প্রকৃতি ইউরেনিয়াম ধারন করেছে অদ্ভুত এক অনুপাতে। পাহাড় থেকে খোঁড়া প্রতি ১০০ ভাগ ইউরেনিয়ামের মধ্যে মাত্র ০.৭ ভাগ হলো U-235 যেটা সত্যিকারে মিরাকল। বাকি ৯৯.৩ ভাগ U-238, যেটা একেবারে বেকার।
এই ০.৭ ভাগেই লুকিয়ে আছে অকল্পনীয় শক্তি।
একদল মানুষ চায় এই সংখ্যাটা ৩ থেকে ৫ এ নিয়ে যেতে। আরেকদল চায় ৯০ এর উপরে। কিন্তু কেন?
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশাল রিয়্যাক্টরের কোরে ঘটবে এক অলৌকিক ঘটনা। একটি ইউরেনিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসে একটি নিউট্রন এসে ধাক্কা দিবে। নিউক্লিয়াসটা দু টুকরো হয়ে যাবে আর বেরিয়ে আসবে তিনটি নতুন নিউট্রন এবং প্রচণ্ড তাপ। সেই তিনটি নিউট্রন ছুটে গিয়ে আঘাত করবে আরো তিনটি পরমাণুকে, একটি চেইন রিয়্যাকশন। যেহেতু চেইন রিয়্যাকশন তাহলে কি চলতেই থাকবে? ফলাফল চেরনোবিল। রিয়্যাক্টরের ভেতরে যদি বোরনের তৈরি control rod নামানো হয় তাহলে চেইন রিয়্যাকশনটি বন্ধ, কারন বোরন নিউট্রনকে শুষে নিয়ে পরবর্তী পরমানুকে আঘাত করা থেকে বিরত রাখে। প্রকৌশলীরা এই রড একটু তুললে বিক্রিয়া বাড়ে, একটু নামালে কমে। যেন চুলার আঁচ নিয়ন্ত্রণ। সেই তাপে পানি গরম হয়। বাষ্প হয়। টার্বাইন ঘোরে। বিদ্যুৎ তৈরি হয়। এটাই Low Enriched Uranium (LEU), মাত্র ৩ থেকে ৫ ভাগ বিশুদ্ধ U-235 এর খেলা।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। একটি "B-29 সুপারফরট্রেস" বিমান থেকে ফেলে দেওয়া হয় "Little Boy" কে। সেই Little Boy এর ভেতরে ছিল ৬৪ কেজি ইউরেনিয়াম। কিন্তু এই ইউরেনিয়াম রূপপুরের ইউরেনিয়ামের মতো নয়। এখানে ৬৪ কেজি U-235 এর বিশুদ্ধতা ছিলো ৯৩ ভাগ।
বোমাটি মাটি থেকে ৬০০ মিটার উপরে বিস্ফোরিত হয়। নিউট্রন ইনিসিয়েটর থেকে ছুটে যায় অসংখ্য নিউট্রন কিন্তু কোনো বোরন control rod নেই। কেউ থামাচ্ছে না। এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ে কোটি কোটি U-235 পরমাণু একসাথে ভেঙে ফেলে । এতো বিপুল পরিমানের তাপ উৎপন্ন হয় যা প্রায় সূর্যের কেন্দ্রের কাছাকাছি। ৭০,০০০ মানুষ মুহূর্তে শেষ। এটাই HEU (Highly Enriched Uranium)। ৯০ ভাগের উপরে U-235।
একই নিউক্লিয়াস কিন্তু পরিনতি দুটি, এখানেই প্রশ্নটা চলে আসে কেন?
রূপপুরের রিয়্যাক্টর আর হিরোশিমার বোমা দুটোতেই ইউরেনিয়াম। দুটোতেই fission। দুটোতেই চেইন রিয়্যাকশন। তাহলে পার্থক্য কোথায়? পার্থক্য একটাই সেটা হচ্ছে পিওরিটি বা ঘনত্ব।
LEU তে U-235 এর পিওরিটি এত কম যে চেইন রিয়্যাকশন ধীরে ধীরে চলে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বোমা বানাতে এত বেশি LEU লাগবে যে সেটা বহন করা অসম্ভব। অপর দিকে HEU তে U-235 এর পিওরিটি এতো বেশি যে মাত্র ১৫ থেকে ৫০ কেজিতেই critical mass তৈরি হয়। এক মুহূর্তে সব শক্তি বেরিয়ে আসে। রূপপুরের জ্বালানি দিয়ে বোমা বানানো সম্ভব নয়। গাণিতিকভাবে, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে অসম্ভব।
রিয়্যাক্টরে পোড়া জ্বালানি থেকে Plutonium তৈরি হয়। সেই Plutonium দিয়েও পারমানবিক বোমা বানোনো যার ফলাফল "ফ্যাট ম্যান"। তাই সবার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, রূপপুর কি সেই আলো দেখাবে?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন