ইরান সফরে গিয়ে শুনলাম নামাজ তিন ওয়াক্ত
সাহাদত হোসেন খান
অনেক দিন আগের কথা। ১৯৯৭ সালের জুনে ইরানের মরহুম আয়াতুলাহ খোমেনির ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ইরান সফরে গিয়েছিলাম। তখন জানতে পারি, নামাজ তিন ওয়াক্ত। সারাজীবন জানতাম এবং এখনো জানি, নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত। ইরানে গিয়ে হেঁাচট খাই। প্রথম দিনই কেমন কেমন মনে হলো। তেহরানে পৌঁছে মেহেরাবাদ বিমান বন্দর ত্যাগ করতে করতে মাগরেবের নামাজের ওয়াক্ত হয়ে যায়। আমাকে এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদূর নূরকে নিয়ে গাড়ি শহরের ভেতর ছুটে চলে। আমার মন শুধু নামাজ পড়ার জন্য খচ খচ করছিল। ভাবছিলাম, আজান হয়ে গেলে হয়তো গাড়ি থামাবে। পথে নামাজ পড়ে নেবো। গাড়ি ছুটছে তো ছুটছেই। গাড়ি কিছুতেই থামছে না। বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম নামাজের সময় আছে কিনা। অন্ধকার হয়ে আসে। মনটা খারাপ হয়ে যায়। চালক আবার বুঝে না ইংরেজি।
১৬ তলা উঁচু একটি হোটেলে এসে ওঠি। ১৩ তলায় আমাদের থাকার জায়গা হয়। আমাদের রুমের সামনে সুউচ্চ এল বুর্জ পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় বরফ। পাহাড়ের তুলনায় ১৬ তলা ভবনকে আমার কাছে ম্যাচ বাতির মতো মনে হলো। আমি শুধু নামাজ পড়ার সুযোগ খুঁজছিলাম। সমস্যা হলো দিক তো জানা নেই। কারো কাছে জিজ্ঞেস করবো এমন কোনো লোকও নেই। নিজের ধারণা মতো কেবলা ধরে নিয়ে নামাজ পড়ে নেই। রাতের খাবারের জন্য নিচে নামি। হোটেলের ডেস্কে জানতে চাই কেবলা কোনদিকে। কেবলা শুনে বুঝে ফেলি যে, হোটেলে এসে আমি মাগরেবের নামাজ পড়েছি উল্টোদিকে।
ঘনিয়ে আসে এশার নামাজ। কিন্তু কোনো আজানের সুর শুনতে পাইনি। কিরে আজান গেল কই? আমাদের দেশে নামাজের সময় হাজার হাজার মসজিদে একটানা আজান শুরু হয়। অন্তত ১৫ মিনিট চলে আজান। কেউ নামাজ পড়–ক বা নাই পড়–ক সবাই আজান শুনতে পায়। কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে আমি চারদিন আজান শুনতে পাইনি। আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ওষুধ আনার জন্য এক মেডিকেল সেন্টারে যাই। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। ঠিক তখন মেডিকেল সেন্টারের মাইক্রোফেনে ক্ষীণকণ্ঠে আজান শুনতে পাই। মৃদু শব্দ। একটু দূরে গেলে শোনা যায় না। আমি যেন কি শুনলাম। দিনে পাঁচ বার আজান শুনি। আর টানা চারদিন আজানের সুর না শোনায় আমি যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ি। কার কাছে কি বলবো। আমরা হলাম মেহমান। তাদের দেশে গিয়েছি। তারা যেভাবে রাখে সেভাবে থাকতে হবে। আবার সব কথা বুঝাতেও পারি না।
একদিন সকালে আয়াতুলাহ খোমেনির মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনায় যোগদানে আমাদেরকে হোটেল থেকে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আলোচনা শুরু হয়। দুপুর গড়িয়ে যায়। নামাজের কোনো আয়োজন দেখিনি। হোটেলে ফিরে এসে নামাজ আদায় করি। বিকেলের সেশনে যোগদানে আমাদেরকে আবার নিয়ে যাওয়া হয়। আলোচনা শুনছিলাম। কিন্তু আমার মন শুধু আছরের নামাজের প্রতি। নামজের সময় হয়ে যায়। কাউকে আমি নামাজ পড়তে দেখছিলাম না। বিরতি দেয়া হয়। ভাবলাম, এবার হয়তো নামাজ পড়া যাবে। কিন্তু দেখলাম সবাই চা বিস্কুট খাচ্ছে। গল্প করছে। লোকগুলো সাধারণ নয়। কারো মাথায় সাদা পাগড়ি আবার কারো মাথায় কালো। মাথায় সাদা পাগড়ি থাকার মানে হলো তিনি আয়াতুলাহ এবং কালো পাগড়ি থাকার মানে হলো তিনি সৈয়দ। সৈয়দরা অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তারা হলেন আমাদের নবীর (সা.) বংশধর। তাদেরকে প্রেসিডেন্টের বেশি সম্মান দেয়া হয়। তাদের মতো সম্ভ্রান্ত লোক নামাজ না পড়ায় আমি বিস্মিত হই। মনটা খারাপ হয়ে যায়। তাদের প্রতি ঘৃণা এসে যায়। নামাজ পড়ে না আবার শ্রদ্ধা কিসের! এগিয়ে আসে মাগরেবের নামাজের সময়। তখনো কারো নামাজের গরজ নেই। মনটা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। মনে মনে গালি দিচ্ছিলাম। বলছিলাম, ‘রাখ বেটা তোদের ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ইসলামি বিপ¬ব। ইসলাম না থাকলেও আমাদের দেশ হাজার গুণে ভালো। আমাদের দেশে ইসলাম আছে। তোদের মতো ইসলাম আমাদের দরকার নেই।’
অবশেষে আমাদের গাইড থাকাবির কাছে জানতে চাই যে, কয়েক বেলা নামাজের সময় গড়িয়ে গেলেও কেন নামাজ পড়তে পারিনি। তখন আমাদেরকে জানানো হয়, শিয়া মাজহাবে নামাজ তিন ওয়াক্ত। একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খাই। গাইড আরো জানালো, কোরআানে নাকি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের স্পষ্ট সময় উলেখ করা হয়নি। আমি কথা বাড়াতে যাইনি। আর জানি—ই বা কি। আমার বাবাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে দেখেছি। আমি তাকে অনুসরণ করছি। আমার আর কিছু জানার দরকার নেই।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে অদ্ভূত নামাজ
ইরান সফরের আরেকটি অভিজ্ঞতা এতদিনেও ভুলিনি। এক শুক্রবার ইরানি গাইডের সঙ্গে জামারানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইমাম আয়াতুলাহ রুহুলাহ খোমেনির মাজার দেখতে যাই। ফিরতে ফিরতে দুুপুর হয়ে যায়। জুম্মার নামাজ পড়ার জন্য সোজা তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে প্রবেশ করি। টুপি না থাকায় আফসোস করছিলাম। প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথায় বাঁধি। ভেতরটা খচ খচ করছিল। টুপি নেই। না জানি কে কি মনে করে। ইরানের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ খাতামি নামাজে শামিল হন। আমি তাকে বার বার দেখছিলাম। নামাজের জন্য লাইনে দাঁড়াই। ডানে—বামে তাকিয়ে দেখি কারো মাথায় টুপি নেই। একটু পরে পরে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে আমেরিকা ও ইসরাইল বিরোধী শোগান। শোগানে সুশোভিত চত্বর গম গম করে উঠছিল। যেন রণাঙ্গন। একটু আগে টুপি না থাকার জন্য আফসোস করছিলাম। আর তখন মাথায় রুমাল বাঁধা থাকায় নিজেকে বিসদৃশ মনে হতো লাগলো। এক ফাঁকে প্যান্টের পকেটে রুমাল গুঁজে ফেলি। আমার পাশে ইরানি গাইড। নামাজ শুরু না হতেই দেখি তিনি একটি কৃত্রিম হাত খুলে নিচে রেখেছেন। আমি রীতিমতো ভয় পেয়ে যাই। আমাদের বিস্ময় দূর করার জন্য ইরানি গাইড বললেন, তিনি ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য। ইরান—ইরাক যুদ্ধের সময় আহওয়াজে ইরাকি হামলায় একটি হাত হারান। ১৯৮০—৮৮ সালে ইরান—ইরাক যুদ্ধের সময় বহুবার আহওয়াজের নাম শুনেছিলাম। সামরিক বাহিনী থেকে ইরানি গাইড অবসর গ্রহণ করেছেন। তিনি একটি কৃত্রিম হাত লাগিয়েছেন। তার কথা শুনে ভীতি দূর হয়। নামাজ শুরু হয়ে যায়। এক কি দুই রাকায়াত পড়ে দেখি অন্যদের সঙ্গে আমাদের নামাজ মিলে না। নামাজ বাদ দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। দেখলামসেজদায় গিয়ে তারা একটি মাটির টুকরো কপালে ঠেকায়। এমন অদ্ভূত নামাজ জীবনে দেখিনি। শিয়াদের নামাজ জানা না থাকায় আমার জায়গায় আমি বসে থাকি। অপেক্ষা করতে থাকি কখন সবার নামাজ শেষ হয়। একসময় অপেক্ষার পালা শেষ হয়। এ অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলবো না। ভাবছিলাম, নামাজ পড়লাম নাকি রাজনৈতিক সমাবেশে যোগ দিলাম।
(লেখাটি আমার ‘ধর্ম সমাজ ও রাজনীতি’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে রাবেয়া বুকস)