আমরা শৈশব থেকেই শিখেছি যে নায়ক মানেই ভালো আর ভিলেন মানেই খারাপ। রূপকথা ও ডিজনি সিনেমাগুলোতে ভালো ও মন্দ একেবারে আলাদা করে দেখানো হয়। সবাই সবসময় নায়কের পক্ষেই থাকে। কিন্তু আজকাল দেখা যাচ্ছে, ভিলেনরাও আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। যেমন, জোকার, মালেফিসেন্ট, লোকি, ডার্থ ভেডার—আমরা কি বুঝতে পারছি যে তারা আসলে এতটা খারাপ নয়? নাকি আমরা নিজেরাই ধীরে ধীরে ডার্ক সাইড-এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি?
মানুষ সাধারণত নিজেদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখে। তারা মনে করে "আমি একজন ভালো মানুষ।" আর এই ধারণা রক্ষা করার জন্য এমন কিছু এড়িয়ে চলে যা তাদের আত্মসম্মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ নিয়েও হয়েছে গবেষণা। গবেষকরা জানতে চেয়েছিলেন, মানুষ কি ভিলেনদের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিত্বের অন্ধকার দিকগুলো নিরাপদে দেখতে চায়?
উদাহরণস্বরূপ, হ্যারি পটার গল্পে ভলডেমর্ট হ্যারিকে বলেছিল, "তুমি আর আমি অনেকটা একরকম।" কিন্তু হ্যারি সাথে সাথে সেটা অস্বীকার করেছিল। বাস্তবে, মানুষও এরকম আচরণ করে। তারা এমন কোনো তথ্য বা কথা এড়িয়ে চলে যা তাদের ভালো ইমেজ নষ্ট করতে পারে।
তবে কল্পিত ভিলেনদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। আমরা যদি এমন ভিলেনের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করি, যারা বাস্তব নয় যেমন ম্যাগনিটো তাহলে সেটা আমাদের তেমন হুমকির মুখে ফেলে না।
গবেষক রেবেকা ক্রাউস এবং ডেরেক রাকার এই বিষয়ে কয়েকটি পরীক্ষা চালান। তারা দেখতে চেয়েছিলেন, মানুষ কল্পিত ভিলেনদের প্রতি আকৃষ্ট হয় কি না এবং কেন তারা তাদের পছন্দ করে।
তারা দেখেন, ভিলেনদের কাহিনি আমাদের এমন একটা জায়গা করে দেয়, যেখানে আমরা নিজেরা নিজেদের ডার্ক সাইডগুলো দেখতে পাই। কিন্তু সেই দিকগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করা অনৈতিক এবং অসম্ভব। ভিলেনরা আমাদের সেই দিকগুলো ভাবতে সাহায্য করে, যা বাস্তবে আমরা কখনোই করতে পারব না।
গবেষকরা দেখেন, মানুষ তাদের নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে এমন চরিত্রদের বেশি পছন্দ করে। এটা পরীক্ষা করার জন্য একটা ওয়েবসাইট, CharacTour, ব্যবহার করা হয়। এখানে একটা কুইজ ছিল যেখানে অংশগ্রহণকারীরা ১ থেকে ৫ পর্যন্ত একটি স্কেলে উত্তর দেয়। যদি তাদের ব্যক্তিত্ব কোনো চরিত্রের সঙ্গে মেলে, তাহলে তারা ১ বা ২ পয়েন্ট দেয়। যদি মেলে না, তাহলে ৪ বা ৫ পয়েন্ট। ৩ পয়েন্ট মানে নিরপেক্ষ।
উদাহরণস্বরূপ, যারা খুব চঞ্চল এবং কথা বলতে ভালোবাসে, তারা শ্রেকের ডঙ্কির সঙ্গে বেশি মিলে। আর যারা শান্ত প্রকৃতির, তারা গ্রুটের সঙ্গে মিলে। কুইজে ভিলেনদের– মালেফিসেন্ট, জোকার, ডার্থ ভেডার এবং নন-ভিলেনদের ইয়োডা, শার্লক হোমস, জোই ট্রিবিয়ানি কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ এমন চরিত্রদের বেশি পছন্দ করে, যাদের ব্যক্তিত্ব তাদের নিজের মতো। যারা ভিলেনদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে, তারা ভিলেনদের ফ্যান হয়। আর যারা নন-ভিলেনদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে, তারা তাদের ফ্যান হয়।
প্রথম গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ কল্পিত চরিত্রদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এরপর গবেষকরা দেখতে চেয়েছিলেন, এই প্রবণতা কি বাস্তব জীবনের ভিলেনদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য?
দ্বিতীয় গবেষণায় নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ১০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের ১৪টি কুইজ দেওয়া হয়, যেখানে কল্পিত নায়ক, কল্পিত ভিলেন, বাস্তব নায়ক এবং বাস্তব ভিলেনদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।।শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, বাস্তব ভিলেনদের নিয়ে কুইজ নেওয়া তাদের জন্য খুব অস্বস্তিকর। তবে, কল্পিত ভিলেনদের সঙ্গে তুলনা করতে তারা অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছে।।গল্পের ভিলেনরা আমাদের এমনভাবে ভাবায়, যেখানে আমরা নিজেদের খারাপ দিকগুলো ভাবতে পারি।
গবেষণায় দেখা গেছে, যদি কেউ একা একা সিনেমা দেখে, তাহলে তারা এমন ভিলেন বেশি পছন্দ করে যারা তাদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে। কিন্তু যদি অন্য কারও সঙ্গে অর্থাৎ বন্ধুবান্ধবদের বা প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে সিনেমা দেখতে হয়, তাহলে তারা ভিলেনের মতো চরিত্র বেছে নিতে কম আগ্রহী। কারণ তারা মনে করে, এতে অন্যের কাছে তাদের সামাজিক ইমেজ নষ্ট হতে পারে।
একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের তাদের একজন বন্ধু বলেছিল, 'তুমি এই ভিলেনের মতো!' তারপর দেখা গেছে, এই ধরনের মন্তব্য মানুষকে সিনেমার ভিলেন বেছে নিতে আরও কম আগ্রহী করে তোলে।
গবেষণার ফলাফলে জানা গেছে, কল্পিত ভিলেনরা আমাদের নিজেদের অন্ধকার দিকগুলো চিনতে সাহায্য করে। তবে সেটা এমনভাবে হয় যাতে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ বা আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মানুষ তখনই ভিলেনদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে বেশি আগ্রহী হয়, যখন তাদের সামাজিক ইমেজ হুমকির মুখে থাকে না।
সর্বশেষে বলা যায় আমরা ভিলেনদের পছন্দ করি কারণ তারা আমাদের ব্যক্তিত্বের অজানা দিকগুলো দেখতে সাহায্য করে। তবে, এই আকর্ষণ তখনই কাজ করে, যখন সেটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে এবং আমাদের সামাজিক অবস্থানে কোনো প্রভাব ফেলে না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন