**কেশবপুরের রক্তাক্ত শিমুলতলা**
আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে, কেশবপুর নামে এক গ্রামে রাত নামলেই মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে আসত। সন্ধ্যার পর থেকে গ্রামের পথঘাট নিস্তব্ধ হয়ে যেত। দরজা-জানালা বন্ধ করে লোকজন ঘরে আটকে থাকত। কারণ, রাতের অন্ধকারে এক অজানা ভয়ঙ্কর শক্তি প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলত। প্রতি রাতে দুই-তিনটে অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটত, আর সেগুলো এতই ভয়াবহ ছিল যে গ্রামের মানুষের হৃৎপিণ্ড কেঁপে উঠত।
কারও ঘাড় মটকে দেওয়া হতো, কারও বুক ফুঁড়ে হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে ফেলা হতো। কোনো লাশের চোখ উপড়ে ফেলা হতো, কারও চোখই থাকত না—যেন কেউ গুঁড়িয়ে নিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে আতঙ্কজনক ছিল, লাশগুলো সব একই জায়গায় পাওয়া যেত—গ্রামের প্রাচীন শিমুল গাছের তলায়, যার বিশাল ছায়া দিনের বেলাতেও মানুষের মনে অস্বস্তি জাগাত। শিমুলতলার মাটি যেন রক্তে ভেজা, আর গাছের ডালে অদ্ভুত একটা ঠান্ডা হাওয়া বইত, যা শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে দিত।
গ্রামের মানুষ ভয়ে কথা বলত ফিসফিস করে। কেউ বলত, এটা কোনো শয়তানের কাজ। কেউ বলত, শিমুল গাছের তলায় পোঁতা আছে অভিশপ্ত কোনো আত্মা। কিন্তু কেউই সত্যিটা জানার সাহস করেনি। প্রতি রাতে মৃত্যুর এই খেলা চলতেই থাকল। গ্রামের বুড়োরা বলত, “শিমুলতলায় যাস না, ওখানে মানুষের রূপে অমানুষ ঘোরে।”
এই আতঙ্কের মাঝে গ্রামের পাঁচ যুবক—রহিম, কাশেম, সেলিম, আজিজ আর ফরিদ—ঠিক করল, তারা এই রহস্যের জাল ছিঁড়বে। তাদের বুক ভরা যৌবনের জোয়ার আর মনে অদম্য কৌতূহল। তারা জানত, মুরুব্বীরা এই পরিকল্পনায় রাজি হবেন না। তাই গোপনে, এক পূর্ণিমার রাতে, তারা শিমুল গাছের মগডালে আশ্রয় নিল। হাতে লাঠি, মুখে দুঃসাহস, আর মনে এক অজানা ভয়। তারা ঠিক করল, রাতভর পাহারা দেবে, দেখবে কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে।
চাঁদের আলোয় শিমুল গাছের ছায়া মাটিতে দানবের মতো লম্বা হয়ে পড়েছিল। গ্রাম নিঝুম, কেবল ঝিঁঝিঁর ডাক আর দূরের কুকুরের কান্না ভেসে আসছিল। পাঁচ যুবক গাছের ডালে বসে অপেক্ষা করছিল, চোখে ঘুম নেই, কান খাড়া। মাঝে মাঝে হাওয়ায় শিমুল গাছের পাতা নড়ে উঠত, আর তাদের বুক ধড়ফড় করত।
রাত গভীর হলো। হঠাৎ, দূর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এলো—যেন কেউ পা টেনে টেনে হাঁটছে। শব্দটা ক্রমশ কাছে এলো। পাঁচ জোড়া চোখ শিমুলতলার দিকে স্থির। তখনই তারা দেখল—একটা কালো, বিশাল আকৃতি। প্রায় বারো ফুট লম্বা, শরীরে কালো লোমের জঙ্গল। মুখটা হায়েনার মতো, দাঁতগুলো চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে। হাতে তার একটি লাশ, রক্তে ভেজা, মুখ ফ্যাকাশে।
দানবটা শিমুলতলায় এসে লাশটা মাটিতে ফেলল। তারপর সে লাশের ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল। দাঁতগুলো মাংস ছিঁড়ে রক্ত চুষতে শুরু করল। রক্তের গন্ধে শিমুলতলা ভারী হয়ে উঠল। পাঁচ যুবকের শ্বাস আটকে গেল। ভয়ে তাদের হাত-পা ঠান্ডা। সেলিমের হাত থেকে লাঠি পড়ে গেল, আর সেই শব্দে দানবটা মুখ তুলল। তার চোখ দুটো লাল, জ্বলন্ত কয়লার মতো। সে এক পলক গাছের দিকে তাকাল, আর তারপর—চোখের পলকে উধাও!
ফরিদ ভয়ে চিৎকার করে উঠল। তার চিৎকারে গ্রামের কুকুরগুলো ডেকে উঠল। পাঁচ জন তড়িঘড়ি গাছ থেকে নেমে দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটল। তাদের মুখ ফ্যাকাশে, শরীর কাঁপছে। পরদিন সকালে তারা গ্রামের মানুষকে সব খুলে বলল। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না। কেউ বলল, “ওরা পাগল হয়ে গেছে।” কেউ বলল, “শিমুলতলার ভূত ওদের মাথা খেয়েছে।”
কিন্তু এর সাত দিনের মাথায় ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে শুরু করল। রহিম এক রাতে পুকুরে ডুবে মারা গেল, অথচ সে সাঁতার জানত। কাশেমের বুকে অদ্ভুত কালো দাগ দেখা গেল, আর তিন দিনের মাথায় সে কালাজ্বরে মারা গেল। সেলিম এক রাতে বাড়ি ফেরার পথে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাথা ফেটে মরল। আজিজের শরীরে রক্ত শুকিয়ে গেল, যেন কেউ তার প্রাণ চুষে নিয়েছে। আর ফরিদ? সে এক রাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে করতে মারা গেল, তার চোখ দুটো খোলা, যেন কিছু দেখে ভয়ে পাথর হয়ে গেছে।
গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। লোকজন বলতে লাগল, “শিমুলতলার দানব ওদের শাপ দিয়েছে।” এই সময় গ্রামে এলেন এক হুজুর, যিনি অলৌকিক শক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি শিমুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কিছু মন্ত্র পড়লেন। তারপর গ্রামের চার কোণায় আটটি তাবিজ আর শিমুল গাছের গোড়ায় একটি কবচ পুঁতলেন। পুঁততে পুঁততে তিনি বললেন, “এই অশুভ শক্তি এখন বন্দী। কিন্তু শিমুল গাছের ছায়ায় কেউ যেন না যায়।”
সেই থেকে কেশবপুরে আর কোনো অপমৃত্যু ঘটেনি। শিমুল গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার তলায় কেউ যায় না। গ্রামের বুড়োরা বলে, রাতের বেলা শিমুলতলায় এখনো অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়—যেন কেউ রক্তের জন্য হাহাকার করছে। আর পূর্ণিমার রাতে, শিমুল গাছের ছায়ায় একটা কালো আকৃতি নাকি এখনো ঘোরে, তার লাল চোখ জ্বলে ওঠে, আর মুখে থাকে রক্তের দাগ।
কেশবপুরেররহস্য
শিমুলতলারদানব
ভৌতিকগল্প
গ্রামবাংলারআতঙ্ক
রক্তাক্তশিমুলগাছ
থ্রিলারগল্প
ভয়েররাত
অলৌকিকঘটনা
বাংলারভূতেরগল্প
সাসপেন্সওআতঙ্ক
পূর্ণিমাররহস্য
কালোছায়ারখুনি
গ্রামেরগোপনরহস্য
শিমুলতলারশাপ
ভয়ঙ্করঅভিজ্ঞতা
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন