গাঁয়ের নাম পরমেশ্বরপুর, গাঙের নাম নবগঙ্গা: দেশভাগ, স্মৃতি ও শিকড়ের গল্প
বাংলাদেশের গ্রামগুলো শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়—প্রতিটি গ্রামই বহন করে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের অগণিত স্মৃতির ভার। মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা ইউনিয়নের একটি এমনই গ্রাম পরমেশ্বরপুর, যার অতীত, মানুষের জীবনগাথা ও দেশভাগের বেদনাময় স্মৃতি একত্রে ধরা পড়েছে “গাঁয়ের নাম পরমেশ্বরপুর, গাঙের নাম নবগঙ্গা” বইয়ে।
গ্রাম ও গাঙের গল্প
পরমেশ্বরপুর গ্রামের পাশে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদী শুধু একটি জলধারা নয়, বরং এই অঞ্চলের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল মানুষের বসতি, জীবিকা ও সামাজিক কাঠামো। তাই বইটির নামেই গ্রাম ও গাঙকে পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে—যেন একে অপরের অবিচ্ছেদ্য পরিচয়।
দেশভাগ ও বিচ্ছিন্নতার বেদনা
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই গ্রামের মানুষের জীবনে নিয়ে আসে এক গভীর পরিবর্তন। বহু পরিবার তাদের শতবর্ষের বসতভিটা ছেড়ে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয় ভারতে। পরমেশ্বরপুরও সেই ইতিহাসের সাক্ষী—যেখানে একসময় গড়ে ওঠা সমাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। এই বইতে সেইসব মানুষের স্মৃতি, কষ্ট, বিচ্ছেদ ও নতুন জীবনের গল্প উঠে এসেছে হৃদয়স্পর্শীভাবে।
দীর্ঘ গবেষণা ও তথ্যসংগ্রহ
ড. শঙ্করকুমার ঘোষ ও রতনকুমার ঘোষ প্রায় নয় বছরের নিরলস পরিশ্রমে এই বইটি সম্পাদনা করেছেন। তারা শুধু বইপত্র ঘেঁটে থেমে থাকেননি; বরং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পরমেশ্বরপুরের মানুষ ও তাদের উত্তর-প্রজন্মকে খুঁজে বের করেছেন। সংগ্রহ করেছেন তাদের স্মৃতিকথা, পারিবারিক ইতিহাস ও বংশতালিকা। এমনকি তারা সরাসরি গ্রাম পরিদর্শন করে বাস্তব তথ্যও সংগ্রহ করেছেন।
বইয়ের বৈশিষ্ট্য
প্রায় হাজার পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে রয়েছে—
গেজেটিয়ারধর্মী বিস্তারিত ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তথ্যপঞ্চাশটিরও বেশি স্মৃতিকথা
পারিবারিক ইতিবৃত্ত ও বংশতালিকা
পুরনো আলোকচিত্র ও মানচিত্র
এই উপাদানগুলো বইটিকে শুধু একটি ইতিহাসগ্রন্থ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
কেন বইটি গুরুত্বপূর্ণ
“গাঁয়ের নাম পরমেশ্বরপুর, গাঙের নাম নবগঙ্গা” আসলে একটি গ্রামের গল্প হলেও, এটি বৃহত্তর বাংলার ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। এখানে আছে দেশভাগের প্রভাব, মানুষের শিকড় হারানোর বেদনা এবং স্মৃতির মাধ্যমে সেই শিকড়কে ধরে রাখার প্রয়াস।
এ ধরনের বই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহদের নয়, সাধারণ মানুষের জীবনগাথাও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছোট একটি গ্রামের এত বিস্তৃত ও গবেষণাভিত্তিক দলিল সত্যিই বিরল।
উপসংহার
পরমেশ্বরপুর শুধু একটি গ্রামের নাম নয়; এটি এক হারানো সময়ের প্রতিচ্ছবি, এক বিচ্ছিন্ন জনপদের স্মৃতির ভান্ডার। নবগঙ্গার জলে যেমন অতীতের ছায়া ভেসে ওঠে, তেমনি এই বইয়ের পাতায় পাতায় ধরা পড়ে মানুষের ভালোবাসা, বেদনা ও শিকড়ের টান।
যারা নিজের এলাকা, ইতিহাস ও শিকড়কে জানতে চান, তাদের জন্য এই বইটি নিঃসন্দেহে এক অমূল্য সম্পদ।
শিমুল পারভেজ
সম্পাদক, পজিটিভ নহাটা
সহযোগিতায়ঃ হাদিউজ্জামান
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন