⛔বেলুন⛔
(✍️ বাস্তবমুখী এই গল্পটি পাঠিয়েছেন: পারভেজ আল মুমিন ✍️)
সকালটা অন্যসব দিনের মতোই ছিল—নির্লিপ্ত, স্বাভাবিক। স্নিগ্ধা স্কুলে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ঘুম জড়ানো চোখে বেলুন চাইলো।
“ওই বেলুনওয়ালা আবার এসেছে মা!”
তার ছোট্ট আঙুলে ইশারা করা লাল বেলুনটি ছিল চোখ-মুখ আঁকা, অদ্ভুত এক হাসি লেগে থাকা মুখ। মা একটু বিরক্ত হয়েছিলেন, কারণ এই নিয়ে তৃতীয়বার একই বেলুন কিনতে চাইলো স্নিগ্ধা।
“এই বেলুনটা শেষবার কিনবো, তারপর আর না,” বলেই মা শেষ পর্যন্ত বেলুনটা কিনে দিলেন।
স্নিগ্ধা সেই বেলুনটা নিয়ে এতটাই খুশি হয়েছিল যে, তার মুখে তখনো যেন ছোট ছোট রঙিন হাসি ফুটছিল।
কিন্তু বিকেল হতেই সব উল্টে গেল। স্নিগ্ধা হঠাৎ নিথর হয়ে পড়েছিল। তার চোখ খোলা, অথচ তাতে প্রাণ নেই। মুখে এক ধরনের ফ্যাকাসে শান্তি, কিন্তু তা ছিল ভয়ংকর।
ডাক্তাররা বলেছিল “হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।”
তবে কি আট বছরের ছোট্ট মেয়েটার এমন হতে পারে?
মা শুধু স্নিগ্ধার জামাটা আঁকড়ে ধরেছিল। সেই জামা যার বোতাম সে প্রতিদিন সকালে নিজ হাতে লাগিয়ে দিত। জামাটার গন্ধে এখনো যেন স্নিগ্ধার শরীরের গরম শ্বাস মিশে আছে।
বাবা কিছু বলতে পারছিল না, ঠোঁট শক্ত করে শুধু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে জল ছিল না, কিন্তু ভেতরের ছাইচাপা আগুনটা যেন নিঃশব্দে পুড়ছিল।
স্নিগ্ধার মুখে তখনো ছিল সেই বেলুনের প্রতিচ্ছবি। বেলুনটা বিছানার এক পাশে চুপসে পড়ে ছিল। কেউ খেয়াল করেনি—এই চুপসে যাওয়া হাওয়াটাই যেন স্নিগ্ধার নিঃশেষ হওয়া প্রাণ।
কয়েকদিন পর, এক সন্ধ্যায় স্নিগ্ধার বাবা বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে নিচে চোখ পড়তেই দেখলেন—একজন বেলুনওয়ালা ডাস্টবিন থেকে কি যেন তুললো।
তার কাঁধে ছিল রঙিন বেলুনে ভরা এক বান্ডিল। হঠাৎ কেন জানি স্নিগ্ধার বাবার বুকটা ধক করে উঠলো।
এই বেলুনওয়ালাকেই সেদিন স্কুলের গেটের সামনে দেখেছিলেন! এই লোকটাই তো… এই লোকটাই স্নিগ্ধাকে চোখ-মুখ আঁকা বেলুন বিক্রি করেছিল!
এদিকে স্নিগ্ধার মা বারান্দায় এসে প্রতিবেশীর বাচ্চাকে সেই একই রকম বেলুন নিয়ে খেলতে দেখলো। এক অজানা আতঙ্ক তার শরীর ভেদ করে গেল। বুকের ভেতরে যেন কিছু একটা ফুস করে উঠলো।
স্নিগ্ধার শেষ কথাগুলো আবার মনে পড়লো—
“মা, ওনার বেলুনটা না অন্যরকম… ওই বেলুনগুলো রেখে দিলে ভালো লাগে, যেন বেলুনটা আমাকে গল্প বলে।”
কিন্তু এখন তো স্নিগ্ধা নেই। এখন শুধু ওই বেলুনটা রয়ে গেছে, আর কিছু দুঃস্বপ্নের মতো স্মৃতি।
কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বরং, এখান থেকে শুরু হয় এক ভয়ানক অধ্যায়।
বেলুনওয়ালার পরিবার বলতে কেউ নেই। সে একা থাকে পুরনো এক ভাঙা বাড়িতে শহরের প্রান্তে।
রাত ঘনিয়ে এলে সে সেই বাড়িতে ফিরে যায়। বেলুনের লাঠিগুলো এক কোণে রেখে সে ধীরে ধীরে আলমারির দরজা খোলে।
আলমারির ভেতরে নেই কোনো জামা-কাপড়, নেই কোনো তোরজোড়—
আছে শুধু এক গোপন সিঁড়ি, যা নেমে যায় ভূগর্ভস্থ এক ঘরে।
সেখানে একটি পুরোনো, পাথরের তৈরি মূর্তি, যার মুখ কুয়াশার মতো অস্পষ্ট, কিন্তু নিচের দিকের অংশে মানুষের মতো হাত তৈরি হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
বেলুনওয়ালা সেই মূর্তির সামনে বসে পড়ে, কাঁপা গলায় ডাকে,
“মা… মা… আজকেও একটা গেলো, মা… আরেকটা বাচ্চা… আরেকটা নিঃশ্বাস…।”
তারপর পকেট থেকে বের করে এক চুপসানো বেলুন, যেটা এক মৃত শিশুর খেলনার অংশ ছিল।
সে বেলুনটি মূর্তির পায়ের কাছে রাখতেই অদ্ভুতভাবে বেলুনটি নিজে নিজেই ফুলে ওঠে। মূর্তির আঙুলের একটি অংশ যেন এবার আরও একটু মানুষের আঙুলের মতো হয়ে ওঠে।
একটা চাপা গোঙানির মতো শব্দ হয়, যেন মূর্তিটি সন্তুষ্ট।
বেলুনওয়ালার কাজ এখানেই শেষ নয়।
সে জানে না কাকে সে “মা” বলে ডাকে। সে জানে না—এই পাথরের মূর্তি আসলে এক অপদেবী, যাকে কোনো কালো গ্রন্থে “বায়নাকী” নামে ডাকা হয়।
এই দেবী হাওয়া দিয়ে জন্ম নেয়, শিশুদের নিঃশ্বাস দিয়ে রূপান্তরিত হয়।
প্রতি দশটি শিশুর নিঃশ্বাসে তার একটি আঙুল মানব রূপ পায়, প্রতি একশ শিশুর প্রাণে তার মুখ সৃষ্টি হয়।
এই শহরে, এই দেশজুড়ে, প্রতিদিন কত শিশু হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়—কেউ জানে না কেন।
হাসপাতাল, রিপোর্ট, ডাক্তারের ফাইল—সবই বলে “হৃদরোগ,” “শ্বাসকষ্ট,” “সাধারণ মৃত্যু।”
কিন্তু কেউ জানে না, এক বেলুনওয়ালা প্রতিদিন সেই মৃত শিশুদের নিঃশ্বাস ভরে বেলুন বিক্রি করে যাচ্ছে।
বাচ্চারা সেই বেলুন নিয়ে খেলে, হাসে, শুয়ে পড়ে বিছানায়, আর ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে—
বেলুন চুপসে যায়।
আর বাচ্চারা নিঃশব্দে চলে যায়।
পিছনে থেকে যায় শুধু একটা চুপসে যাওয়া বেলুন, আর এক ঘরের স্তব্ধতা।
বেলুনওয়ালা আবারও তৈরি। আগামীকাল আরও স্কুল, আরও খেলার মাঠ, আরও বাচ্চা।
আরও নিঃশ্বাস জমাতে হবে,
আরও শিশুদের হাওয়া নিতে হবে,
আরও বেলুন বিক্রি করতে হবে—
যতদিন না তার "মা" সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে এই পৃথিবীতে পা রাখে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন