টালিকাগুলি ক্ষমতাশালী রোমানদের ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেছিল। তারাও এখানকার অপরূপ প্রকৃতির মোহে আবিষ্ট হয়ে ছুটে আসে এই গ্রামে।
ইতিহাস জানে, এই সাম্রাজ্য দেখেছে বিখ্যাত সেই রোমান সাম্রাজ্যের পতন। নিজের শরীর দিয়ে সহ্য করেছে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প, বন্যা এবং আগুনের প্রতাপ। যদিও রোমান সাম্রাজ্যের শত্রুরা এর খোঁজ পায়নি কখনও। অবশেষে ১১৬৯ সালে এক মারাত্মক ভূমিকম্পে প্রায় ধংসস্তুপে পরিণত হয় এই ঐতিহাসিক জায়গাটি।
১৯শো শতকের গোড়ার দিকে এই সাম্রাজ্য যখন পুনোরুদ্ধার করা হয় তখন মাটির তলা থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে প্রায় পঞ্চাশটি ঘর এবং বিশাল আকারের স্নানাগার সমেত এক রাজকীয় অট্টালিকা। পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের মার্বেল এবং পাথরের কারুকার্য খুঁজে পাওয়া গেছে সেই অট্টালিকায়। তার প্রতিটি কোনায় খুঁজে পাওয়া যায় সেই সময়ের সমৃদ্ধশালী আর্টের নমুনা।
প্রাচীন আর্টের এই নমুনাগুলোতে কোথাও দেখতে পাওয়া যায় সেই সময়ের দৈনন্দিন জীবনের চিত্র, কোথাও শিকারকৃত অবস্থায় জন্তু জানোয়ারের ছবি, আবার কোথাও হোমারের মহাকাব্য। মার্বেলের উপর দক্ষতার সাথে সমস্ত কিছুর সচিত্র বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায়।
তবে রহস্যের ব্যাপার হল ইউরোপের মাঝ বরাবর অবস্থিত রোমান অধ্যুষ্যিত এই ছোট্ট সাম্রাজ্যের শিল্পে আফ্রিকান প্রভাব চোখে পড়ার মতন। ঐতিহাসিকরা মনে করেন আফ্রিকান, বিশেষ করে ইজিপ্সিয়ান এবং নিউবিআন কারিগররাই বানিয়েছিলেন এই ছোট্ট সাম্রাজ্যের সবকিছু। তারাই ছিল এর আর্কিটেক্ট থেকে কারিগর। আসলে সেই সময়ে মূলত আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস সংগ্রহ করে আনা হত ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায়। তারা বিভিন্ন শিল্পকর্মেও অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তারাই নিজেদের কাজের গুনে এই সাম্রাজ্যকে স্থাপত্যের উৎকর্ষে পৌঁছে দিয়েছিলো।
১৯শো শতকের গোঁড়ায় খুঁজে পাবার পর থেকেই এই ছোট্ট সাম্রাজ্যের উপর চলেছে নানান গবেষণা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের তত্ত্বাবধানে তার পরিচর্যাও চলেছে সমান তালে। অবশেষে ২০১২ সালে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের অভিযানের পর থেকেই সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে জায়গাটি। ইউনেস্কো একে হেরিটেজ সাইটের মর্যাদাও দিয়েছে। এই সাম্রাজ্যের কারিগরদের আসল ইতিহাস জানা যদিও এখনও বাকি রয়েছে। আশা করা যায় খুব তাড়াতাড়ি আমরা সেই সত্যও জানতে পারবো। মর্যাদা দিতে পারবো নামগোত্রহীন সেই সমস্ত সৃষ্টিকর্তাদের।
Collected

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন