⛔নির্জন লাইব্রেরির ১৩ নম্বর বই⛔
(✍️একটি ভয়ঙ্কর, কুফুরি, বাস্তবধর্মী অভিজ্ঞতা✍️)
আসসালামু আলাইকুম,
আমি আপনাদের ভুতের কাহিনী পেইজের একজন নিয়মিত ফলোয়ার। আমরা সব সময় আপনাদের পেজের গল্পগুলো পড়ে থাকি। সত্যি বলতে, আপনাদের গল্পগুলো পড়তে খুবই ভালো লাগে। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম একটা সত্যিকারের ঘটনা শেয়ার করব, যেটা আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঘটেছিল।
আজ সেই ঘটনার ভার নিয়ে লিখতে বসেছি।
এই ঘটনা কল্পনা নয়, কাকতালীয়ও নয়—এটা একটি বইয়ের অভিশপ্ত প্রভাব, যা আমাদের পরিবারে এখনো রয়ে গেছে।
ঘটনাটা ২০১৪ সালের জুন মাসের।
আমি তখন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। শহরের হট্টগোল আর চাপ থেকে একটু দূরে পড়ার সুবিধার জন্য আমরা গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম—পাবনার আটঘরিয়া থানার একটা ছোট্ট গ্রাম, নাম বিলচাপড়া।
আমার নানা ছিলেন একসময় স্কুল শিক্ষক, তাঁর রেখে যাওয়া পুরনো লাইব্রেরি এখনো আছে গ্রামের বাজারের পাশে।
লাইব্রেরিটার নাম সিরাজ মেমোরিয়াল পাঠাগার—একটা কাঠের পুরনো ঘর, দুঃখে-চাপা চেহারা, জানালায় মরিচা ধরা শিক। বাইরের একপাশে বিশাল একটা বটগাছ, যার নিচে কিশোর বয়সে খেলতাম।
লাইব্রেরিটার অন্দরমহল নিঃসঙ্গ, কেমন যেন একটা সাড়া না-দেয়া শ্বাস থাকে ভেতরে ঢুকলেই। আমার খালাতো ভাই রিজভী একদিন হঠাৎ বলল,
“চল লাইব্রেরিতে যাই, ভূগোলের পুরনো ম্যাপ বই খুঁজে আনি।”
আমরা দুই ভাই হাঁটতে হাঁটতে লাইব্রেরিতে ঢুকলাম। বিকেলের শেষ আলো তখন জানালার ফাঁক দিয়ে ধুলোর ভেতর ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে।
বইয়ের তাকগুলো দেখে মনে হয়, শত বছর ধরে কেউ স্পর্শ করেনি।
তখনই একটা তাকের কোণায় চোখে পড়ল একটা মোটা বই। কালো চামড়ার মলাট, ধূলিতে ঢেকে যাওয়া, কিন্তু তার উপর সাদা রঙে লেখা —
“১৩”
কোনো লেখক নেই, প্রকাশকের নাম নেই, এমনকি বইয়ের নামটুকুও না।
রিজভী বলল,
“এইটা তো একদম সিনেমার মতন। একটা বই, নাম নাই, লেখা নাই, শুধু একটা নম্বর।”
আমি বললাম, “তাকের উপরে তো লেখা আছে—‘এই বই বাইরে নেয়া নিষিদ্ধ।’”
সে হেসে বলল, “আরে ভাই, পুরনো পাগলের লেখা। দেখি তো কী আছে!”
বইটা লাইব্রেরি থেকে নিয়ে আসা হলো আমাদের বাড়ির পিছনের পুরোনো টিনের ঘরে। আমরা তিনজন — আমি, রিজভী আর আমাদের ছোট মামা — বইটা নিয়ে বসলাম।
প্রথম পাতায় ছিল আরবি হরফে কিছু লেখা—কিন্তু সেটা কোনো দোয়া-কালাম মনে হচ্ছিল না।
পাশের পাতাগুলোতে আঁকা ছিল বিকৃত মুখের ছবি, উল্টো চোখ, খুলি, পচা দাঁতের রেখাচিত্র, আর কিছু কালো প্রতিমা-সদৃশ জিনিস যাদের মানুষও বলা যায় না।
একটা পাতায় লেখা ছিল:
“এই বইয়ের ১৩টি পৃষ্ঠা খোলা মানে ১৩টি ঘুমন্ত আত্মাকে জাগানো।
যে একবার পঞ্চম পাতায় পৌঁছায়, তার ঘুম আর কোনোদিন হয় না।”
আমরা তখনো হেসেছি। অন্ধবিশ্বাস বলে উড়িয়ে দিয়েছি।
কিন্তু রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় অদ্ভুত ঘটনা।
রিজভী হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
আমরা গিয়ে দেখি, ও বিছানায় পড়ে গিয়ে ফিসফিস করে কাঁদছে—“ও বলছে… চোখে তাকাতে নিষেধ ছিল… আমি দেখছি… আমার ভুল হয়েছে…”
তার গা গরম হয়ে গেল, শরীর লালচে, ঠোঁট কাঁপছে।
গ্রামের ডাক্তার এল, কিন্তু সে শুধু বলল, “এ জ্বর না… ভয় পেয়েছে ছেলেটা।”
আমাদের মাথায় তখনো সেভাবে কিছু আসে নাই।
পরদিন সকালে বইটা ওর বিছানার পায়ের কাছে পড়ে ছিল—আমরা তো আগের রাতে জানালার পাশে রেখে এসেছিলাম!
তৃতীয় দিন দুপুরে আমার মা এসে বললেন,
“এই বইটা কেমন জানি অশুভ লাগছে, কোরআন শরীফ নিয়ে বসি।”
মা সূরা ফালাক পড়ে বইটির উপর ফুঁ দিতে না দিতেই বইটা দাউ দাউ করে আগুনে জ্বলে উঠল।
আমরা আঁতকে উঠি। পানি ঢাললাম, কিন্তু আগুন নিভলো না।
জ্বলার পরে দেখি, বইটার পাতাগুলো ছাই হয়ে যায়নি। শুধু চামড়ার মলাট একটু পোড়েছে। বাকিটা অক্ষত।
আমার নানা জীবিত থাকতে একটা কথা বলতেন —
“লাইব্রেরির শেষ তাকের ‘অনার্থ’ বই কেউ খুলবে না। সেটা পড়া মানে নিজের সত্তা অন্য কারো হাতে তুলে দেয়া।”
তখন বুঝিনি কথার মানে।
আমরা বাধ্য হয়ে গ্রামের একজন হুজুরকে ডাকি। তিনি এসে বইটা দেখে কিছুক্ষণ নীরব থাকেন।
তারপর তিনি বললেন:
“এইটা মানুষের বই না। এইটা ‘সুলায়মানী কুফুরি বংশের’ খাতা। প্রতিটি পৃষ্ঠা একটা আত্মাকে জাগায়।
১৩ নম্বর মানে পুরো ১৩টি আত্মার শেষ একত্র ফর্ম—একটা গনশক্তি, যেটা মানুষের শরীর দখল করতে পারে।”
আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা নষ্ট করা যাবে না?”
তিনি বললেন, “না। এই ধরনের বই আগুনে পুড়ে না, পানিতে ডোবে না, শুধু সিল করা যায়। এবং সিল করতে হলে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে তা করা দরকার।”
আমরা তখন তার পরামর্শে, লাল কাপড়ে মুড়িয়ে বইটি সেই লাইব্রেরির পিছনের বটগাছের গোড়ায় পুঁতে ফেলি, তার আগে কয়েকটি বিশেষ দোয়া পড়ে।
তবে ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি।
তার পর থেকে প্রতি বছর ১৩ জুলাই, রাত ১:১৩ মিনিটে ঠিক জানালার নিচে একটা অদ্ভুত ছায়ামূখ দাঁড়িয়ে থাকে।
মা একদিন শুধু এক ঝলক দেখেছিলেন—একটা মুখ, যেটার চোখ নেই, কিন্তু গভীর খালি কোটরে কাঁদছে।
আরও ভয়াবহ কথা হচ্ছে — রিজভী এখনো স্বপ্নে সেই বই দেখতে পায়। ওর বিছানার নিচে মাঝে মাঝে পাতাগুলো ছড়িয়ে পড়ে।
যখনই পাতাগুলো একত্র হয়, ওর শরীরে চামড়ার নিচে লেখা গুলি ফুটে ওঠে—সাদা রঙে, উল্টো অক্ষরে।
গতবছর আমরা আবার একজন পীর সাহেব ডেকে এনেছিলাম। তিনি বলেছিলেন—
“বইটা এখনো পাঁজরের নিচে ঘুমিয়ে আছে। কেউ যদি আবার ১৩টি পৃষ্ঠা পড়ে ফেলে, সেই আত্মারা আবার মুক্তি পাবে। এবং এবার আর কিছুই থামাতে পারবে না।”
আমরা এখন সেই লাইব্রেরির দিকে তাকাই না।
সেই বটগাছের নিচে কেউ বসে না।
তবে আজও প্রতিটি বাতাসে কেমন যেন পাতার উল্টানোর শব্দ পাওয়া যায়…
এটা কোনো গল্প না।
আমার পরিবার আজও এই ঘটনার ছায়া বয়ে বেড়াচ্ছে।
১৩ নম্বর বই হয়তো আজও কারো ঘরে যেতে চায়, কোনো নতুন পাঠক খুঁজছে… যে আবার খুলে ফেলবে পঞ্চম পৃষ্ঠা…
এইবারের মতো এখানেই শেষ করলাম।
দয়া করে ১৩ সংখ্যাটিকে হালকা ভাবে নিবেন না।
কিছু সংখ্যার পেছনে ইতিহাস না থাকলেও,
কুফুরি ছায়া ঠিকই লুকিয়ে থাকে।
শেষ।