⛔তিস্তার চর⛔
(✍️গল্পটি পাঠিয়েছেন রংপুরের, গঙ্গাচড়া উপজেলা থেকে মোঃ রাগিব হাসান তাছিন✍️)
সময়টা ২০১৭ সাল। আমার বয়স তখন ১৬। আমরা থাকি মহিপুরে, তিস্তা ব্রিজের পাশেই। সেসময় ব্রিজের নির্মাণ শেষ, কিন্তু উদ্বোধন হয়নি। নদী তখন একেবারে শুকনো—নিচে পানি নেই, কেবল বিস্তীর্ণ ধূসর চর আর চরজমি। শুষ্ক মৌসুমে সেই চড়ে রসুন, পেঁয়াজ আর আলুর চাষ করি আমরা—আমি আর আমার পরিবার। আমি একজন কৃষক পরিবারের সন্তান, মাটির ঘ্রাণ আমার রক্তে।
রসুন তুলার পর কয়দিন তা রোদে শুকানোর দরকার হয়, আর তাই আমরা নদীর চড়ে ধাপরি বানিয়ে রাতে পাহারা দিই। প্রথম রাতে চাচা একা ছিলেন সেখানে। পরদিন সকালে তার চোখ লাল, মুখ থমথমে—কিছু একটা যেন গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে তাকে। কিন্তু তখনও কিছু বলেননি আমাকে।
আমি বুঝিনি, আমি কোন বিভীষিকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
চাচা পরদিন জানালেন যা হয়েছিল—রাত দেড়টার দিকে, চারদিক যখন নিঃশব্দ আর কুয়াশায় মোড়া, তখন হঠাৎ ধাপরির চারপাশে ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যেতে থাকে। তারপর... কানে আসে একটি শিশুর কান্না। না, দূর থেকে নয়—ঠিক যেন ধাপরির ভেতরেই কেউ কাঁদছে! সেই কান্না করুণ, গলা ধরে আসে এমনভাবে বিলাপ করে। বুকের ভেতর হিমস্রোত বইয়ে দেয় সে আওয়াজ।
চাচা মাথার নিচে রাখা লাইট জ্বালাতে গিয়ে দেখেন—বাতি চলে গেছে। চারদিক অন্ধকার। এমন সময়—ধুপ! ধুপ! ধুপ! করে লোহার পেটানোর শব্দ আসে—প্রচণ্ড জোরে, যেন কেউ কামারশালায় হাতুড়ি চালাচ্ছে! শব্দটা আসে ধাপরির একেবারে মাথার উপর থেকে!
চাচা কোনোদিকে না তাকিয়ে শুধু ফিসফিস করে আয়াতুল কুরসি পড়তে থাকেন—জীবন নিয়ে বাঁচার শেষ চেষ্টায়।
আমার কিছু না জানিয়ে চাচা আমাকে সাথে করে নিয়ে গেলেন। আমি ভাবলাম, মজা করতে যাচ্ছি। কে জানতো, সেই রাতে আমার বিশ্বাসটাই পাল্টে যাবে।
রাত বাড়তে থাকে। প্রথমে চারপাশ নিঃস্তব্ধ। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ আমার ঘুম ভাঙে—একটি শিশু কাঁদছে! এবার আমি নিজে শুনি। আমার পুরো শরীর হিম হয়ে যায়। চোখ খুলতেই দেখি চাচা উঠে বসে আছেন, ঠোঁটে আয়াত চালু, চোখ স্থির।
“এইটা কি...?” আমি জিজ্ঞেস করতেই, চাচা হাত দিয়ে চুপ করালেন।
তারপর—ধুপ! ধুপ! ধুপ! করে সেই লোহার শব্দ আবার! এবার এতটা জোরে যে ধাপরির বাঁশ কেঁপে ওঠে। বাইরে বের হয়ে দেখি—চারদিক অন্ধকার, কিন্তু সেই শব্দ ঠিক আমাদের ধাপরির উপরেই এক শুকনো বাঁশের মাথা থেকে আসছে!
আমি আকাশের দিকে তাকাই—কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু শব্দটা মাথার উপর!
ঠিক তখনই চাচার চোখ বড় হয়ে ওঠে। আমি তার দৃষ্টির দিকে তাকাই—ব্রিজের নিচে কিছু একটা নড়ছে।
একটা লোক। সাদা জামা পরে। তার হাতে একটা শিশু। গলা চেপে ধরেছে শিশুটার। সে কাঁদছে, চিৎকার করছে। কিন্তু লোকটার মুখ স্পষ্ট নয়—মাথা সামান্য নিচু, চোখ একেবারে অন্ধকার। শরীর নিঃস্তব্ধ, কিন্তু তার হাতের চাপ শিশুটার গলায় বাড়তে থাকে!
আমার চিৎকার করে ওঠার কথা—কিন্তু গলা শুকিয়ে যায়।
তারপর হঠাৎ নদীর শুকনো মাঝখান থেকে এক অদ্ভুত আলো—সোনালী রঙের, ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে যেন একটা নৌকা! কিন্তু নদী তো শুকনো! সেখানে পানি নেই! তবুও আলো কাঁপে, যেন নৌকাটা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।
চাচা আমাকে টেনে ধাপরির ভেতরে নেন। দরজা আটকে দোয়া পড়তে থাকি দুজনে। তবুও ধুপ! ধুপ! শব্দটা যেন ধাপরির ভেতরেই ঢুকে আসে। শিশুর কান্না এবার স্পষ্টতর—ঠিক কানের পাশে।
আমরা হাঁপাতে হাঁপাতে তিলাওয়াত পড়ছি, তবুও সেই শব্দ থামে না।
ঠিক ৩টা ৩০ মিনিটের সময়—এক ঝটকায় চারপাশ কেঁপে উঠে এক প্রবল ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়, আর তারপর—সব কিছু নিস্তব্ধ।
কোনো শব্দ নেই। বাতাস নেই। শুধু বুকের ভেতরে ধড়ফড়।
আমি আর কখনো চড়ে রাত কাটাইনি।
এখনও চোখ বন্ধ করলে সেই শিশুর কান্না শুনি, সেই সাদা ছায়ার মুখ মনে পড়ে—যার চোখ ছিল না, কিন্তু তাকিয়ে ছিল যেন আমার আত্মার গভীরে।
ওটা কে ছিল?
আমি জানি না। জানার সাহসও আর কখনো হয় না।
শুধু জানি—তিস্তার চরের রাত এখনো জেগে থাকে, কারও অপেক্ষায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন