ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা মেলে কত শত দুর্গ, প্রাসাদ আর গৌরবগাঁথা। কিন্তু কিছু কিছু স্থাপনা কেবল ইতিহাসের নয়, হয়ে ওঠে এক জনপদের আত্মপরিচয়। তেমনই এক নীরব সাক্ষী মুন্সীগঞ্জের ইদ্রাকপুর কেল্লা, যা শুধুমাত্র ইট-কাঠের গাঁথুনি নয়, বরং মোঘল সাম্রাজ্যের কৌশলী প্রতিরক্ষা চিন্তার এক জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
ইদ্রাকপুর দুর্গটি অবস্থিত মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর শহরে, ইছামতি নদীর পশ্চিম তীরে। ধারণা করা হয়, মোঘল সুবাদার ইসলাম খান বা মীর জুমলা ষোড়শ শতকের দিকে জাহাঙ্গীরনগর (বর্তমান ঢাকা) কে জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে যে তিনটি জল দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, তার একটি হলো এই ইদ্রাকপুর কেল্লা। বাকি দুটি হল নারায়ণগঞ্জের হাজিগঞ্জ ও সোনাকান্দা দুর্গ। আয়তনে তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও কৌশলগত গুরুত্বে ইদ্রাকপুর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই দুর্গের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর সুউচ্চ প্রাচীর ও প্রতিটি কোনায় থাকা বৃত্তাকার বেষ্টনী। প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত ফোঁকরগুলো প্রাচীরে এমনভাবে বসানো যে, ভেতর থেকে শত্রুর দিকে গোলা ছোড়া যেত অনায়াসে। উত্তরের দিকে রয়েছে খিলানাকৃতির একমাত্র প্রবেশদ্বার। পূর্ব প্রাচীরের মাঝামাঝি একটি ৩৩ মিটার ব্যাসের গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে, যা ব্যবহৃত হতো শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য। এই মঞ্চকে ঘিরে বাড়তি একটি প্রতিরক্ষা প্রাচীরও নির্মাণ করা হয়, যা মূল দেয়ালের সাথে যুক্ত ছিল। তিন কিলোমিটারের মধ্যেই ইছামতি, ধলেশ্বরী, মেঘনা ও শীতলক্ষা নদীর অবস্থান, যা এই দুর্গের প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়িয়ে তোলে।
একটি জনশ্রুতি অনুসারে, ইদ্রাকপুর দুর্গের সাথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সুরঙ্গপথে সংযোগ ছিল, যদিও এ তথ্যের প্রামাণ্যতা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে এটুকু নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মোঘলদের প্রতিরক্ষা কৌশলে জলপথ সুরক্ষার বিষয়টি যে কতখানি গুরুত্ব পেয়েছিল, তা এই দুর্গটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
মোঘলরা যখন বাংলা দখল করে, তখন তারা বুঝতে পারে, এখানে সাম্রাজ্য কায়েম করতে হলে শুধু স্থলপথ নয়, নদীপথও নিরাপদ রাখতে হবে। কারণ বঙ্গোপসাগর থেকে মগ (আরাকানি), পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ জলদস্যুরা মেঘনা দিয়ে উঠে এসে ভেতর দেশে লুটতরাজ চালাত। সে কারণে ইসলাম খান একজন নৌবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করে এবং নৌ প্রতিরক্ষা জোরদার করেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ইদ্রাকপুর দুর্গের মতো জল দুর্গগুলোর সৃষ্টি।
১৯০৯ সালে এই দুর্গকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আজও এই নিঃশব্দ প্রহরী ইতিহাসের ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে এবং মনে করিয়ে দেয় এক সময়কার মোঘল বাংলার সুগভীর কৌশল আর প্রতিরোধের সংগ্রাম।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া।
#ইদ্রাকপুর #কেল্লা #মোঘল #মুন্সীগঞ্জ #ইতিহাস
(অনুমতি ছাড়া রিপোস্ট করবেন না)
#বাংলার_তথ্যপট ('বাংলার তথ্যপট' সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন কমেন্টে।)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন