উত্তমকুমারের শেষ ডায়েরির অপ্রকাশিত গল্প
বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার শুধু অভিনয়েই নয়, নিজের কাজের প্রতি দায়বদ্ধতাতেও ছিলেন অতুলনীয়। অভিনয়ের ফাঁকে তিনি ডায়েরি লিখতেন, যেখানে ফুটে উঠত তাঁর মনের কথা, কাজের খুঁটিনাটি।
১৯৮০ সালের এক সন্ধ্যায় উত্তমকুমারের পুরনো ব্রিফকেস ঘেঁটে পাওয়া যায় একটি বিবর্ণ খয়েরি ডায়েরি। হয়তো কোনও একসময় তার গায়ে লেগেছিল নতুনত্বের দীপ্তি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধুলোবালি, অন্ধকার আর একাকীত্ব তার শরীরের ঔজ্জ্বল্য কেড়ে নিয়েছিল।
ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে ধরা পড়ে এক বিস্ময়কর তথ্য—
এই ছিল উত্তমকুমারের শেষ শুটিং ডায়েরি। সালটা ১৯৮০।
নতুন বছরের শুটিং শুরু
পয়লা জানুয়ারি, ১৯৮০। পৌষ মাসের হিমেল মঙ্গলবার। বছরের প্রথম দিনেই উত্তমকুমার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান 'ওগো বধূ সুন্দরী' ছবির জন্য।
পরিচালক সলিল দত্তের প্রাণবন্ত স্ক্রিপ্টে কাজ করে প্রবল আনন্দ পাচ্ছিলেন তিনি। টানা ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলেছিল সেই শুটিং।
এর ফাঁকেই উত্তম সময় বের করেন আরেক গুণী পরিচালক তপন সিংহের জন্য।
সেই তপন সিংহ, যাঁর সাথে উত্তমকুমার এর আগে কাজ করেছিলেন 'ঝিন্দের বন্দী' (১৯৬১) এবং 'জতুগৃহ' (১৯৬৪)-তে। বহুদিন পর আবার একসঙ্গে কাজ করার সুযোগে উত্তম ছিলেন রীতিমত উচ্ছ্বসিত।
তপন সিংহ তাঁকে ভেবেছিলেন 'বাঞ্ছারামের বাগান' ছবির জন্য।
চরিত্রটি ছিল এক লোভী অথচ করুণ জমিদারের— উত্তমকুমারের জন্য একেবারে আলাদা এক চ্যালেঞ্জ।
ডেটও ঠিক হয়ে গিয়েছিল—
৯ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা শুটিং।
হঠাৎ সব ভেঙে যায়
কিন্তু ডায়েরির পাতায় দেখা গেল, এই ছবির নাম হঠাৎ করেই কেটে দেওয়া!
তার জায়গায় ঢুকে পড়েছে আরেক ছবি, 'রাজাসাহেব'।
কী এমন ঘটেছিল যে উত্তমকুমার, যিনি ডেট দিয়েও উত্তেজনায় চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ করে সেই ছবিটা আর করলেন না?
উত্তম নিজে ডায়েরিতে এ ব্যাপারে কিছু লেখেননি। তবে পুরো কাহিনী জানতেন তাঁর জীবনের একান্ত সঙ্গী সুপ্রিয়া দেবী।
সুপ্রিয়া দেবীর বর্ণনায় সেই সন্ধ্যা
সুপ্রিয়া দেবী জানান, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, এক সন্ধ্যায় ময়রা স্ট্রিটের তাঁদের বাড়িতে কয়েকজন আগন্তুক হাজির হন।
তাঁরা এসেই রুক্ষভাবে দাবি করেন— 'বাঞ্ছারামের বাগান'-এর স্ক্রিপ্টটা ফেরত দিতে হবে।
সুপ্রিয়া বললেন,
"স্ক্রিপ্ট তখন উত্তমের কাছে, বেলভিউ নার্সিং হোমে।
না, অসুস্থতার জন্য নয়— উত্তম সেখানে একটি স্যুইট ভাড়া নিয়েছিলেন, একাকী বসে চিত্রনাট্য পড়ার জন্য, চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার জন্য।"
যখন সুপ্রিয়া দেবী আগন্তুকদের প্রশ্ন করেন কেন স্ক্রিপ্ট ফেরত, উত্তর আসে:
"তপনবাবু উত্তমকুমারকে বাদ দিয়েছেন।"
শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান তিনি।
সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেন তপন সিংহকে।
তপনবাবুর উত্তর ছিল পরিষ্কার:
> "চিত্রনাট্য ফেরত দিয়ে দাও। উত্তম তো এখন হার্ট পেশেন্ট। আমি নিজেও হার্টের রোগী। আমি আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। তাই দীপঙ্কর দেকে কাস্ট করেছি।"
সুপ্রিয়া দেবী কান্নাভেজা গলায় অনুনয় করেন:
> "তপনদা, এটা করবেন না। উত্তম কতটা চেষ্টা করছে এই চরিত্রের জন্য, এই আঘাত সে সহ্য করতে পারবে না।"
কিন্তু তপনবাবু ছিলেন অনড়।
উত্তমকুমারের নিঃশব্দ যন্ত্রণা
পরদিন বেলভিউ নার্সিং হোমে গিয়ে সুপ্রিয়া দেবী উত্তমকুমারকে সমস্ত ঘটনা জানান।
উত্তমকুমার কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকেন।
তারপর স্ক্রিপ্টের খাতা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে দেন।
চোখেমুখে ফুটে ওঠে গভীর আঘাত, অসহায়তা।
একবার তো রাগের মাথায় বলেই ফেলেছিলেন—
"আমি মানহানির মামলা করব। উকিল ডাকো!"
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে সামলান।
পরদিনই তিনি নার্সিংহোম ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসেন।
নতুন অধ্যায়ের শুরু
যন্ত্রণা বুকের মধ্যে পুষে নিয়েও থেমে থাকেননি উত্তমকুমার।
৯ জানুয়ারি থেকেই তিনি শুরু করেন নতুন ছবির শুটিং— 'রাজাসাহেব'।
টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে একটানা কাজ করতে থাকেন।
স্টুডিওতে ঢোকার সময় পাশেই থাকত তপন সিংহের ঘর।
উত্তমকুমার গম্ভীর মুখে সেই ঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন, কখনও মুখ ফিরিয়ে তাকাতেন না।
কিন্তু কাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতায় বিন্দুমাত্র ঘাটতি আসেনি।
দুপুর-রাত পরিশ্রম করে গেছেন, যেন নিজের হৃদয়ের ব্যথাকে অভিনয়ের মধ্যে ঢেলে দিতে চাইতেন।
অপ্রকাশিত যন্ত্রণার দলিল
"বাঞ্ছারামের বাগান" মুছে যায় উত্তমকুমারের শেষ ডায়েরি থেকে।
তবে থেকে যায় সেই ব্যথার স্মৃতি।
পাশাপাশি লেখা থাকে জীবনভর অধ্যবসায়ের, মাটির কাছাকাছি থাকা এক মহান শিল্পীর চুপিসারে সহ্য করে চলার কথা।
সংগৃহীত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন