গল্পের নাম: লাল জামা
(লেখক: ইবনে আব্দি রব্বহী)
এক রাতে খলিফা মানসূর বাইতুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করছিলেন, হঠাৎ এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে যমিনে সৃষ্ট অন্যায়-অনাচার, হিংসা-বিদ্বেষ, হক ও হকপস্থিদের মাঝে যে লোভ-লালসা অন্তরায় হয়েছে, আমি তার অভিযোগ করছি। খলিফা মানসূর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অস্থিরচিত্তে মসজিদের এক কোণে বসে লোকটিকে ডেকে পাঠালেন। লোকটি দু'রাকাত নামাজ আদায় করে রুকনে ইয়ামানী চুমো খেল। অতঃপর দূতের সাথে এসে খেলাফতের যথোপযুক্ত সালাম নিবেদন করলেন।
খলিফা মানসূর জানতে চাইলেন, তোমাকে পৃথিবীতে যে অনিয়ম অনাচারের কথা বলতে শুনলাম, তা কী? আর হক ও হকপন্থীদের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টিকারী সেই লোভ-লালসারই কী অর্থ?
আল্লাহর কসম! তুমি এমন কিছু কথা বলে আমার কর্ণকুহরকে ভরে দিয়েছ, যা আমাকে অসুস্থ করে তুলছে ।
খলিফার কথা শুনে লোকটি বলল, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনি যদি আমাকে অভয় দেন তাহলে পূর্বাপর সমস্ত বিষয়গুলো আমি আপনার কাছে খুলে বলব। অন্যথায় আপনার থেকে নিরাপদ দূরত্ব অবলম্বন করে আপন কাজে রত হব। কেননা আমার ব্যস্ততা রয়েছে।
খলিফা বললেন, নিজের জানের ব্যাপারে তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। সুতরাং তুমি নির্ভয়ে সব বলতে পার।
লোকটি তখন বলতে শুরু করল। হে আমীরুল মুমিনীন! যার মাঝে লোভ-লালসা অনুপ্রবেশ করেছে এবং যিনি পৃথিবীতে বিরাজমান অন্যায়-অনাচার, হিংসা-বিদ্বেষ যার অগোচরে রয়েছে তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং আপনি।
বিস্মিত স্বরে খলিফা বলে উঠলেন, তা কী করে সম্ভব? ধিক তোমার, আমার মাঝে। লালসা ঢুকেছে; অথচ পৃথিবীর সব স্বর্ণ-রৌপ্য আমার হাতে! ভোগ বিলাসের সব উপকরণ আমারই কাছে!
স্থিরচিত্তে লোকটি বলল, আপনার মাঝে যে লোভ-লালসার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, তা কি অন্য কারো মাঝে ঘটেছে? আল্লাহ তা'য়ালা আপনাকে তাঁর বান্দাদের দেখাশোনা ও তাদের ধন-সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আপনি প্রজাদের অবস্থার প্রতি গাফেল থেকে তাদের সম্পদ পুঞ্জিভূত করতে মত্ত হয়ে পড়েছেন। আপনার ও প্রজাদের মাঝে ইট-পাথরের প্রাচীর নির্মাণ করে, সশস্ত্র প্রহরী নিয়োগ করে লৌহদার স্থাপন করেছেন প্রজাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমলাদের পাঠিয়েছেন খাজনা আদায় করতে, প্রজাদের অর্থ-সম্পদ জমা করতে। আবার ফরমান জারি করেছেন নির্দিষ্ট কয়েকজন- অমুক, অমুক ছাড়া আর কেউ যেন অন্দরমহলে প্রবেশ না করে। আপনি তো মাজলুমের ফরিয়াদ, দুঃখীর আর্তনাদ এবং ক্ষুধার্ত ও বস্ত্রহীনের আহাজারি পৌঁছাবার কোনো ব্যবস্থা রাখেননি। অথচ রাষ্ট্রীয় সম্পদে রাজ্যের প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার রয়েছে।
এই বিশেষ শ্রেণীটি, যাদেরকে আপনার একান্ত উপদেষ্টা নিযুক্ত করে প্রজাদের উপর প্রাধান্য প্রদান করেছেন। এবং তারা যেন অনায়াসে আপনার কাছে পৌঁছতে পারে সেই ব্যবস্থা করেছেন। এই শ্রেণীটি যখন আপনাকে দেখল যে আপনি অবৈধ কর আদায় করছেন এবং রাজকীয় সম্পদ পুঞ্জিভূত করে রাখছেন তখন তারা মনে করল, স্বয়ং খলিফাই যখন খিয়ানত করছে তখন আমাদের খেয়ানত করতে বাধা কোথায় ।
তারা শলাপরামর্শ করল যে, তাদের ইচ্ছের বাইরে রাজ্যের কোনো সংবাদ আপনার কাছে পৌছতে দেবে না এবং যে নতুন আমলাই আসবে তাকে বিশ্বাসঘাতক প্রতিপন্ন করে আপনার কাছে তার মর্যাদা ও অবস্থান নষ্ট করবে।
এভাবে যখন বিষয়টি ব্যাপক আকার ধারণ করল তখন লোকজন তাদেরকে ভয় পেতে লাগল এবং তাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য উৎকোচ প্রদান করতে শুরু করল। এভাবে আপনার সাধারণ আমলারাই তাদেরকে সর্বাগ্রে অর্থকড়ি ও উপঢৌকন প্রদান করেছিল এবং সাধারণ প্রজাদের উপর অন্যায় অনাচারে শক্তসমর্থ হয়েছিল।
অতঃপর আপনার প্রজাদের শক্তিশালী ও বিত্তবানরা একইভাবে জনসাধারণের উপর অত্যাচারের পথকে সুগম করে নেয়। ফলে লোভ-লালসা, জুলুম-নির্যাতন, স্বেচ্ছাচার বিশৃঙ্খলায় আল্লাহর এই যমিন পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। আর এই নির্দিষ্ট কয়েকজন আপনার নির্লিপ্ততায় ক্ষমতার অংশীদারিত্বে পরিণত হলো।
এরপর থেকে কোনো অভিযোগকারী আসলে তাকে বাধা দেওয়া হয়। সে যদি চায় যে আপনি যখন বের হবেন তখন আপনার কাছে তার অভিযোগ তুলে ধরবে। তখন সে দেখতে পায় যে, আপনি এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন। আর সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছেন। এরপরও যখন অভিযোগকারী আসে এবং আপনার উপদেষ্টাদের কাছে এ সংবাদ পৌছে, তখন তারা অভিযোগ গ্রহণকারীকে বলে রাখে, সে যেন তার অভিযোগ আপনার কাছে না পৌঁছায়।
ফলে অভিযোগপ্রার্থী বারবার তার কাছে আসতে থাকে, আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকে এবং অভিযোগ পেশ করে, সাহায্যের প্রার্থনা করতে থাকে। আর দায়িত্বশীল ব্যক্তি বারবার তাকে ফিরিয়ে দিতে থাকে। এক পর্যায়ে অভিযোগপ্রার্থী যখন বিড়ম্বনার শিকার হয়ে চলে যেতে থাকে অতঃপর দেখে যে আপনি। বাইরে এসেছেন, তখন সে চিৎকার করে আপনার কাছে তার অভিযোগ জানায়। তখন সে এমন প্রহারের সম্মুখীন হয়, অন্যদের জন্য যা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিতে পরিণত হয়। আপনি সেগুলো দেখতে থাকেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার করেন না। তাহলে ইসলামের আর কী বাকি থাকল?
হে আমিরুল মুমিনিন! আমি একবার চীন দেশ সফর করেছিলাম। একবার সেখানে গিয়ে শুনতে পেলাম যে, সে দেশের রাজার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই একদিন তিনি প্রচণ্ড কান্নাকাটি শুরু করলেন। তখন তাকে তার সভাসদগণ ধৈর্য ধারণ করতে উৎসাহ দিল। তখন তিনি বললেন, আমি তো আমার উপর আপতিত এই মসিবতের কারণে কাঁদছি না। আমি তো কাঁদছি সেই নির্যাতিতদের কথা ভেবে যারা আমার দুয়ারে আর্তনাদ করে ফরিয়াদ করবে, আর আমি তাদের ফরিয়াদ শুনতে পাব না।
কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, যদিও আমি শ্রবণ শক্তি হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু দৃষ্টি শক্তি তো হারাইনি। সুতরাং সাধারণ মানুষের মাঝে ঘোষণা করে দাও যে, অভিযোগপ্রার্থী ছাড়া আর কেউ যেন লাল পোষাক পরিধান না করে। এরপর তিনি হাতিতে চড়ে সকাল-সন্ধ্যা লক্ষ্য রাখতেন যে, কোনো নিপীড়ত দেখতে পান কি না।
একটু চিন্তা করুন হে আমিরুল মুমিনিন! সে তো আল্লাহকে অস্বীকারকারী এক শাসক। কিন্তু মুশরিকদের প্রতি তার মমতাবোধ এই স্তরে এসে পৌঁছেছে। আর আপনি নবীর বংশোদ্ভূত আল্লাহ বিশ্বাসী এক মুসলিম শাসক। তারপরও মুসলমানদের প্রতি আপনার মমতাবোধ লোভ-লালসাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারল না।
আপনি যদি এই সম্পদ-সম্ভার আপনার সন্তানের জন্য পুঞ্জিভূত করে থাকেন, তাহলে তো নবজাতক শিশুর মাঝে আল্লাহ আপনাকে অনুপম দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করিয়েছেন, যে মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ট হয়, পৃথিবীজুড়ে তার জন্য এতটুকু সম্পদও থাকে না, প্রতিটি সম্পদ এর পিছনেই থাকে কোনো না কোন লোভাতুর হাতের কর্তৃত্ব। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এ রিক্তহস্ত শিশুটিকে অনুগ্রহ ও অনুকম্পা করতে থাকেন, ধীরে ধীরে তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর সম্পদ দেওয়ার তো আপনি কেউ নন, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, যতটুকু ইচ্ছা করেন দান করেন। হয়ত আপনি বলবেন, ক্ষমতার হাতকে মজবুত করার জন্য আপনি এই সম্পদ সঞ্চয় করছেন। তাহলে জেনে রাখুন, আল্লাহ তা'আলা বনী উমাইয়্যা সম্প্রদায়ের মাঝে আপনার জন্য বহু শিক্ষা রেখেছেন। যখন আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করলেন, তখন তাদের পুঞ্জিভূত স্বর্ণসমাহার, প্রশিক্ষিত সৈন্যদল, বিপুল অস্ত্র-শস্ত্র ও অশ্ববাহিনী এসব কিছু কোনোই কাজে আসেনি।
আপনি যদি বলেন, আপনি এমন এক মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে সম্পদ সঞ্চয় করেছেন, যা আপনি যে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত আছেন, তার চেয়েও মহৎ; তাহলে জেনে রাখুন, আল্লাহর কসম! আপনার বর্তমান অবস্থার উপরে যে অবস্থান আছে তা অর্জন করা যায় শুধু আপনার অনুসৃত পন্থার বিপরীত পন্থা অবলম্বন করার দ্বারা। হে আমিরুল মুমিনীন! যে আপনার অবাধ্যতা করে তার জন্য কি কতলের চেয়ে কঠিন কোনো সাজা হতে পারে? খলিফা মানসূর বললেন, না। লোকটি বলল, যে মহান আল্লাহ আপনাকে ক্ষণিকের জন্য এই পৃথিবীর রাজত্ব দান করেছেন, যিনি তার অবাধ্যচারীকে শাস্তি দেন শুধু জীবন কেড়ে নিয়ে নয়, বরং যন্ত্রণাদায়ক চিরস্থায়ী আযাবের মাধ্যমে। সেই মহান সত্তার সাথে আপনার কীরূপ আচরণ হওয়া উচিত? আপনার মনের দৃঢ় সংকল্প, আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কর্ম-ব্যস্ততা, আপনার চোখের দৃষ্টি সীমানা এবং আপনার হস্তদয়ের উপার্জন ও পদযুগলের বিচরণ- সবই তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছেন।
অনুবাদ : পৃথিবী জুড়ে রাজ্যাভিলাস আপনার কী কাজে আসবে যদি তিনি তা আপনার হাত থেকে ছিনিয়ে নেন এবং হিসাব নেওয়ার জন্য আপনাকে অনন্তে ডাক দেন?
বর্ণনাকারী বলেন, খলীফা মানসূর কাদঁতে লাগলেন। কাদঁতে কাদঁতে বললেন, হায়! যদি আমার সৃষ্টি না হত। হায় আফসোস! কীভাবে আমার মুক্তি হবে! লোকটি বলল, আমিরুল মুমিনীন! সমাজে কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি আছেন, দ্বীন দুনিয়া উভয় বিষয়ে মানুষ তাদের সাথে সন্তুষ্ট চিত্তে সম্পর্ক রাখে এবং তাদের শরণাপন্ন হয়। তাদেরকে আপনার উপদেষ্টা নিযুক্ত করুন এবং যে কোনো বিষয়ে তাদের সাথে পরার্মশ করুন। তারা আপনাকে সঠিক পথ দেখাবে, সঠিক সিদ্ধান্ত দেবে। খলিফা বললেন, আমি তাদেরকে ডেকেছি, কিন্তু তারা আসতে অসম্মতি জানিয়েছেন। লোকটি বলল, তারা আশঙ্কা করছেন যে, আপনি তাদেরকে ভুল পথে চলতে বাধ্য করবেন। আপনি আপনার দার উন্মুক্ত করে দিন। পাহারা শিথিল করুন, মযলুমকে সাহায্য করুন, যালিমকে দমন করুন, সঠিক পন্থায় শুল্ক ও সদকা গ্রহণ করুন। ন্যায় ও নিষ্ঠার সাথে তা মানুষের মাঝে বণ্টন করুন। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, তারা আপনার কাছে আসবে। জাতির স্বার্থে আপনাকে সহায়তা করবে। এসময় মসজিদে মু'আযযিনের আগমন হল। মিনারে মিনারে ধ্বনিত হল সালাতের আহবান। খলিফা নামাজ শেষে আগের জায়গায় ফিরে এলেন। কিন্তু লোকটিকে আর খুজেঁ পাওয়া গেল না।
(মুখতারাত মিন আদাবিল আরাব ১ম খন্ড)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন