আমার মাঝে মাঝে মনে একটা প্রশ্ন জাগে।
তামিল চোল রাজারা খুব বড় যোদ্ধা ছিল বটে এবং অনেকেই বলে যে অর্ধেক দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার ছিল, তাও বঙ্গোপসাগর বা বে অফ বেঙ্গলের নামটা চোল বা তামিঝদের উপরে না হয়ে বে অফ বেঙ্গল কেন? যেই সাম্রাজ্য ও জাতির গুরুত্ব বেশি, ইতিহাসে তো তাদের উল্লেখ বেশি থাকার কথা। তাহলে কি আদতে তামিলদের থেকেও বাঙালিদের বিশেষ করে বাঙালি বণিক ও নৌযোদ্ধাদের গুরুত্ব বেশি ছিল?
এক স্থানে শুনেছিলাম যে চোলদের বিভিন্ন তাম্রপত্র ও মন্দিরগাত্রে ওদের সমস্ত সেনাবাহিনীর রেজিমেন্টের উল্লেখ থাকলেও নৌসেনার উল্লেখ নেই, সেটা কেমন করে হল? যে জাতির নৌবাহিনী ইন্দোনেশিয়া অবধি গেছিল তাদের নিজেদের কাগজে তাদের নৌসেনার উল্লেখ নেই কেন?
এদিকে আমাদের গ্রামের বাড়ি ময়নাগড়ের রাজা বাহুবলীন্দ্রদের কুলদেবতা শ্যামসুন্দর জিউর মন্দিরেরগাত্রে বড় বড় নৌকা ও তার উপরে চড়ে থাকা নৌসেনার চিত্র পাওয়া যায় (ছবি দ্রষ্টব্য)।
তাহলে কি ইতিহাসের একটা অধ্যায় আমরা এখনো আবিষ্কার করিনি? কারণ ইতিহাসে তাম্রলিপ্ত বন্দরের উল্লেখ তো সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে ১৩শতক অবধি পাওয়া যায়। ময়নাগড় থেকে তাম্রলিপ্ত বন্দরের দুরত্ব ২৬ কিলোমিটার। এই বন্দর থেকে যেমন বণিকরা যেতেন তেমন নিশ্চই নৌবাহিনীও যেতেন অন্য স্থানে? তাদের ইতিহাস কোথায় গেল?
আবার এরই সাথে যুক্ত ইতিহাসের আরেকটা অধ্যায় হল মগধ কলিঙ্গ যুদ্ধ। এই যুদ্ধ কি এমনি এমনি সংগঠিত হয়েছিল? মগধ কি ওড়িশার বীচ ঘুরতে আক্রমণ করেছিল? নাকি এর পিছনে ছিল একটা অর্থনৈতিক কারণ? কোন বিশেষ বন্দর ও তার ট্রেড রুটকে কন্ট্রোল করার ইচ্ছা না থাকলে এত বড় যুদ্ধ কেউ করে? সেই বন্দর যে তাম্রলিপ্ত আর সেই ট্রেড রুট যে দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তর কলিঙ্গ থেকে জাভা সুমাত্রা বোর্নিও তা বলাই বাহুল্য।
বাংলার ইতিহাসের একটা বিরাট অধ্যায় হল তার নৌবাহিনী, নৌসেনা ও বহির্বাণিজ্য। এখানে বাংলার বণিকসমাজের একটা বিরাট ভূমিকা আমরা কখনোই আলোচনা করিনা। অথচ করা উচিত। বাংলার উন্নয়নের সব থেকে বেশি প্রাপ্য কাদের? অবশ্যই বাঙালি বণিকদের।
অথচ জমিদারবাড়ির ইতিহাসের ভিড়ে বাংলার প্রাচুর্য্যের ইতিহাস হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে বাংলার নৌবাহিনী ও নৌসেনার ইতিহাস। হারিয়ে গেছে চাঁদ সদাগরের মতন বণিকদের ইতিহাস যাদের হাত ধরে বিশ্বের সব থেকে প্রাচুর্য্যে ভরা দেশ হয়েছিল এই বাংলা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন