॥ তোমাদের ভালবাসা .... ফিরায়ে এনেছে মোরে ॥
চল্লিশের দশকের গল্প। এক অশান্ত সময়ের ক্যানভাসে রঙের ছোঁয়া দিচ্ছে বাংলা। দেশ তখনও স্বাধীনতার অপেক্ষায়। সমাজ আর রাজনীতির জোয়ার এসে মিশেছে বাংলার জনজীবনে। এমনই এক উত্তাল সময়ে, নৈহাটির এক তরুণ ছেলের জীবনে বয়ে চলেছে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের হাওয়া। ছেলেটি নিজেও আইপিটিএ-র সদস্য। নৈহাটির বাড়িটা যেন আইপিটিএ-র কর্মীদের এক ছোটো আস্তানা হয়ে উঠেছিল। প্রায়ই সেখানে ভিড় জমান সংস্কৃতি জগতের মানুষজন। আলোচনা, গান, আর শিল্পের মধ্য দিয়ে রাতগুলো জমে উঠত।
এরকমই এক রাত। খাওয়া-দাওয়া শেষ, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত গভীর। হঠাৎ এক অতিথির ঘুম ভেঙে গেল। চোখেমুখে অস্থিরতা। তিনি ছুটে এলেন সেই তরুণ ছেলেটির কাছে। ব্যাপার কী? উত্তরে বললেন, “একটা নতুন গান মাথায় এসেছে। ঘুমের মধ্যেই একটা সুর মনে হয়েছে। একবার শোনাবি?”
এবার শুরু হল গানের খেলা। রাতের নৈঃশব্দ্যকে সঙ্গী করে দু’জনে মিলে তৈরি হতে লাগল নতুন এক গান। সেই গানই পরবর্তীকালে পরিচিত হয়েছিল ‘গাঁয়ের বধূ’ নামে। যার মস্তিষ্কে সুরের জন্ম, তিনি ছিলেন সলিল চৌধুরী। আর যার আতিথ্যে সেই সৃষ্টির শুরু, তিনি নৈহাটির তরুণ—শ্যামল মিত্র।
রাতটা যেন সঙ্গীতের এক অনন্য যাত্রার সূচনা। শব্দ আর সুর মিলে সেই রাতে বুনেছিল এক ইতিহাস।
শ্যামল মিত্রের জীবন যেন এক রঙিন গল্পের জাদুঘর। তাঁর শৈশবের বাড়ির উঠোনেই ছিল এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বাতাবরণ। বাবা, ডাঃ সাধন কুমার মিত্র, শুধু নৈহাটির নয়, গোটা অঞ্চলের মানুষজনের কাছে ছিলেন একজন কিংবদন্তি চিকিৎসক। এমনকি তাঁর নাম শুনলে কপালে হাত ঠেকাতেন অনেকেই। বিধানচন্দ্র রায়ের মতো ব্যক্তিত্বের ছাত্র তিনি। এই পরিবারের উত্তরাধিকারী শ্যামলের জন্য বাবা যে স্বপ্ন বুনেছিলেন, তা ছিল চিকিৎসা জগতে সুনামের এক উজ্জ্বল অধ্যায় যোগ করা। কিন্তু শ্যামল? তাঁর মন পড়ে থাকত সুরের জগতে। গান ধরলে তিনি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলতেন সাত সুরের কোনো এক অলৌকিক গোলকধাঁধায়।
বাবা একদিন ভেবে বসলেন, গান-বাজনা করে ছেলের কী হবে? পড়াশোনায় মন দিলে তো সহজেই বাবার আসনটি নিতে পারত! শ্যামল কিন্তু সেই পথে হাঁটলেন না। তাঁর আত্মা আটকে ছিল সুরের সঙ্গেই। বাবার আপত্তির মুখে শেষমেশ তাঁকে ছাড়তে হল বাড়ি। সাধন মিত্র পরে রাগ কমিয়ে ছেলেকে ক্ষমা করলেও, শ্যামল তখন সুরের জগতে নিজের নতুন জায়গা খুঁজে নেওয়ার পথে অনেকটা এগিয়ে গেছেন।
কলকাতায় এসে সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে গান শিখতে শুরু করলেন। গুরু শিষ্যের সম্পর্ক ধীরে ধীরে পরিণত হল এক গভীর বন্ধনে। গুরুদেবের সুরের প্রতি নিবেদন শ্যামলের মনে এক অনন্য প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৪৯ সাল। বহু চেষ্টার পর এল সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ। ‘সুনন্দার বিয়ে’ সিনেমায় প্রথমবার প্লে-ব্যাকের ডাক পেলেন তিনি। রিহার্সাল চমৎকার হল, কিন্তু রেকর্ডিংয়ের দিন মঞ্চে প্রবেশ করতেই দেখা গেল এক নাটক।
গায়িকা সুপ্রীতি ঘোষ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন শ্যামলের দিকে। তাঁর মুখ থেকে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে! গায়িকার স্পষ্ট প্রশ্ন, "নেশা করে গাইতে এসেছেন?" শ্যামল তখন বেশ বিচলিত। সুধীরলাল চক্রবর্তীর কথামতো একটু মদ খেয়েছিলেন, কারণ গুরু বলেছিলেন এতে গান ভালো হবে! অদ্ভুত হলেও, সেই রেকর্ডিং পরবর্তী সময়ে বাংলা সিনেমার গান জগতের এক অধ্যায় হয়ে রইল। শ্যামল মিত্রের সুরেলা যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ঘটনা দিয়েই।
শ্যামল মিত্রের গান ছিল শুধু রেডিও বা রেকর্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা পৌঁছে গিয়েছিল শহরের প্রতিটি রক থেকে প্রেমিক-প্রেমিকার হৃদয়ের কোণে। তাঁর কণ্ঠে প্রেম যেন এক নতুন ভাষা পেয়েছিল। আর ‘দেয়ানেয়া’র মুক্তির পর শ্যামল মিত্র যেন এক ভিন্ন দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে উঠলেন। তাঁর গান, সুর, আর গায়কীর জাদু ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র।
তখন বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার— প্রতিটি নামই একেকটি আলোকিত অধ্যায়। এই দিগ্বিজয়ী তালিকায় শ্যামল মিত্র ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁদের একমাত্র যোগসূত্র ছিল গান। একবার মান্না দে’র সঙ্গে ‘রাজবংশ’ সিনেমার একটি গানের সুর নিয়ে আলোচনা চলছিল। সুরটা কোনোভাবেই মান্না দে’র মনঃপূত হচ্ছিল না। তর্কবিতর্ক এতটাই বেড়ে গেল যে শ্যামল রেগে বলেই ফেললেন, “এভাবেই গানটা করুন, নয়তো আর গাইতে হবে না!” শ্যামলের এই দৃঢ়তায় থেমে গেলেন মান্না দে। আর সেই সুরেই গানটি গাওয়া হল, যা পরে এক অমূল্য রত্ন হয়ে উঠল বাংলা গানের ভাণ্ডারে—
“মহুয়াতে হয়না নেশা
হায় কাকে বলি
অন্য নেশায় মাতাল আমি
এ কি জ্বালায় জ্বলি...”
“এ তো পুতুল খেলা নয়
এ তো পুতুল খেলা নয়,
এ হল রাজা-মন্ত্রী-ঘোড়া নিয়ে
দু-পক্ষের দাবা খেলা..”
১৯৬৯ সাল। শ্যামল মিত্রের জীবনে নেমে এল এক অন্ধকার অধ্যায়। একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলেন তিনি। হাসপাতালের শয্যা, তারপরে বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি জীবন— সবকিছু যেন থমকে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁকে ভেঙে পড়তে দেননি তাঁর সহশিল্পীরা এবং বাংলার আপামর শ্রোতারা। প্রত্যেকে বিশ্বাস করতেন, শ্যামল মিত্র এত সহজে থেমে যাবেন না।
আর সত্যিই, শ্যামল ফিরে এলেন। তাঁর প্রতিটি গানের মতোই তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল হৃদয়গ্রাহী। গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা সেই গান যেন তাঁর ফিরে আসারই এক কাব্যময় ঘোষণা—
“তোমাদের ভালোবাসা
মরণের পার থেকে
ফিরায়ে এনেছে মোরে।
তোমরা আমার গান
কতখানি ভালোবাসো
বুঝেছি নতুন করে....”
গানটি মুক্তির পর আবারও ভক্তদের হৃদয়ে ঝড় উঠল। শ্যামল মিত্রকে ভালোবেসে তাঁরা যেভাবে আগলে রেখেছিলেন, সেই ভালোবাসাই তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিল।
শুধু এক শিল্পী নয়, শ্যামল মিত্র হয়ে উঠেছিলেন বাংলার সংস্কৃতির এক অংশ। প্রেমের পাখি হয়ে, কিংবদন্তি হয়ে তিনি আজও রয়েছেন শ্রোতাদের মনে, যেখানে তাঁর সুর চিরকাল বয়ে চলবে।
______________________________
©️ কিছু কথা ॥ কিছু সুর
তথ্য সংগ্রহ: আনন্দবাজার পত্রিকা (শঙ্করলাল ভট্টাচার্য), সৈকত মিত্র, প্রহর (অরিত্র সোম), জি ২৪ ঘন্টা
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন