#fishy_tale!
ডাকের মাছ, মাছের ডাক!
@ অরিত্র ভট্টাচার্য্য।
"রানার চলেছে খবরের বোঝা কাঁধে/রানার,রানার চলেছে রানার!"
কিশোর কবি এই বিখ্যাত কবিতাটি লেখার পরে অনেক দশক কেটে গেছে৷ বর্তমান যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থায় রানার বা পোস্ট অফিস দুজনের গুরুত্ত্বই কমতে কমতে এখন প্রায় তলানিতে৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও যে জিনিসের গুরুত্ব আজও কমেনি,বরং পৃথিবীর বিভিন্ন সংগ্রাহকদের কাছে বেড়েছে,সেটা হল পোস্টাল স্ট্যাম্প৷ হ্যাঁ,সেই স্ট্যাম্প যা ডাক ব্যবস্থার শুরু থেকে খামের গায়ে আটকানো হতো৷ যুগ পাল্টানোর সাথে এই পোস্টাল স্ট্যাম্পগুলোর ছবিও পাল্টেছে,তাই মনে করা হয় বিভিন্ন দেশের স্ট্যাম্প তাদের পরিবর্তিত কালচারের প্রতিফলন ঘটায়৷ যদিও এটি মাছের গ্রুপ এবং ভূমিকাটা বেশ লম্বাই হচ্ছে তবুও একটা ছোট্ট তথ্য দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না এখানে৷ পৃথিবীর প্রথম স্ট্যাম্প হল ১৮৪০ সালের ইংল্যান্ডের পেনি ব্ল্যাক স্ট্যাম্প যাতে রাণী ভিক্টোরিয়ার যুবতী বয়সের ছবি দেওয়া ছিল৷ এর সাত বছর পরে আমেরিকায় বেন্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের ছবি দেওয়া ৫ সেন্টের স্ট্যাম্প প্রচলিত হয়৷
যাক,গৌরচন্দ্রিকা বোধহয় একটু লম্বাই হল৷ এবার আমরা আমাদের পরিচিত আঁশটে গন্ধ পেতে চলেছি লেখায়৷ বিভিন্ন দেশের কালচারের সাথে বিভিন্নভাবে মাছ মিশে আছে৷ সেটা রোজকার খাদ্যতালিকায় হোক,রঙিন মাছের ক্ষেত্রেই হোক বা লোককথা,উপকথাতেই হোক৷ তো স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন দেশের স্ট্যাম্পে মাছের ছবির উপস্থিতিও খুব স্বাভাবিক৷ তো এই লেখায় আমরা দেখবো যে কিভাবে বিভিন্ন দেশের পোস্টাল স্ট্যাম্পে বিভিন্ন সময়ে মাছেদের ছবি উঠে এসেছে৷
পৃথিবীতে যেহেতু দেশের সংখ্যা একটু বেশীই,তাই আমাদের আলোচনার সুবিধার্থে আমরা মোটামুটি মহাদেশ হিসাবে ভাগ করে সেই মহাদেশের প্রধান প্রধান দেশগুলির মাছের ছবি সম্বলিত স্ট্যাম্পের ওপর নজর দেব৷ 'হোম সুইট হোম' নীতিতে বিশ্বাসী আমি নাহয় এশিয়া মহাদেশ এবং ভারত দিয়েই শুরু করি৷ কিন্তু প্রথমেই আপনাদের আশাহত করতে হবে৷ নদীমাতৃক দেশ হলেও আমাদের দেশে মাছের ছবি সম্বলিত স্ট্যাম্পের সংখ্যা মাত্র একটা,হ্যাঁ একটাই ১৯৭৫ সালে ছাপানো স্ট্যাম্প যেখানে চিঙড়ি,পমফ্রেড এবং কার্প জাতীয় মাছের ছবি আছে৷ সেই তুলনায় আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলির মাছের ছবি সম্বলিত স্ট্যাম্পের সংখ্যা অনেক বেশী৷ যেমন বাংলাদেশে ইলিশ ও পাবদা মাছের ছবি দেওয়া স্ট্যাম্প দেখা যায়৷ পাকিস্তানে কার্প জাতীয় মাছ, রুই (১৯৭৩), কাতলার ছবি দেওয়া স্ট্যাম্প আছে৷ সাথে আছে মহাশির (১৯৯৫) এর ছবি দেওয়া স্ট্যাম্প৷ শ্রীলঙ্কায় মাছের ছবি সম্বলিত স্ট্যাম্পের ভ্যারাইটি বেশ বেশী৷ চেরী বার্ব থেকে অর্নেট প্যারাডাইস, স্পটেড লোচ থেকে পাহাড়ি কার্পের ছবি ওদেশের স্ট্যাম্পে বেশ কমন৷ এই একদম প্রতিবেশী দেশগুলো ছেড়ে আমরা যদি এশিয়ার অন্য দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে ভিয়েতনাম,থাইল্যান্ড,ইরান এই দেশগুলিতে স্ট্যাম্পে মাছের ছবির প্রাচুর্য দেখা যায়৷ ভিয়েতনামে ১৯৮৪ সালে একটি ডেকরেটিভ মাছের ছবি সম্বলিত স্ট্যাম্পের সিরিজ বেরোয় যেখানে গোল্ডফিশ, এন্জেল, বেট্টা স্প্লেনডেনস, জেব্রা, ফ্লাইং ফিশ ও স্পটেড পরকুপাইন ফিশ এর ছবি দেখা যায়৷ থাইল্যান্ডে ঠিক একইরকম ভাবে একটি সিরিজ বেরোয় ১৯৬০ সালে যেখানে গোরামি, রেড টেইল শার্ক, ক্যাটফিসের ছবি থাকে৷ এছাড়াও ম্যাকরেল,কার্প জাতীয় মাছের স্ট্যাম্পও দেখা যায়৷ ইরানে আবার এরমই এক সিরিজ দেখা যায় কিন্তু সেটা মেরিন ফিশের৷ আমি সেগুলোর ল্যাটিন নামগুলোই দিচ্ছি৷ Chaetodontoplus septentrionalis, Carassius auratus, Chaetodon larvatus, Pomacanthus maculosus. এরপর চোখ রাখা যাক জাপানে যেখানে ১৯৬৬ সালে গোল্ডফিশের ছবি সম্বলিত স্ট্যাম্প বেরোয়৷ এছাড়াও স্টিকলব্যাক ফিশের আরেকটি স্ট্যাম্প দেখা যায়৷ কোরিয়ায় মাছের ছবির স্ট্যাম্প এর মধ্যে অন্যতম হল জায়ান্ট ওরফিশ আর স্যামন৷
এবার এশিয়া ছেড়ে একটু পশ্চিমে, ইউরোপে পা বাড়ানো যাক৷ ইউরোপের সর্ববৃহৎ দেশ,রাশিয়ায় প্রধান যে তিনটি মাছের স্ট্যাম্প দেখা যায় সেগুলি হলো বাল্টিক সাগরের ঈলমাছ, পিকারেল এবং বৈকাল হ্রদের স্টার্জিয়ন৷ অদ্ভূদভাবে জার্মানির স্ট্যাম্পের মাছগুলো আমাদের বড্ডো চেনা৷ যেমন মধু খলসে, রেমিরেজি, বার্ব, টেট্রা৷ ইংল্যান্ডে আবার দেখা যায় সামুদ্রিক মাছের আধিক্য যেমন স্যামন, হেরিং, কর্নিশ সার্ডিন,স্পাইনি ডগফিশ ও উল্ফফিশ৷ এদের মধ্যে শেষের দুটি বিলুপ্তপ্রায়,তাই স্ট্যাম্পেই 'Threatened' কথাটি উল্লেখ করা আছে৷ ফ্রান্স ও স্পেন এই দুই দেশের স্ট্যাম্পেই কমন মাছটি হল স্যামন৷
এবার আসা যাক সেই মহাদেশে যেটা আমাদের,মাছ পুষিয়েদের কাছে হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয়,আফ্রিকা! আফ্রিকার কেনিয়ায় ২০০৬ সালে ছাপানো হয় একাধিক নাইল পার্চের স্ট্যাম্প৷ সাথে রয়েছে আমাদের পরিচিত হ্যাপলোক্রোমিস৷ তবে মাছের ছবির স্ট্যাম্প সবচেয়ে বেশী আছে উগান্ডা, নাইজিরিয়া আর দক্ষিণ আফ্রিকায়৷ উগান্ডায় তেলাপিয়া, সার্পে টেট্রা, বার্ব, মার্বেলড লাঙফিস, সোর্ডফিস এদের ছবি দেখা যায়৷ নাইজিরিয়ায় আবার ক্যাটফিসের বিভিন্ন প্রজাতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যেমন ইলেকট্রিক ক্যাটফিস৷ তার সাথে আছে তেলাপিয়া, নাইজার পার্চ, চিঙড়ি আর লঙ নেক ক্রোকার ফিস৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০১ সালে মেরিন মাছের ছবি সম্বলিত একটি স্ট্যাম্পের সিরিজ বের করা হয় যা বেশ জনপ্রিয় হয়৷ তার মধ্যে অন্যতম হল পাউডার ব্লু সার্জিয়ন, মুরিশ আইডল, কোরাল বিউটি, গ্যালজিওন ফিস৷ মরোক্কোর স্ট্যাম্পে দেখতে পাওয়া যায় ঈল, ব্লু ফিশ আর মেরিন লবস্টারের ছবি৷ জিম্বাবোয়েতে কিন্তু মাছের থেকে মাছ ধরার ছবি স্ট্যাম্পে বেশী প্রাধান্য পেয়েছে৷ সাথে আছে ইস্টার্ন বটল নোজ ফিসের একটা সুন্দর স্ট্যাম্প৷
কিন্তু মাছপুষিয়েদের মানচিত্রে সেভাবে জায়গা করতে না পারলেও মাছের স্ট্যাম্পের প্রাচুর্যে বোধহয় অন্য সব দেশকে ছাপিয়ে গেছে ওশিয়ানিয়া মহাদেশের অতি পরিচিত দেশগুলো৷ যার মধ্যে অন্যতম হল অষ্ট্রেলিয়া৷ চারপাশ সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ার জন্যই হয়তো এদেশে সামুদ্রিক মাছের রমরমা বেশী৷ এদেশে স্ট্যাম্পে জায়গা পাওয়া মাছগুলোর মধ্যে প্রধান হল কোরাল ফিশ, স্পটেড সুইটলিপস, এনোমেনি ফিস, ব্লু লাইনড সার্জিয়ন, কোরাল রেবিট ফিস৷ এছাড়াও আছে হামবাগ ফিশ, ক্র্যাব আইড গোবি, ব্ল্যাক মার্লিন, টাইগার শার্ক৷ শুধুমাত্র মাছের ছবি নয়,সাথে সচেতনতার পাঠও পড়ায় এই স্ট্যাম্প৷ তাই টাইগার ফ্ল্যাটহেড, প্যাটাগরিয়ান টুথফিস, ব্লু গ্রিনাডিয়ার এই মাছগুলোর স্ট্যাম্পে লেখা "Sustainable fish"৷ প্রতিবেশী দেশ নিউজিল্যান্ডও দৌড়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই৷ এদেশের স্ট্যাম্পে দেখা যায় বিভিন্ন প্রজাতির ট্রাউটের ছবি,যেমন ব্রুক ট্রাউট, ব্রাউন ট্রাউট, রেনবো ট্রাউট৷ সাথে রয়েছে স্কারলেট প্যারট ও সোর্ডফিস৷ এই সামুদ্রিক মাছগুলোর সাথে সাথে স্থানীয় মিষ্টিজলের মাছেদেরকেও যে এই দেশ ভোলেনি তার প্রমাণ পাওয়া যায় একটা সিরিজে যেখানে আছে টর্ডেন্ট ফিশ, লঙফিন ঈল, রিওফিন বুলি ইত্যাদি মাছ৷ পাপুয়া নিউগিনির স্ট্যাম্পে আবার আমরা দেখি আমাদের কিছু পরিচিত মাছের ছবি,যেমন প্যারাডাইস গোরামি, রেনবো, গোবি৷ ফিজিতে যে স্ট্যাম্পগুলো দেখি সেগুলো হল ক্লাউন ট্রিগার ফিশ, কড, ইয়োলো ফিন টুনা, ঈল মাছের৷
এবার আমাদের শেষ গন্তব্য হল ট্রাম্পজেঠুর দেশ৷ যদিও সেখানে মাছের ছবিওয়ালা স্ট্যাম্পের সংখ্যা বেশী নয়৷ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মিলিয়ে মিশিগান,কিউবা, ভেনেজুয়েলা,গায়ানা এই সব প্রদেশে তুলনায় এই ধরণের স্ট্যাম্প বেশী দেখা যায় যেগুলো মোটামুটি ওই ট্রাউট, স্যামন, কড,টুনা, ক্যাটফিশের মধ্যে ঘোরাফেরা করে৷ শুধু ভেনেজুয়েলায় পিরানহা মাছের ছবিযুক্ত একটা স্ট্যাম্প পাওয়া যায়৷
তো এই হল আমাদের মাছেদের ছবির গপ্পো৷ দেশভেদে মাছের ধরণ অন্য অন্য হলেও সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে,যার মধ্যে কিছু আমি আপনাদের বল্লাম, স্ট্যাম্পে মাছেদের উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে, জীবিকায় ও শখে মাছ কতটা গুরুত্ত্বপূর্ণ৷ আবার বিভিন্ন স্ট্যাম্পে বিলুপ্তপ্রায় মাছেদের ছবি মৎস্যপ্রেমী ও পরিবেশপ্রেমী হিসাবে আমাদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দেয়৷ আশা করি এই লেখা আমাদের আরো সচেতন করতে পারবে৷ সাথে রইল বিভিন্ন দেশের স্ট্যাম্পের কিছু ছবি৷












কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন