চীনের জলবিদ্যুৎ শক্তি বিশ্বের অন্যতম এক বিস্ময়। বর্তমানে চীন বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ এবং বিশ্বের শীর্ষ ১০টি বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি চীনেই অবস্থিত।
চীনের প্রধান ও বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নিয়ে একটি বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:
১. থ্রি গর্জেস ড্যাম (Three Gorges Dam)
এটি চীনের তো বটেই, বরং বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।
অবস্থান: হুবেই প্রদেশের ইয়াংজি নদীর ওপর।
উৎপাদন ক্ষমতা: এর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২,৫০০ মেগাওয়াট।
গুরুত্ব: ২০০৩ সালে এটি চালু হয়। এই প্রকল্পটি কেবল বিদ্যুৎই উৎপন্ন করে না, বরং ইয়াংজি নদীর বিধ্বংসী বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজ চলাচলেও বড় ভূমিকা রাখে। এটি চীনের প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন।
২. বাইহেতান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Baihetan Hydropower Station)
এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র।
অবস্থান: দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের জিনশা নদীর (ইয়াংজি নদীর উপরের অংশ) ওপর।
উৎপাদন ক্ষমতা: এর মোট ক্ষমতা ১৬,০০০ মেগাওয়াট।
বিশেষত্ব: এর প্রতিটি টারবাইন ১ গিগাওয়াট (১,০০০ মেগাওয়াট) ক্ষমতা সম্পন্ন, যা বিশ্বের একক কোনো টারবাইনের জন্য সর্বোচ্চ। ২০২২ সালে এটি পূর্ণমাত্রায় চালু হয়।
৩. জিলুওডু ড্যাম (Xiluodu Dam)
বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
অবস্থান: ইউনান এবং সিচুয়ান প্রদেশের সীমান্তে জিনশা নদীর ওপর।
উৎপাদন ক্ষমতা: এর উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৩,৮৬০ মেগাওয়াট।
বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পলি কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশালাকার 'আর্ক ড্যাম' (Arch Dam)।
৪. উডংডু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র (Wudongde Hydropower Station)
অবস্থান: জিনশা নদীর ওপর।
উৎপাদন ক্ষমতা: ১০,২০০ মেগাওয়াট।
বিশেষত্ব: ২০২১ সালে এটি চালু হয়। এটি অত্যন্ত সরু এবং গভীর একটি উপত্যকায় নির্মিত, যা আধুনিক নির্মাণ কৌশলের প্রমাণ দেয়।
৫. জিয়াংজিয়াবা ড্যাম (Xiangjiaba Dam)
অবস্থান: ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশের সীমান্তে।
উৎপাদন ক্ষমতা: ৬,৪০০ মেগাওয়াট।
গুরুত্ব: এটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রধানত পূর্ব চীনের শিল্পাঞ্চলগুলোতে সরবরাহ করা হয়।
কেন চীন জলবিদ্যুৎকে এত গুরুত্ব দিচ্ছে?
১. কার্বন নির্গমন কমানো: ২০৬০ সালের মধ্যে চীনকে 'কার্বন নিরপেক্ষ' করার লক্ষ্য পূরণে জলবিদ্যুৎ বড় ভূমিকা রাখছে।
২. নবায়নযোগ্য জ্বালানি: কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব শক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
৩. শিল্পায়ন: চীনের দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ সস্তা বিদ্যুতের প্রয়োজন।
ভবিষ্যতের মেগা-প্রকল্প
চীন বর্তমানে তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো (ব্রহ্মপুত্রের উপরের অংশ) নদীর ওপর আরও একটি বিশাল প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে, যা সম্পন্ন হলে থ্রি গর্জেস ড্যামকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এটি পরিবেশগত ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোচিত ও বিতর্কিত।
চীনের এই বিশাল অবকাঠামোগুলো কেবল তাদের শক্তির চাহিদাই মেটাচ্ছে না, বরং বিশ্বজুড়ে জলবিদ্যুৎ প্রযুক্তির মানকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন