আর্টেমিস ২: চাঁদের পথে ৪ নভোচারী
ফ্লোরিডা, ১ এপ্রিল ২০২৬। ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরালের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে আকাশ চিরে এসএলএস (SLS) রকেটটি কক্ষপথের দিকে ছুটে যাবে, তখন মানবজাতি প্রবেশ করবে এক নতুন মহাকাশ যুগে।
বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ভোর ৪:২৪ মিনিটে এই ঐতিহাসিক উৎক্ষেপণটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর—১৯৭২ সালের অ্যাপোলো ১৭-এর পর—আবারও চারজন মানুষ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন গভীর মহাকাশে।
আর্টেমিস-২ মিশনটি যদিও চাঁদের মাটিতে এখনই অবতরণ করবে না, তবে এটি হতে যাচ্ছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর চন্দ্রজয়ের পথে প্রথম মানববাহী মহাকাশ যাত্রা।
নাসার কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের নেতৃত্বে চার নভোচারী যখন ওরিয়ন ক্যাপসুলে চেপে বসবেন, তখন তাদের লক্ষ্য থাকবে চাঁদের বুক ছুঁয়ে আসা নয়, বরং চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে এক ঐতিহাসিক 'লুপ' সম্পন্ন করা।
.
সাত লক্ষ মাইলের যাত্রা
এই রুদ্ধশ্বাস অভিযানে তারা পাড়ি দেবেন প্রায় সাত লক্ষ মাইল পথ। চাঁদের অন্ধকার পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৪,৭০০ মাইল ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তারা দেখবেন এমন এক দৃশ্য, যা এর আগে কোনো মানুষের চোখে পড়েনি।
এই অভিযানে কোনো পদচিহ্ন পড়বে না, কিন্তু এটি সেই অজেয় সাহসের জয়গান, যা ২০২৮ সালে চাঁদের মাটিতে মানুষের স্থায়ী প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম করবে।
১০ দিনব্যাপী এই অভিযানে নাসার মহাকাশচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন চাঁদের চারপাশে একটি মুক্ত প্রত্যাবর্তন পথে প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
.
২০২৮-এর চন্দ্রজয়ের সেতুবন্ধন
আর্টেমিস-২ মূলত পরবর্তী আর্টেমিস মিশনগুলির সফলতাকে সুনিশ্চিত করার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন। এটি কেবল একটি মহাকাশ যাত্রা নয়, বরং গভীর মহাকাশে মানুষের টিকে থাকার সক্ষমতা যাচাইয়ের চূড়ান্ত পরীক্ষা। আর্টেমিস-২-এর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই নাসা তাদের পরবর্তী বড় পদক্ষেপটি নেবে।
এই অভিযানে ওরিয়নের যোগাযোগ প্রযুক্তি, উন্নত জীবন-রক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রপালশন সিস্টেম মানুষের উপস্থিতিতে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
যদি এই মিশনটি পরিকল্পনামাফিক সফল হয়, তবেই ২০২৮ সালের সেই ঐতিহাসিক ক্ষণটি বাস্তবায়িত হবে—যেখানে মানুষ কেবল চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসবে না, বরং চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।
.
চার মহাকাশচারী: ইতিহাসের নতুন কারিগর
রিড ওয়াইজম্যান এই মিশনের কমান্ডার। ৫০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ নৌ-বৈমানিক থেকে নভোচারী হওয়া ওয়াইজম্যান আগে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ১৬৫ দিন কাটিয়েছেন। তিনি হবেন ১৯৭২ সালের পর প্রথম চান্দ্র মিশনের কমান্ডার এবং সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হিসাবে নিম্ন কক্ষপথের বাইরে যাওয়ার রেকর্ড গড়বেন।
ভিক্টর গ্লোভার এই মিশনের পাইলট। তিনি হবেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি যিনি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে যাবেন। আগে তিনি ২০২০-২১ সালে মহাকাশ স্টেশনে ১৬৮ দিনের দীর্ঘ অভিযানে অংশ নিয়েছেন এবং SpaceX Dragon ক্যাপসুল প্রথম পাইলট হিসাবে পরিচালনার কৃতিত্বও তার।
ক্রিস্টিনা কচ প্রথম নারী হিসাবে এত দূরে যাচ্ছেন। মহাকাশে টানা ৩২৮ দিন থাকার রেকর্ড তার। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে তার গভীর দক্ষতা এই মিশনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
জেরেমি হ্যানসেন কানাডার মহাকাশ সংস্থার নভোচারী। তিনি হবেন প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক যিনি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে যাবেন। এটি তার প্রথম মহাকাশ অভিযান।
মূল চার নভোচারী ছাড়াও দুজন ব্যাকআপ নভোচারী রয়েছেন—নাসার আন্দ্রে ডগলাস এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেনি গিবনস।
.
ওরিয়ন: শিকারি থেকে মহাকাশযানের রূপকথা
উৎক্ষেপণের মাত্র ৮ মিনিটের এক প্রচণ্ড গতির মধ্য দিয়ে ওরিয়ন মহাকাশের সীমানায় পৌঁছাবে। মজার ব্যাপার হল, 'ওরিয়ন' নামটি চন্দ্রাভিযানের ইতিহাসে বেশ পুরনো। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৬ মিশনের ল্যান্ডারটির নামও ছিল 'ওরিয়ন'।
এই মহাকাশযানের 'ওরিয়ন' নামটি এসেছে গ্রিক পুরাণের এক কিংবদন্তি শিকারির নাম থেকে, যাকে আমরা বাংলায় 'কালপুরুষ' নক্ষত্রমণ্ডলী হিসাবে চিনি। নাসা এই নামটি বেছে নিয়েছে মূলত গভীর মহাকাশে মানুষের নতুন যাত্রার পথপ্রদর্শক হিসাবে।
মহাকাশে পৌঁছালেই ওরিয়ন সরাসরি চাঁদের দিকে রওনা দেবে না। প্রথম পুরো একটা দিন কাটবে পৃথিবীর উঁচু কক্ষপথে—একটি গুরুত্বপূর্ণ 'চেকআউট' হিসাবে। নভোচারীরা মহাকাশযানের জীবন-রক্ষা ব্যবস্থা, পানীয় জল সরবরাহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করবেন।
পৃথিবীর কক্ষপথে থাকাকালীন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরীক্ষা চালাবেন—উৎক্ষেপণের প্রায় ৩.৫ ঘণ্টা পর তিনি ওরিয়নকে রকেটের পরিত্যক্ত উপরের অংশের (Upper Stage/ICPS) কাছাকাছি নিয়ে যাবেন। মহাকাশ বিজ্ঞানে একে বলা হয় 'প্রক্সিমিটি অপারেশনস'। এটি মূলত ভবিষ্যতে Gateway Space Station বা SpaceX Starship Lander-এর সাথে ডকিং-এর আগাম প্রস্তুতি।
.
বুমেরাং কৌশল: মহাকাশে ফেরার পথ
সব পরীক্ষা সফল হলে উৎক্ষেপণের প্রায় ২৫ ঘণ্টা পর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন প্রজ্বলন হবে। প্রায় ৬ মিনিট ৫ সেকেন্ডের এই প্রজ্বলনে মহাকাশযানের গতি প্রায় ৯০০ মাইল/ঘণ্টা বেড়ে যাবে—যে গতি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে চাঁদের দিকে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। এরপর শুরু হবে ৪ দিনের যাত্রা।
চাঁদের কাছে পৌঁছানোর পর ওরিয়ন চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র প্রায় ৪,৭০০ মাইল (৭,৬০০ কিলোমিটার) দূর দিয়ে উড়ে যাবে। এই নির্দিষ্ট দূরত্বটি এমনভাবে হিসাব করা হয়েছে যাতে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে একটি 'স্লিং শট'-এর মত ব্যবহার করে মহাকাশযানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর দিকে ঘুরে আসতে পারে।
আরো কাছে গেলে চাঁদের প্রবল টানে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত, যা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রচুর বাড়তি জ্বালানির প্রয়োজন হত।
মহাকাশ বিজ্ঞানের এই বিশেষ পথকে বলা হয় 'মুক্ত-প্রত্যাবর্তন পথ' (Free-Return Trajectory)। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, যদি মাঝপথে মহাকাশযানের ইঞ্জিনে কোনো বড় যান্ত্রিক গোলযোগও দেখা দেয়, তার পরেও চাঁদের মহাকর্ষ বলই ওরিয়নকে নিরাপদে পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেবে। মহাকাশযানটি অনেকটা বুমেরাং-এর মত নিজেই নিজের ঘরে ফিরে আসবে।
মিশনের দশম দিনে—সম্ভাব্য ১০ এপ্রিল—ওরিয়ন ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে নামবে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় ঘর্ষণে বাইরের তাপমাত্রা উঠবে প্রায় পাঁচ হাজার ডিগ্রি পর্যন্ত এবং প্রায় ৫ মিনিটের জন্য সব রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নৌবাহিনীর জাহাজ অপেক্ষায় থাকবে উদ্ধারের জন্য।
.
হিট শিল্ড বিতর্ক ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা
আর্টেমিস-২ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল তাপ-প্রতিরোধী ঢাল বা শিল্ড নিয়ে। ২০২২ সালে আর্টেমিস-১-এর 'অ্যাভকোট' (Avcoat) উপাদানে তৈরি ঢালে যে ক্ষয় ধরা পড়েছিল, সেটি ঠিক কেন হয়েছিল তা এখনও পুরাপুরি বোঝা যায়নি।
এবারের ঢাল একই ধরনের—তবে ফেরার পথটি বদলানো হয়েছে। আগে মহাকাশযান বায়ুমণ্ডলে একবার ডুব দিয়ে আবার উঠে আসত (Skip Reentry), তারপর চূড়ান্তভাবে নামত। এবার সেই কৌশল বাদ দেওয়া হয়েছে—সরাসরি খাড়াভাবে নামবে, যাতে ঢালে তাপের চাপ কম সময় জুড়ে থাকে।
সাবেক নভোচারী চার্লস কামার্দা বার বার সতর্ক করেছেন যে নতুন পথে ঢাল কীভাবে আচরণ করবে তা মানববিহীন পরীক্ষা না করেই মানুষ পাঠানো ঠিক হচ্ছে না। নাসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিস্তারিত পরীক্ষার পর তারা নিশ্চিত যে এই ঢাল নিরাপদ।
আর্টেমিস-৩-এর জন্য সম্পূর্ণ নতুন নকশার এবং উন্নত উপাদানে তৈরি তাপ-প্রতিরোধী ঢাল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
.
মহাকাশে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ ও বিশ্বনীতি
আন্তর্জাতিক দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হল চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে নিজেদের নভোচারী পাঠানোর লক্ষ্যে কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে আর্টেমিস-২-এর সফল উৎক্ষেপণ নাসার জন্য শুধু প্রযুক্তিগত নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও জরুরি।
কানাডার অংশগ্রহণও এখানে তাৎপর্যপূর্ণ—জেরেমি হ্যানসেনের উপস্থিতি এই মিশনকে কেবল মার্কিন নয়, আন্তর্জাতিক একটি উদ্যোগ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের একটি মার্কিন-কানাডা চুক্তির আওতাতেই কানাডিয়ান নভোচারীর অংশগ্রহণ সম্ভব হয়েছে।
বিতর্ক, বিলম্ব আর বাধা পেরিয়ে চারজন মানুষ চাঁদের দিকে রওনা দিচ্ছেন। এটি শুধু নাসার একটি মিশন নয়—এটি মানুষের সেই পুরোনো প্রশ্নের নতুন উত্তর: আমরা কতদূর যেতে পারি?
অ্যাপোলোর যুগে মহাকাশ ছিল দুই পরাশক্তির লড়াইয়ের ময়দান। এবার প্রেক্ষাপট আলাদা—দুই দেশের চার মানুষ, একটি যৌথ স্বপ্ন নিয়ে উড়ছেন। একজন কৃষ্ণাঙ্গ, একজন নারী, একজন কানাডিয়ান—এই দলটি নিজেই একটি বার্তা।
আর্টেমিস-২ চাঁদে নামবে না। কিন্তু এই যাত্রা ছাড়া পরের পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। ১০ দিন পর যখন ওরিয়ন প্রশান্ত মহাসাগরে নামবে, মানবজাতি একটু এগিয়ে যাবে।
.
উৎক্ষেপণের লাইভ
নাসা'র অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে বাংলাদেশ সময় রাত ১০:৫০ মিনিট থেকে নভোচারীদের স্যুট পরার দৃশ্য থেকে শুরু করে উৎক্ষেপণ পর্যন্ত সব দেখা যাবে। উৎক্ষেপণের সময় বাংলাদেশ সময় ভোর ৪:২৪ মিনিট।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন