এত রাতে পুকুরে কে গোসল করে? চৌকিদার মোতালেব টর্চ বন্ধ করে ঝোপের আড়ালে আড়ালে পুকুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আকাশে পূর্ণ চাঁদ। সেই আলোতে মনে হচ্ছে পুকুরের মাঝখানে একটা নারী মূর্তিই। টর্চ জ্বালালে অবশ্য মুখটা স্পষ্ট দেখা যাবে। কিন্তু এলাকার কোনো মেয়ে যদি হয়ে থাকে ওটা , তাহলে গোসল করার সময় মোতালেব তার দিকে আলো ফেলে দেখছিল এমন অভিযোগ তুললে একটা ভয়ঙ্কর কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে। তাই ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়েই সামনে বাড়তে লাগলো মোতালেব। অবশ্য স্থানীয় কোনো মেয়ের এই পুকুরে রাত ২ টায় এসে গোসল করার কোনো মানেই খুঁজে পেল না সে। এই পুকুরটা নিয়ে এমনিতেও গ্রামে অনেক লোককথা আছে। কিছুটা ভয়ও করছে তার।
পুকুরের একেবারে পাশের ঝোপের আড়ালে এসে লুকলো মোতালেব। ঝোপের সামনের কিছুটা অংশ সরিয়ে পুকুরের মাঝের মূর্তিটা চেনার চেষ্টা করছে। হ্যা , মুখ না দেখা গেলেও বোঝাই যাচ্ছে ওটা একটা মেয়ে। হঠাৎ কী হলো , পুরো শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লো মোতালেবের। পায়ে কিসের টানও লাগলো সাথে সাথেই। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল মোতালেব। গড়াতে গড়াতে একেবারে পুকুরের কিনারে এসে পড়লো। তার পড়ে যাওয়া দেখেই যেন পুকুরের মাঝখান থেকে মিষ্টি মেয়েলি কণ্ঠের খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে আসলো তার কানে ।
মোতালেব ঘাবড়ে গেছে । টর্চটা পুকুরের পানিতে ডুবে গেছে। ওটার আশা নেই। চাঁদের আলোয় অবশ্য দেখতে সমস্যা হচ্ছে না কিছু। সোজা হয়ে দাঁড়ালো মোতালেব। পুকুরের দিকে লক্ষ করে খেঁকিয়ে উঠলো সে :
কেগো এতো রাইতে গোসল করে?
আবার সেই খিলখিল হাসির শব্দ। শব্দটা এতই মিষ্টি যে রাতের নির্জনতা মোতালেবের মনে ভয় সঞ্চয় না করে উল্টো, কৌতূহল দিয়ে ভরে তোলে তার মন।
ঐতো মেয়েটা ধীরে ধীরে সাঁতরে এইদিকেই আসছে। পুকুরের একেবারে কিনারের দিকে কোমর সমান পানি। সেইখানেই এসে দাড়ালো মেয়েটা। মুখে মিষ্টি হাসি। বিস্মিত দৃষ্টিতে তীব্র জোৎস্নার আলোতে অপরূপ সুন্দর মুখায়বের দিকে চেয়ে রইলো মোতালেব। জলপরী! কখন যে মেয়েটার এই মায়া রূপে সম্মোহিত হয়ে গিয়েছে সে টেরই পায়নি। মেয়েটা এবার বাঁশির মতো সুরেলা কণ্ঠে বলল :
আমারে চিনো নাই মোতালেব ? কাবিলের বউ। কী যে গরম পড়ছে আইজ তাই নাইতে আইলাম।
চিনেছে এমন ভাবে মাথা ঝাঁকালো মোতালেব। অথচ কাবিল নামের কাউকেই সে চেনে না। আবার সেই মেয়েটি বলল:
তুমিও দেখি ঘামতাছ মোতালেব! আসো পুকুরে , এক সাথে স্নান দেই ।
পানির সাথে শাড়ি কাপড় শরীরে লেপ্টে থাকায় এমনিতেও মোতালেব মেয়েটার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। এবার মেয়েটা আঁচল খুলে কোমর সমান পানিতে ফেলে দিতেই তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে এলো। মেয়েটা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে পুকুরের দিকে , মোতালেব পুকুরের পানিতে পা ভিজিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা আবার সেই সুরেলা কণ্ঠের খিলখিল হাসির শব্দ করে ঘুরে একেবারে পুকুরের মাঝখানে চলে গেল। আচ্ছন্নের মতো সাঁতরে মোতালেবও পিছু নিল মেয়েটার।
মেয়েটা তার দিকে পিঠ দিয়ে ভেসে আছে পানিতে। নগ্ন পিঠের থেকে তিন হাত পেছনে মোতালেব। হঠাৎ মেয়েটার চেহারা কেমন যেন বদলে গেল। শাড়ি কাপড়ের বদলে পরনে সালোয়ার-কামিজ , পূর্ণ যুবতী মেয়েটা সেই সাথে একটা কিশোরী মেয়েতে রূপান্তরিত হলো। গায়ের রং পেছন থেকে দেখেও বোঝা যাচ্ছে শ্যামলা। এতক্ষণে হুস ফিরলো মোতালেবের। নিজেকে এই অবস্থায় পুকুরের মাঝে দেখে ঘাবড়ে গেল সে। কী হচ্ছে! মেয়েটা ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরলো।
মৃত মানুষের দৃষ্টি চোখে , মুখ রক্তশূন্য ফ্যাকাশে , চোখের মণি সহ সাদা অংশ পুরোটাই লাল , এগিয়ে আসছে তার দিকে। মেয়েটা হা করতেই কালো কুচকুচে জিহ্বা বেরিয়ে পড়লো। ভয়ে চিৎকার দিতে গিয়ে মোতালেব অনুভব করলো তার কন্ঠ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। মেয়েটার পুরো শরীরে এবার পোকা কিলবিল করতে দেখলো সে। পঁচা মাংসের গন্ধ!
দম আটকেই মরে যেত মোতালেব। হঠাৎ অনুভব করলো শিকড় বা লতার মতো কিছু পেঁচিয়ে ধরেছে ওর পা। আস্তে আস্তে কোমর পর্যন্ত পেঁচিয়ে ধরলো ওটা ওকে। মেয়েটা এবার তার মুখোমুখি এসে পড়েছে , পানিতে ভাসছে। কী ভয়ংকর চেহারা! এই মেয়েটাকে মোতালেব চেনে , কিন্তু এরতো এখন এখানে থাকার কথা না। ভয়ংকর এক শব্দহীন হিংস্র হাসি ফুটে উঠলো মেয়েটার মুখায়বে। সাথে সাথেই কোমরে একটা টান অনুভব করলো মোতালেব । কিছু একটা তাকে পানির নিচে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার খিলখিল শব্দ তার কানে বাজছে। লতাটা তার গলা পেঁচিয়ে ধরেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।
পরদিন সকালে পানি আনতে গিয়ে মাদবর বাড়ির বউই প্রথমে মোতালেবের লাশটা পুকুরে ভাসতে দেখে। চিৎকার করতে করতে ছুটে পালায় সে হাঁড়ি ফেলে। লোক জড়ো হয় , পুলিশ আসে। কেউ মৃত্যুর সঠিক কারণ কিনারা করতে পারে না। তদন্তের জন্য মোতালেবের লাশ শহরে নিয়ে যায় পুলিশ।
পরদিন সেই গ্রামেরই একটু চায়ের দোকানে কয়েকজন মধ্য-বয়স্ক লোকের আড্ডা বসেছে। আলোচ্য বিষয় মোতালেবের মৃত্যু।
শুনছো নি মিয়া , মাতবর বাড়ির পুকুরে তো আবার 'দেও ' ফিরা আইছে!
'দেও'! তোমার কী মনে হয় মোতালেবরে 'দেও' মারছে ?
তো আর কী ? মনে নাই ৩ বছর আগে হোসেনের মাইয়া গোসল করতে গিয়া নিখোঁজ হইয়া গেল ? আর ২ দিন পর ঐ পুকুর থিকাই ওর লাশ ভাইসা উঠলো? মোতালেবতো সাঁতার জানে , পুকুরে ডুইবা মরবো কে? 'দেও' ছাড়া আর কার কাম?
তাইতো! এই দুইটা খুনই তাইলে ঐ 'দেও' এর কাজ!
ওগো কাজইতো এইডা। পুকুরে থাকে। একলা মানুষ পাইলেই নানান মানুষের ছুরুত ধইরা পানিতে নামান। নামলেই কাম সাবার। পানির তলে নিয়া গলা টিপ্পা মাইরা ফেলে।
হ। আমরা ছোটবেলায় কত শুনছি এইসবের কথা! কিন্তু আমার বয়সকালে এই প্রথমবার দুইটারে মরতে দেখলাম 'দেও' এর হাতে।
এক মাস পর :
সি.এন.জি এসে দাড়ালো মিঞাপুর গ্রামের অনতিদূরে উপজেলার সামনে। আর ভেতরে সি.এন.জি যেতে পারবে না তাই গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন পেসেঞ্জার লোকটা। আশেপাশের কয়েকটা দোকানদার, ক্রেতা আর পথচারী কৌতূহলী হয়ে লোকটার দিকে তাকালো। গেরুয়া লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরা ৩০-৩২ বছরের লোকটা। চুল-দাড়ি বড়বড় , মুছ ছাটা। গলায় একটা গেরুয়া গামছা। পায়ে চটি। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে একটা চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে মিঞাপুর গ্রামের ঠিকানা জানতে চাইলেন আগন্তুক। সবাই পশ্চিম দিকে ধান ক্ষেতের মাঝখানের আইলটা দেখিয়ে দিল।
ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে হাঁটা ধরলেন তিনি। ৩ ফুট প্রস্থের লম্বা আইল। দুইপাশে ধানক্ষেত। দিনটাকে সুন্দর বলা যায় না। কড়া রোদ , সামান্য বাতাসও নেই, ভ্যাপসা গরম। পথিকের নাম রশিদ। পেশায় তন্ত্র সাধক। জ্বীন , ভুত , প্রেতাত্মা , পিশাচ নিয়েই তার কারবার। এমনিতে একটি সরকারি কলেজে অনার্স শেষ করেছেন তিনি। শখের বসেই এই পেশায় আসেন এক তান্ত্রিক ওস্তাদকে ধরে। নানান অলৌকিকতার অস্তিত্ব সামনে থেকে দেখে এই পেশাটাকে ধীরে ধীরে নেশায় নিয়ে এসেছেন তিনি। ওস্তাদ জালালুদ্দিন মাতব্বরের কাছেই অধিক তন্ত্র-মন্ত্র , পিশাচ দূরীকরণের উপায় শিক্ষা লাভ করেছেন। তার কথায়ই মিঞাপুর গ্রামে আসতে হয়েছে রশিদকে।
এই গ্রামে নাকি একটা পুকুরে 'দেও' অর্থাৎ পুকুরের পিশাচ আছে। এই পর্যন্ত তিনটা খুন করেছে ওটা। প্রায় ৩ বছর আগে ১৫ বছরের এক কিশোরী গোসল করতে এসে নিখোঁজ হওয়ার ২ দিন পর পুকুরে ওর লাশ দেখতে পাওয়া যায়। বাকি ২টা খুন হয়েছে গত এক মাসে। মিঞাপুর গ্রামের চকিদার মোতালেবের লাশ পাওয়া যায় পুকুরে ভাসমান এক সকালে। যেদিন লাশ পাওয়া যায় তার আগের রাতেও নাকি সবাই তাকে সুস্থ অবস্থায়ই ডিউটি করতে দেখেছে। এর পনেরো দিন পরেই মাতবর বাড়ির ছোট ছেলে বউয়ের নিষেধ না মেনে সকালে দাঁত মাজতে পুকুরে গেলে আর ফিরে আসেনি। অনেক খুঁজেও ওর লাশ পাওয়া যায়নি ঐদিন। কিন্তু দুই দিন পর ঠিকই লাশটা ভাসতে দেখা যায় ঐ পুকুরে।
এরপর থেকে একা কিংবা দল বেঁধে কেউই যায় না ঐ পুকুরে। অথচ আশেপাশের ১৫ ঘরকে ঐ পুকুরের পানি আশ্রয় করে চলতে হয়। একটা মাত্র টিউবওয়েল আছে এখন। তাই রশিদের এই গ্রামে আগমন। পুকুর থেকে 'দেও' তাড়িয়ে পুকুরটাকে অভিশাপ মুক্ত করতে হবে। .......
.
.
. . . চলবে . . .
.
.
#পুকুরের_প্রেত
১ম পর্ব
লেখা : #Masud_Rana
[ এটি ২০২১ সালে লেখা এবং ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ৮ পর্বের ধারাবাহিক ভৌতিক গল্প। গল্পের বাকি পর্বের লিংক কমেন্টে দিয়ে দেয়া হলো। আমার সব লেখা গল্পের লিংক এই পেজের পিনপোস্টে দেয়া আছে। ধন্যবাদ। ]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন