রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। রবীন্দ্রসংগীতের জগতে এক অনন্য নাম। ১৯৫৭ সালে আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন রংপুর, বাংলাদেশে।
তাঁর গান যেমন আমাদের মুগ্ধ করে, তেমনই তাঁর জীবন ও দর্শন আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এই মুগ্ধতা কোনো ক্ষণিক উচ্ছ্বাস নয়; বরং এটি বোধের গভীরে এক অন্তর্লীন অনুভূতি। তাঁর গান শুনলেই বোঝা যায়, তিনি কোথায় আলাদা, কোথায় অনন্য।
শুধু গভীর সাধনা বা বিরল গানগুলোকে নতুন করে পরিবেশন করাই নয়, এই সময়ের বিকৃত চটকদার পরিবেশনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের গানের শুদ্ধতাকে আগলে রাখা এবং সেই সঙ্গে রবীন্দ্রদর্শনকে বিশ্বমঞ্চে প্রচার করা—এ যেন এক বিস্ময়ের অধ্যায়।
রবীন্দ্রসংগীত তাঁর কাছে কখনোই কোনো প্রদর্শনীর বিষয় নয়। এটি তাঁর অন্তরের সাধনা, "তাঁর যাত্রাপথের আনন্দগান।" শান্তিনিকেতনের আচার্যদের সান্নিধ্যে তাঁর এই যাত্রা শুরু হয়েছিল কৈশোরে।
গুরু শ্রীমতী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে যে পথচলা শুরু, আজও তিনি সেই গুরুপরম্পরাকে বহন করছেন। ১৯৯২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন "সুরের ধারা," যা তাঁর নিবিড় পরিচর্যায় আজ মহীরুহে পরিণত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগের অধ্যাপক এবং Chairperson হিসেবে তাঁর ভূমিকা অগ্রগণ্য।
২০১৯ সালে তিনি Asian University of Women থেকে সম্মানসূচক Doctor of Arts ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তাঁর শিল্পীজীবনের এক উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। ২০২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল: "রবীন্দ্রসংগীতের দুই পর্ব: নদীতীরে এবং শুষ্ক মাটিতে।"
রবীন্দ্রনাথের জন্ম সার্ধশতবর্ষে তিনি সম্পূর্ণ "শ্রুতি গীতবিতান" সংকলনের কাজ সম্পন্ন করেন। এটি শুধু একটি সংকলন নয়, এটি তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের উদাহরণ। বন্যা সারা পৃথিবীজুড়ে রবীন্দ্রনাথের গান প্রচার করেছেন। ভারত, বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে তাঁর অনুষ্ঠান হয়েছে। এমনকি জার্মানির ডয়চে ভেলেতে রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করাও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে তিনি "Music for Development" প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ কেবল গানের চর্চাই নয়, এটি জীবনের প্রতি তাঁর গভীর মানবতাবোধের প্রতিফলন।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা তাঁর শিল্পীজীবনে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান "স্বাধীনতা পদক," পশ্চিমবঙ্গ সরকারের "বঙ্গভূষণ," "রবীন্দ্র পুরস্কার," এবং ভারত সরকারের "পদ্মশ্রী।"
তাঁর জীবন যেন এক বহমান স্রোত। প্রতিযোগিতার এই যুগেও তিনি থেকে গেছেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে, নিজের দর্শন আর আদর্শের প্রতি অটল। বন্যার জীবন ও শিল্প আমাদের শেখায়, লক্ষ্য কখনো গন্তব্যে পৌঁছানো নয়। বরং তিনি রেখে যান এমন পায়ের ছাপ, যা দেখে আগামী প্রজন্ম এগিয়ে যাবে।
_________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন