আসসালামু আলাইকুম। আজ আপনাদের সাথে একটি ঘটনা শেয়ার করব যেটা বেশ অনেকদিন ধরেই আমরা ফেইস করছি। সবচেয়ে বেশি ফেইস করছে মূলত আমার দাদি। তো শুরু করা যাক...
রাত তখন দুইটা বেজে পনেরো মিনিট। দাদির উচ্চকণ্ঠে আমার ঘুম ভেঙে যায়। বলে রাখা ভালো,রাতে আমি দাদির সাথে থাকি। দাদি আব্বু,চাচাদের জোরে জোরে ডাকছিলেন কিন্তু কেউই যেন সে আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল না। আমি ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
“কী হয়েছে? সবাইকে ডাকছো কেন?”
দাদি কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বললেন,
“আমার রুমে কে যেন এসেছে! বিছানায় উঠতে চাইছিল!”
আমি ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকালাম। অন্ধকারেও স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে কেউ নেই। আমি বললাম,
“কোথায়? কেউ তো নেই!”
“না,একটু আগেও ছিল। এখন হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেছে।”
আমি এবার উঠে রুমের লাইট জ্বালালাম৷ পুরো রুম জুড়ে চোখ বুলিয়ে কাউকেই দেখতে পেলাম না। দাদি তখনও ভয়ে বিছানার এককোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। দাদির অবস্থা দেখে বিষয়টা আমার কাছে মোটেও স্বাভাবিক মনে হলো না। আমি বললাম,
“এখানে বসে ডাকলে কেউ শুনবে না। চলো,আমার সাথে।”
দাদিকে সাথে নিয়ে আব্বু,ছোট চাচ্চু,বড়বাবাকে ডেকে তুললাম। তারা মূল ঘটনা জানতে চাইলে দাদি সব খুলে বললেন। দাদির ভাষ্যমতে,
ইদানীং দাদির রাতে খুব একটা ঘুম হয় না। ফলে রাতের বেশিরভাগ সময়ই কাটে নিদ্রাহীন। আজও একইভাবে সময় কাটছিল। সহসা দাদি খেয়াল করে,একটা কালো ছায়া,একদম মানুষের মতোই গড়ন,বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে চাইছে এবং দাদির দিকেই মুখ তুলে আছে৷ দাদি প্রথমে ভাবলো ঘরের কেউ কি এসেছে? পরক্ষণেই মাথায় এলো,ছায়াটা দেখতে বেশ বড়সড়। ঘরের বড়দের মধ্যে কেউ এলে এভাবে অন্ধকারের মাঝে কেন বিছানায় উঠতে চাইবে? তাও আবার হামাগুড়ি দিয়ে? হয় রুমের লাইট জ্বালাবে নাহয় দাদিকে ডাক দিবে। এমন অদ্ভুত কর্মকাণ্ড দাদির মনে ভীতির সৃষ্টি করে। তাই তিনি সবাইকে ডাকতে শুরু করেন৷ আশ্চর্যের বিষয় হলো,সবাইকে ডাকামাত্রই ছায়াটা অদৃশ্য হয়ে যায়।
আব্বু,চাচারা তখন পুরো বাসা ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করলেন। কিন্তু কোথাও কিছু দেখতে পেলেন না। তবে দাদি নিশ্চিত ছিল এটা কোনো মানুষ হতে পারে না। নাহলে কি এভাবে অদৃশ্য হয়ে যেত? কিন্তু বাসার কেউই তা বিশ্বাস করলো না। তারা এটাকে নিছকই একটা মনের ভ্রম ধরে নিল। যেহেতু দাদির বয়স হচ্ছে,সেইসাথে তিনি অসুস্থ সেহেতু মনের মাঝে এমন বহু কল্পনা আসে যেগুলোকে মনে হয় আমাদের চোখের সামনেই আছে,চোখের সামনেই সব ঘটছে। দাদিও তাদের যুক্তি প্রথমবারের মতো মেনে নিলেন।
এরপর থেকে ডাইনিং রুমের লাইট জ্বালিয়ে রাখা হতো। এটা মূলত দাদির মনের খচখচানি ভাবের জন্য। ডাইনিং রুমের লাইটে সব রুমই মোটামুটি আলোকিত হয় তাই ভয়টাও কম লাগে। সেদিনের এই ঘটনার পর দুই,তিনদিন আর তেমন কিছু ঘটেনি। কিন্তু এরপরই একদিন দাদি মাঝরাতে উঠে ওয়াশরুমে যায়। ওয়াশরুম থেকে যখন তিনি রুমে এসে বিছানায় উঠেন তখনই তিনি দেখতে পান ওয়ারড্রবের সাথে হেলান দিয়ে সাদা কাপড় পরিহিত কেউ বসে আছে। দাদি ভয়ে আর কিছু খেয়াল না করে অপর পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন আর মনে মনে দোয়া পড়তে থাকেন। এই ঘটনাটা দাদি কেবল আমার সাথেই শেয়ার করেন। আমিও আর কাউকে এ বিষয়ে কিছু বলিনি।
এর পরেরদিন রাতেই দাদি সম্মুখীন হয় এক ভয়ানক ঘটনার। এই ঘটনাটাও ঘটে রাত দুটোর সময়। দাদি দেখতে পায় একটা কালো ছায়া দাদির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং দাদিকে ধরার চেষ্টায় আছে। দাদি ভয়ে দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসে এবং ক্রমাগত পিছাতে থাকে। তিনি যতেই পিছিয়ে আসছেন,ছায়াটা ততোই এগিয়ে আসছে। সেদিন দুটো কালো ছায়ার উপস্থিতি ছিল। অপর কালো ছায়াটি পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। দাদি ভয়ে চিৎকার করছেন আর বলছেন,
“না,আমাকে না!”
কিন্তু ছায়াটির কোনো নড়চড় নেই। সে ঠিকই তার হাতদুটো বাড়িয়ে দাদিকে ধরার চেষ্টায় মত্ত। দাদি ভয়ে কোনো সূরাও ঠিকঠাক বলতে পারছেন না। তবে তিনি শুনেছেন ছায়াটা কিছু একটা বলছে কিন্তু কী বলছে তা ঠিক বুঝতে পারেননি। দাদির চিৎকারে প্রথমে ছোটচাচা ছুটে আসে। রুমের লাইট না জ্বালিয়েই দাদিকে এসে জড়িয়ে ধরে। ছোটচাচা আসার পরও ছায়াটা দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু দাদি ব্যতীত আর কেউ দেখতে পায়নি। পরক্ষণে,আব্বু,বড়বাবা,আম্মু,চাচি সবাই এসে রুমের লাইট জ্বালায় এবং দাদি স্পষ্ট দেখতে পায় ছায়াটা কিছু একটা বলতে বলতে অদৃশ্য হয়ে যায়।
প্রথমদিন দাদির ডাক কেউই শুনতে পায়নি তাই এরপর থেকে সবাই একটু সতর্কতার সাথেই ঘুমাতো যেন দাদি ডাকলে তারা শুনতে পায়। দাদি তাদের সব খুলে বলল। ঘটনা শুনে এবার তারাও কিছুটা ভয় পেল। সত্যিই কি তাহলে কিছু আছে? তখন বড়বাবা বলল,আর একদিন অপেক্ষা করতে। এই একদিনে দাদি আবারও সেই ছায়াটা দেখতে পায় কিনা তা জেনে তখন একজন হুজুরকে ডেকে আনবেন। সবাই মেনে নেয় তা।
এর পরেরদিন ভোরবেলা,ছয়টা বাজে। মূলত এই সময় ঘরের ভিতরটা আলোকিত হতে শুরু করে। কিন্তু সেদিন বাসার ভিতর দেখলে মনে হবে যেন ঘোর অমাবস্যায় ছেয়ে গেছে। কুচকুচে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে বাসার প্রতিটি রুম। সেদিন আবার,আমার চাচাতো ভাই জেগে ফোনে গেইম খেলছিল। হঠাৎ সে আড়চোখে দেখতে পায় যে,একটা কালো অবয়বের মতো কিছু একটা দাদির রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে৷ গেইম খেলায় মত্ত থাকায় সে বিষয়টাকে বিশেষ পাত্তা দেয়নি। ছায়াটা এবার দাদির দিকে না গিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসে এবং দুইহাত বাড়িয়ে আমাকে ধরতে চাচ্ছিল। ভাগ্যক্রমে,সেসময় দাদির ঘুম ভেঙে যায় এবং এই দৃশ্য দেখে তিনি চিৎকার করতে থাকেন। দাদির চিৎকারে সবাই ছুটে আসে এবং সবটা শুনে সিদ্ধান্ত নেয় যে আজকেই একজন হুজুরকে ডেকে আনবেন। বড়বাবা একজন হুজুরের সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলে হুজুর বলেন,এটা ভালো কোনো কবিরাজ ডেকে আনতে হবে। তবে তিনি বলেন,দাদির বয়স হচ্ছে তো তাই এটা মনের ভুলও হতে পারে৷ কিন্তু সবাই ততদিনে নিশ্চিত এটা কোনো মনের ভুল বা বিভ্রম নয়। এটা সত্যিই অশরীরী জাতীয় কিছু৷ কারণ,সবাই তখন বিষয়টা অনুভব করতে শুরু করেছিল। আম্মুর কাছে প্রায়ই মনে হয়,ডাইনিং রুম জুড়ে কেউ যেন হাঁটছে৷ মাঝে মাঝে মনে হয়,অদ্ভুত কণ্ঠে কেউ আম্মুর নাম ধরে ডাকছে। এর মাঝেই একটা বিশেষ দরকারে আমাদের গ্রামের বাড়ি চলে যেতে হয়। ফলে,গ্রামে যে কতদিন আমরা থেকেছিলাম সে কয়দিন আর বিশেষ কোনো সমস্যা হয়নি।
গ্রামে একজন পীরসাহেবের সাথে আব্বু বিষয়টা নিয়ে কথা বললে তিনি দাদিকে এবং আমাকে একটি তাবিজ দেন এবং বলেন তিনি একদিন বাসায় এসে বিষয়টা দেখতে চান। কিন্তু উনার নানা ব্যস্ততার কারণে আর আসতে পারেননি। এর মাঝেই আমরা গ্রাম হতে এসে পড়ি।
গ্রাম হতে আসার পর এর উৎপাত যেন আরও বৃদ্ধি পায়৷ দাদি মাঝরাতে দেখতে পেত,কালো ছায়াটা কিছুটা দূরে ঘুরঘুর করছে কিন্তু কাছে আসতো না। হয়তো তাবিজের কারণেই। কালো ছায়াটা বিকট শব্দ করতো,টেবিল,কাঁচের উপর করাঘাত করতো,রুম জুড়ে হাঁটতো। অপরদিকে,আমার চাচাতো ভাই সেদিন আড়চোখে ছায়াটাকে দেখার পর থেকেই কেমন যেন ভয় পেত সর্বদা। সাহসী ছেলেটা দিনদিন ভীতু হয়ে যেতে লাগল। ভয়ে নেতিয়ে থাকতো। ফলে,তার জন্যও তাবিজ আনা হয়। একদিন আম্মুর মনে পড়ে,আম্মুর এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় একজন ভালো কবিরাজ। তিনি দূর থেকে ঘটনা শুনেই বলে দিতে পারেন বিষয়টা আসলে কী। আম্মু ফোনে উনার সাথে যোগাযোগ করেন এবং সবকিছু খুলে বলেন। তিনি সবটা শুনে জিজ্ঞেস করেন,দাদি যখন ভয় পায় তখন উনার মুখ বেঁকে যায় কিনা বা মুখ কিছুটা বিকৃত হয়ে যায় কিনা। এই কতোদিনে দাদি যতোবারই ভয় পেতো,উনার মুখ সত্যিই কিছুটা বেঁকে যেত,দেখতে ভয়ংকর লাগতো। তখন সেই কবিরাজ বলেন,এটা আর কিছু না,এটা হলো পিশাচ। আর এই জাতীয় পিশাচকে বলা হয় 'দেউ পিশাচ'। তিনি বলেন,এরা বেশ লম্বা থাকে,নখগুলো থাকে বড় বড়,দাঁতগুলোও বড় থাকে। এদের দেহ কালো কুচকুচে এবং এরা একবার কোথাও প্রবেশ করলে সহজে বের হতে চায় না৷ এরা যাদেরকে ধরতে চায় মূলত তাদেরকেই দেখা দেয়। আর কেউ তাদের দেখতে পায় না। বিষয়টা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে যে,এটা দাদিকে ধরতে চাচ্ছে কারণ তিনি ব্যতীত আর কেউই ছায়াটাকে দেখতে পায়নি। আম্মু ভীষণ ভয় পেয়ে যায় এবং উনাকে অনুরোধ করে একদিন বাসায় এসে যেন দাদির শরীর এবং বাসাটাকে বন্ধ করে দিয়ে যায়। তিনি আশ্বাস দেন,অবশ্যই একদিন আসবেন।
আম্মু দাদিকে এ বিষয়ে কিছু বলেনি কারণ তিনি এমনিতেই ভয়ের মাঝে আছেন। এসব শুনলে উনার ভয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। কিন্তু দাদি একদিন বলেন,তিনি তো এতদিন কেবল ছায়াটাকে দেখেছেন,এবার একদম সশরীরে দেখতে পেরেছেন সেই ছায়াটার আসল রূপ। ডাইনিং রুমে রান্নাঘরের সামনে দাদির রুমের দিকে মুখ করে বসে ছিল। শরীরে কোনোরকম একটা কাপড় পেঁচানো,নখগুলো লম্বা লম্বা,দাঁতগুলো বড় বড়,কালো লোমে ঢাকা সম্পূর্ণ দেহ,মুখটা দেখতে কী বিশ্রী আর ভয়ানক! যেহেতু এটা দাদির থেকে দূরেই ছিল তাই দাদি মনে সাহস জুগিয়ে সূরা,আয়তুল কুরসি পাঠ করে ঘুমানোর চেষ্টা করেন। দাদির মুখে এমন বিবৃতি শুনে এবার সবাই নিশ্চিত হলেন এটা পিশাচই। কিন্তু কেন এটা দাদিকেই কেবল ধরতে চাচ্ছে,কী উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে,এর উদ্দেশ্য কি শুধুই দাদির ক্ষতিসাধন করা নাকি অন্যকিছু তা এখনও অজানা। কারণ,এখনও সেই কবিরাজ আসতে পারেননি। কিন্তু তিনিই বা আসতে কেন এতো দেরি করছেন,অপরদিকে গ্রামের সেই পীরসাহেবও যেন কিছু একটা লুকিয়ে গিয়েছিলেন যা উনার সাথে কথা বলার সময় আব্বু বুঝতে পেরেছিল- এসবই যেন রহস্যজনক। সেই রহস্যের বেড়াজালে আটকে রয়েছে আমাদের বাসার প্রতিটি মানুষ।
গল্পঃ পিশাচ
লেখকঃ মারিয়া আক্তার মাতিন
নিশিঃ S1-04
#Nishi
#NishiByMSS
#MymensinghShortStories
মেসেঞ্জারে আমাদের নতুন গল্পের আপডেট সবার আগে পেতে জয়েন করুন: https://m.me/j/AbaOm2llX93W0VYz/
-----------------------------------------------------------------
বিঃদ্রঃ গল্পের লেখার ছোট ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন; সম্ভব হলে মেসেজে জানাবেন। সবশেষে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না, কেমন লেগেছে আজকের গল্প।
-----------------------------------------------------------------
Disclaimer: The image is generated by AI and depicts a fictional scene intended for artistic and narrative purposes. It may contain elements that some viewers might find unsettling. Viewer discretion is advised. The content is meant to explore themes of suspense and is not intended to glorify or promote violence.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন