প্যাড থেকে মেন্সট্রুয়াল কাপে সুইচ করাটা আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত!
শুধু আমার না, আমার পরিচিত যত মেয়ে মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার শুরু করেছে তাদের পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা বদলে গেছে!
এমন কেউ এই পোস্ট দেখে থাকলে আপনার অভিজ্ঞতা কমেন্টে জানাবেন, এতে অন্যরা উৎসাহ পাবে।
শুরুতে বলি মেন্সট্রুয়াল কাপ কী?
এটি মূলত ফানেলের/কাপের মতো আকৃতির মেডিকেল গ্রেড সিলিকনের কাপ। মেডিকেল গ্রেড সিলিকন, যা ব্যবহার করলে আপনার শরীরের কোনো ক্ষতি করবেনা। (ছবিতে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটাই মেন্সট্রুয়াল কাপ। বিভিন্ন রঙে বিভিন্ন সাইজে এই কাপ পাওয়া যায়।)
মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করতে হয় কিভাবে?
কেনার পর ফুটন্ত গরম পানিতে দিয়ে ৪/৫ মিনিট ফুটিয়ে নিতে হয়। বা ৫/৬ মিনিট গরম পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়। যেন কোনো প্রকার জীবাণু না থাকে।
পিরিয়ড হবার সময়ে যোনীতে/পিরিয়ডের রাস্তায় এই কাপ ভাজ করে ঢুকিয়ে দিতে হয়, ভেতরে দিয়ে ভাজ টা খুলে দিতে হয়।
একেকজনের জন্য একেক রকমের ভাজ/ফোল্ড কার্যকরী হয়।
যে যার সুবিধাজনক উপায়ে কাপ ফোল্ড করে যোনীপথে ইনসার্ট করতে পারে।
এতে কি হয়?
কাপ ঠিকঠাক মতো জরায়ু মুখে আটকে যায় এবং পিরিয়ডের রক্ত কাপের বাইরে বের হয়না, যার ফলে কোনো প্রকার প্যাড/কাপড় বা অন্য কিছু ব্যবহার করতে হয়না।
নির্দিষ্ট সময় পর পর কাপ বের করে রক্ত পরিষ্কার করে, নরমাল পানিতে কাপ ধুয়ে আবারও ইনসার্ট করতে হয়।
পিরিয়ড শেষ হলে আবারও গরম পানিতে ৫/৬ মিনিট ডুবিয়ে রেখে, পরিষ্কার করে মুছে রেখে দিতে হয়।
এটাই কাপের ব্যবহারবিধি।
কাপ ব্যবহারের আগে আমি প্যাড ব্যবহার করতাম। আমার ফ্লো অনেক বেশি এবং পিরিয়ড থাকে ৬/৭ দিন।
দিনে ৫/৬ বার প্যাড চেঞ্জ করতে হতো। ৫ টা করে ধরলে ৭ দিনে আমার প্যাড লাগতো ৩৫ টা!
আমি যে প্যাড ব্যবহার করতাম সেটার দাম ১৮০/২০০ টাকা (জায়গা ভেদে)
একটা প্যাকেটে প্যাড থাকে ১৬ পিস।
তো, এক মাসে মিনিমাম ২ প্যাকেট লাগতো, যার মূল্য ৪০০ টাকা!
বছরে কত হয়?
৪৮০০ টাকা!
মানে বছরে প্রায় ৫ হাজার টাকা শুধুমাত্র প্যাডের জন্য খরচ হতো!
এত এত প্যাডের বিজ্ঞাপন দেখা যায়, কিন্তু প্যাডের দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ তেমন দেখা যায়না!
যাজ্ঞে।
এবার আসি মেন্সট্রুয়াল কাপের দামে, একটা মোটামুটি ভালো মানের কাপের দাম ১- ৭ হাজার টাকা। এর কমেও কাপ পাওয়া যায়, যেমন আমি Menstrual Bucket & More পেইজ থেকে ছাড়ে কিনেছিলাম, ডেলিভারি চার্জ সহ ৯৩০ টাকার মতো পরেছিলো খরচ।
এই একটা কাপ ব্যবহার করা যাবে মিনিমাম ৫/৬ বছর!
এই সময়ে যেখানে প্যাড ব্যবহার করলে খরচ হতো ২৫/৩০ হাজার টাকা, সেখানে মাত্র ১ হাজার টাকা লাগছে!
আর্থিক দিক দিয়ে মেন্সট্রুয়াল কাপ এতটাই সাশ্রয়ী।
এবার বলি কাপ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা।
ব্যবহারের প্রথম দিকে কাপ ইনসার্ট করাটা রপ্ত করতে পারছিলাম না ঠিকঠাক, যে কারণে বার বার কাপ লিক করছিলো!
যখন প্রোপারলি ইনসার্ট করতে পেরেছি তখন লিক করেনাই! আবার ভুলভাবে ইনসার্ট করলে লিক করেছে....
এভাবেই কেটেছে প্রথম মাস। অভিজ্ঞতা হয়েছিলো "মোটামুটি"
খুব বেশি ভালো না, আবার খারাপও না।
তারপর দ্বিতীয় মাস, পিরিয়ড হলো, প্যাড নিলাম প্রথমে।
তারপর সাহস করে কাপ নিলাম, কারণ আমি আসলেই চাচ্ছিলাম প্যাড ব্যবহার থেকে মুক্ত হতে।
তো, কাপ নিলাম, ইনসার্ট করতে পারলাম ঠিকঠাক, কিন্তু তবুও লিক হলো!
কারণ কি?
কারণ হলো হেভি ফ্লো!
অনেক বেশি ফ্লো হবার কারণে কাপ ভরে গেছিলো, এবং কাপ ধরে রাখতে পারেনি, যে কারণে লিকেজ হয়ে গেছে!
কাপ পরিষ্কার করে আবার নিলাম।
আবারও সেই একই ভাবে লিক করলো!
বুঝলাম আমাকে আরেকটু দ্রুত সময়ের গ্যাপে কাপ ক্লিন করতে হবে।
তারপর আমার আইডিয়া অনুযায়ী সময়ের গ্যাপে কাপ ক্লিন করতে শুরু করলাম। ফলাফল? আর লিক করলোনা একবারও!
শুরুর দিকে বাইরে গেলে কাপের সাথে প্যাড নিতাম। এখন সেটাও আর প্রয়োজন হয়না।
এমনকি বাসায় থাকলে অন্তর্বাসও পরতে হয়না!
কাপ ব্যবহারে এতোই সুবিধা পেলাম যে শুধুমাত্র শারীরিক ব্যথা, মুড সুইং ইত্যাদি থাকলো, এসব বাদে অন্য সমস্যা যেমন প্যাড ব্যবহারে যে একটা আনইজিনেস থাকে, গরমের সময় অতিরিক্ত গরম লাগে, র্যাশ হয় এইসব কিচ্ছুই আর থাকলোনা!
অনেকে তো বলে তাদের শারীরিক ব্যথাও নাকি কমে যায়! আমার সেসব কমেনি। প্রতিবারের মতো প্রচন্ড ব্যথা ছিলো....
তবে, অন্যান্য অস্বস্তি থেকে মুক্ত হয়েছি! বার বার প্যাড চেঞ্জ করার ঝামেলা থাকেনা, প্যাড ফেলার ঝামেলা থাকেনা, অতিরিক্ত গরম লাগেনা, র্যাশ হয়না!
এসব আমার জন্য অনেক শান্তির ব্যাপার!
আমার মনে হলো, আমি যে শান্তি টা পাচ্ছি এইটা সব মেয়েরাই পাক! তাদের পিরিয়ডকালীন সময়ের অস্বস্তি কমুক, অশান্তি কমুক, খরচ কমুক...
তাই নিজ দায়িত্বে এই পোস্ট দিচ্ছি।
এই পোস্ট সবার ভালো না-ও লাগতে পারে, ভালো না লাগে এড়িয়ে যাবেন।
সবার মতের সাথে মিল না-ও হতে পারে, সবার মতের মিল হওয়া জরুরি না।
যদি একটা মেয়েরও এই পোস্টের মাধ্যমে উপকার হয়, সেটাই আমার জন্য আনন্দের বিষয় হবে!
যারা প্রথমবার মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য ছোট্ট কয়েকটা সাজেশন-
১. নিজের জন্য পারফেক্ট সাইজের কাপ কিনবেন। আপনার পারফেক্ট সাইজ কোনটা সেটা আপনি গুগল করে, ইউটিউব দেখে বের করতে পারবেন।
২. সস্তা প্লাস্টিকের মেন্সট্রুয়াল কাপও পাওয়া যায়, যেটা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। তাই দাম একটু বেশি দিয়ে হলেও ভালো মানের কাপ কিনবেন। বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন কিছু ভালো ব্রান্ডের মেন্সট্রুয়াল কাপ হলো- পিসেফ,ফিউরিজ সেইফ কাপ,অরিগানি কাপ, ডিভা কাপ...এইসব।
আমি সিরোনা ব্যবহার করছি। এটাও আমার কাছে ভালোই লেগেছে।
৩. কাপ ব্যবহারে অনেকে ভয় পান, ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, নিজের শরীরে কিছু একটা ঢুকানো, ভয় তো লাগবে। তবে, ভয় লাগলেও ব্যবহার করে দেখেন, ব্যবহার করা শুরু করলেই ভয় কেটে যাবে, আর ইউজ টু হয়ে গেলে অনেক শান্তি পাবেন।
আর সিলিকনের এই কাপ হয় নরম! একটুও ব্যথা লাগেনা!
৪. কাপ ব্যবহারের পূর্বে ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখবেন। কিভাবে ফোল্ড করতে হয়, কিভাবে আনফোল্ড করতে হয়, কিভাবে ইনসার্ট করতে হয়, কিভাবে বের করতে হয়...সবকিছুই জানতে পারবেন টিউটোরিয়ালে।
৫. কাপ ইনসার্টের ক্ষেত্রে ধৈর্য প্রয়োজন। প্রথমবারেই পারফেক্টলি ইনসার্ট না-ও হতে পারে। একবার/কয়েক বারে না হলেই হাল ছেড়ে দিবেন না। নিজেকে উৎসাহ দিয়ে ব্যবহার করতে থাকবেন। একসময় একেবারে সহজ হয়ে যাবে।
৬. যেকোনো নতুন কিছু শিখতে, নতুন কিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে তো সময় লাগে তাইনা? সেই সময়টা নিজেকে দিবেন। শিখে যাবার পরে, মানিয়ে নেয়ার পরে যে সুবিধা গুলা পাবেন, সেসব পেলে তখন নিজেই নিজেকে বলবেন "ভাগ্যিস মেন্সট্রুয়াল কাপ টা ব্যবহার শুরু করেছিলাম!"
আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জিজ্ঞেস করতে পারেন।
পিরিয়ড ন্যাচারাল প্রসেস, সেটার সাথেই যখন বেঁচে থাকতে হবে, বেঁচে থাকাটা সহজ করি।
সবাই নিজের শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হই 🌸
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে রাখতে পারেন। এতে অন্যরাও জানতে পারবে।
তবে কপি পেস্ট করবেন না।
ধন্যবাদ।
©Sumaia Sarah
