⛔ ছায়া হাঁটে নুপূরের ছন্দে⛔
(✍️ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি পাঠিয়েছেন মাহিয়া আক্তার ✍️)
রাতের নীরবতা কখনও কখনও এতটাই গভীর হয় যে, সেখানে অজানা কিছু উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন এক নিঃস্তব্ধ, অন্ধকার রাত ছিল সেটি—যেখানে বাতাস থেমে গিয়েছিল, চারদিক নিথর হয়ে পড়েছিল, আর কেবলই শোনা যাচ্ছিল এক অদ্ভুত, ঠান্ডা কাঁপিয়ে দেওয়া নুপূরের শব্দ।
ঘটনাটি ২০০৮-২০০৯ সালের দিকে। আমার বয়স তখন মাত্র ৩ বা ৪। মা আমাকে নিয়ে নানাবাড়ি গিয়েছিলেন, রায়পুরা, নরসিংদীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে। নানুর ঘর তখনো ঠিক আগেকার মতই ছিল—দোচালা টিনের ছাদ, কুয়োর পানি, আর রান্নাঘরটা ছিল ঘর থেকে আলাদা, একটু দূরে। সেদিন রাতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ রাত আনুমানিক ২টা বা ৩টা নাগাদ আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি মা-কে পানি খাওয়ার জন্য বায়না শুরু করি। মা প্রথমে আমাদের ঘরে, পরে পাশের ঘরে খুঁজে কোনো পানির সন্ধান পাননি। অবশেষে রান্নাঘরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন—যেখানে অন্ধকার, নীরবতা, আর অজানা কিছু অপেক্ষা করছিল।
রান্নাঘরের লাইটটা জ্বালানো ছিল। মা সেখানে গিয়ে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে আমাকে পানি খাওয়াচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই পাশের জঙ্গল থেকে এক অস্বাভাবিক শব্দ ভেসে আসে—নুপূরের টুংটুং আওয়াজ। প্রথমে মা ভেবেছিলেন, ওটা হয়তো মামাতো বোন মুক্তা, কিন্তু এরপরই চমকে ওঠেন—এই গভীর রাতে মুক্তা কেন জঙ্গলে যাবে? সেদিন চাঁদ ছিল না, চারদিক অন্ধকারে ঢাকা, আর জঙ্গল থেকে আসা সেই আওয়াজ যেন প্রতিধ্বনি হয়ে পুরো রান্নাঘর ঘিরে ধরছিল।
মা তখন একটুও দেরি না করে আমাকে কোলে নিয়ে দৌঁড়ে চলে আসেন ঘরের ভেতর। দরজা বন্ধ করে, গলা শুকিয়ে গিয়ে হাপাতে হাপাতে খাটে এসে শুয়ে পড়েন। ঘুমোতে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু... নুপূরের সেই টুংটুং আওয়াজ আবারো ভেসে এল। এবার তা যেন আরও কাছে, আরও জোরালো, আরও রহস্যময়। মা অনুভব করতে পারলেন—জঙ্গল থেকে সেই আওয়াজ বেরিয়ে এসেছে, আর এখন ঘরের পেছনের রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। ঠিক খাটের পাশে দিয়েই—আর প্রতিটি ধাপ যেন মায়ের বুকের ভিতর কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল।
মা জানান, সেই আওয়াজে কোনো মানুষের মতো ছিল না। ছিল না কোনো দৌড়, না কোনো হালকা পায়ের শব্দ—ছিল কেবল এক অশরীরী গতির ছায়া, যেটা মাটি ছুঁয়ে নয়, যেন বাতাস ছুঁয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে মা চোখ বন্ধ করে শুধু আল্লাহকে ডাকতে থাকেন। তিনি জানতেন, একটুও ভুল করলে কিংবা যদি একটু সাহস কম পেতেন, সেদিন হয়তো আমার বা তার জীবনে ঘটে যেতে পারতো চরম কোনো অঘটন।
আজও মা বলেন—সেদিন রান্নাঘরের লাইটটা না জ্বললে হয়তো সেই অলৌকিক উপস্থিতি তাকে দেখতে পেত না। আর অন্ধকারে কোনো ছায়ার আবরণে না গিয়ে সামনে চলে এলে, হয়তো কেউ ফিরতে পারতো না ঘরে।
এই ঘটনা শুধু একটি স্মৃতি নয়, আমাদের পরিবারের জন্য একটি চিরস্থায়ী অভিজ্ঞতা। নুপূরের সেই রাত, এখনও ঘুমের মাঝে কাঁপিয়ে তোলে মায়ের বুক। আর আমি, যাকে পানি খাওয়াতে গিয়ে ঘটে গিয়েছিল এমন এক অতিপ্রাকৃত রাত—আমিও বড় হয়ে এই গল্প শুনে ভাবি, রাত যত গভীর হয়, অজানার দ্বার তত বেশি খুলে যায়।
শেষে বলতে চাই, এই ঘটনাটি সত্য এবং একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার নিঃশ্বাস গলিয়ে লেখা হয়েছে। যারা ভাবেন সবকিছু বিজ্ঞানে ব্যাখ্যা করা যায়, তাদের উচিত এমন কিছু মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া—যেখানে নুপূরের একেকটি শব্দ মানেই মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যাওয়া।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন