হাছন রাজা: বিলাসিতা থেকে বৈরাগ্যের এক বিস্ময়কর যাত্রা :-
তিনি ছিলেন বিলাসী জমিদার।
বড় ভাই ও পিতার মৃত্যুতে অল্প বয়সেই ৬ লাখ বিঘা জমির বিশাল সাম্রাজ্যের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। কিন্তু এত ভূসম্পত্তি পেয়ে তিনি হারিয়ে গেলেন ভোগবিলাসে। নারী-নেশা-নৃত্যগীত—এই ছিল তাঁর জীবনের মূল সুর।
নারীর প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। নিজেই লিখেছেন,
“সর্বলোকে বলে হাছন রাজা লম্পটিয়া।”
একদিন দেখা পেলেন এক হিন্দু রমণী—দিলারাম।
রূপে মোহিত হয়ে উপহার দিলেন নিজের গলার সোনার চেইন। প্রেমে পড়ে লিখলেন বিখ্যাত সেই পঙ্ক্তি:
“ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর দিলারাম, ধর।
হাছন রাজারে বান্ধিয়া রাখ, দিলারাম তোর ঘর!”
কিন্তু পরিবারের আভিজাত্যের খাতিরে মা সেই প্রেমকে মানতে পারলেন না।
দিলারামকে তাড়িয়ে দিলেন।
মায়ের উপর অভিমান করে হাছন রাজা আরও ডুবে গেলেন বাইজি আর মদে।
লখনৌ থেকে আগত অপূর্ব রূপসী বাইজি পিয়ারির প্রেমে পড়লেন।
তার রূপে মাতোয়ারা হয়ে লিখলেন:
“নেশা লাগিল রে। বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে...”
প্রজারা ধীরে ধীরে জমিদার হাছন থেকে দূরে সরে গেল।
তিনি পরিচিত হলেন এক নিষ্ঠুর, নির্দয় শাসক হিসেবে।
ঠিক তখনই—ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা।
ছেলেকে পথভ্রষ্ট দেখে মা এক রাতে বাইজির ছদ্মবেশে ছেলের জলসায় হাজির হলেন।
জমিদার হাছন মায়ের পায়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
এই লজ্জা, আত্মদহন আর এক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন পুরোপুরি বদলে দিল তাঁর জীবন।
প্রেম-ভোগ-নেশা ছেড়ে হাছন রাজা হয়ে উঠলেন এক সাধক, এক বাউল।
সাদামাটা জীবন, স্রষ্টার প্রেমে মগ্ন মন, প্রজাদের প্রতি দরদ।
রচে গেলেন একের পর এক কালজয়ী গান—
“লোকে বলে বলেরে, ঘর বাড়ি ভালা নায় আমার”
“মাটিরো পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে”
“সোনা বন্দে আমারে দেওয়ানা বানাইলো রে”
...আরও অসংখ্য হৃদয়ছোঁয়া গান।
তিনি নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন—
“একদিন তোর হইবোরে মরণ”—এ গানেই ফুটে উঠেছে তাঁর অনুশোচনা।
শেষ বয়সে সম্পত্তি বিলিয়ে দরবেশি জীবন বেছে নেন।
প্রতিষ্ঠা করেন স্কুল, মসজিদ, আখড়া—অগণিত জনহিতকর প্রতিষ্ঠান।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হাছন রাজা বুঝেছিলেন,
কে তাঁকে বাউল বানিয়েছে—তা হয়তো তিনি বলেননি,
কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—
"আমি সেই অদৃশ্যের বাঁধা ঘুড়ি!"
হাছন রাজার জীবন গল্প নয়, এক অনন্ত শিক্ষা।
ভোগ থেকে ত্যাগ, মোহ থেকে মোক্ষের যে যাত্রা—
তা আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন