😞মেয়ে হিসেবে একা ভ্রমণ ও দুর্ঘটনা :
নতুন অফিসে জয়েন করে একটু আনইজিই ছিলাম কাউকে চিনি না, সবাই অনেক সিনিয়র কিভাবে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না তো সেখানেই পরিচয় হয়ে গেলো আফ্রিন আপুর সাথে ।আমার থেকে কিছুটা সিনিয়র তবে খুব মনখোলা , হাসি খুশি একজন মানুষ ,খুব সহজেই আপন করে নিতে পারেন।
ঘুরতে পছন্দ করেন খুব ,আড্ডা দিতে পছন্দ করেন । বন্ধু মহলেও আপুর একছত্র দাপট চলে তার এই মনখোলা মানসিকতার জন্যই।
মিথ্যে বলব না মাঝে সাঝে আপুর এত ট্যুর দেয়া , ঘুরাফেরা দেখে হিংসাও হত । প্রতি ট্যুর শেষেই তার কাছের কিছু কলিগদের জন্য গিফট বরাদ্দ থাকতোই এবং তাদের মধ্যে আমিও একজন।
প্রতিবারের মত আপু এবারো ট্যুর দিয়ে আসার পরে তার ডাকের অপেক্ষায় ছিলাম। গিফটের লোভ কার না থাকে বলেন! কিন্তু আপুর কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে একদিন আফটার অফিস ধরেই বসলাম যে ঘটনা কি?
আগেই বলেছি ট্যুর দেয়া আপুর নেশার মতন , কিন্তু এবার তার সার্কেলের সাথে সময় ম্যাচ না করাতে তিনি একাই ট্যুর দিয়েছিলেন কক্সবাজারে।
কক্সবাজার তার দ্বিতীয় ঘরবাড়ির মত এতবার যাওয়া হয়েছে , তাই আর সলো ট্যুর দেয়ার ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখেননি। চলে গিয়েছেন বহুবার যাওয়া জায়গাটাতে আর একবার।
কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতার জন্যই এতদিনের পরিচয়ে আপুর মুখে প্রথমবারের মত শুনলাম – মেয়েদের একা ট্যুর দিতে নেই রে সে যে জায়গাই হোক না কেনো।
বললেন - কক্সবাজার শহরে নেমেই চলে গিয়েছিলাম বরাবরের মত পরিচিত হোটেলে। প্রথমে আগের মতই অভ্যার্থনা জানালো, জিজ্ঞেস করলো আর কে কে আছে? বললাম যে এবার একাই, হুট করে মনে হলো ম্যানেজারের মুখে সুক্ষ্ম পরিবর্তন আসলো বোধ হয়। কিন্তু পাত্তা দিলাম না। পরক্ষণেই প্রশ্ন করলো ঘুরতেই এসেছি নাকি অন্যকোন কাজ! বিশ্বাস কর একটু ও বুঝতে পারিনি সে সময় উনি কি বুঝাতে চেয়েছিলেন।
রেস্ট নিয়ে ফ্রেস হয়ে বুঝলাম ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে, হোটেলের হেশেলেই গেলাম। সেখানেও মনে হলো পুরোটা সময় সবাই মনে হয় আমাকে আড়চোখে দেখছে, কারণ কোন ভাবেই মাথায় আসলো না।
বিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়লাম।বরাবরের মত অটো ডাকলাম। দরদাম করে উঠতে যাব অটো ওয়ালা মামা ও জিজ্ঞেস করলো "মামা একা নাকি?" আমিও সরল মনেই বললাম জ্বি মামা। কিন্তু বুঝলাম না কেমন যেন একটা হাসি দিলো।
বিচে গিয়ে হাটছি সব ঠিকই ছিলো তখন পর্যন্ত তারপর একটা চেয়ারে বসলাম, ঘন্টা করে যে চেয়ারগুলো থাকে। ১৫-২০ মিনিট পর খেয়াল করলাম আমার চেয়ারের আসে পাশে একটু বেশিই ছেলেপেলে দাঁড়িয়ে থাকছে। কেউ কেউ ফুটবল খেলছিলো, তাদের বল কেন জানি বারবার আমার চেয়ারেই এসে লাগছিলো।
মেয়েদের গাট ফিলিংস থেকে যে তারা অনেক কিছু বুঝতে পারে তা মানিস তো? আমি উত্তরে বললাম - হু।
আপু বলে চললেন -
কেন জানি ভালো লাগছিলো না কিছু, চলে আসলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। অথচ এই সমুদ্রের তীরে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা কিছু না করেই কাটিয়ে দিতে পারি জানিস?
তারপর সব ঠিকই ছিলো, রাত ৯/১০ টার পর থেকে মনে হলো করিডোরে অনেক ছেলেপেলে। সাধারণত হোটেলের স্টাফ রা কাজ করে থাকেন চেইক ইন-চেইক আউট ইস্যুতে। তাই'ই ভেবে নিলাম। রাত ১১/১২ টা গড়ালো কিন্তু মনে হলো আমার রুমের সামনে থেকে যেন কোলাহল কমছেই না। কিছুটা বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখি আমার রুমের আসে পাশে দিয়েই অনেকেই। হয়ত হোটেল স্টাফই হবে কিন্তু এত রাতে বড় জোর ১/২ জন করে থাকে ডিউটিতে, আমার এত বছরের অভিজ্ঞতা তাই বলে। এতজন থাকার কথা নয়। জানি না কেনো অজানা আশংকা পেয়ে বসলো তাড়াতাড়ি দরজা লাগিয়ে বসে রইলাম। তাদের এই হাসাহাসি, আমার ঘরের সামনে হাটাহাটি, বিভিন্ন ধরনের অশালীন কথা বার্তা যেন চল্লো আমার ঘরের সামনের এড়িয়া জুরেই। অফ সিজনের জন্য হোটেলে বুকিং কম ছিলো কিনা তাই হয়ত অন্যঘরের ও কাউকে একবার ও শুনলাম না রুম থেকে বের হয়ে তাদের কিছু বলতে। ভোর অবধি ছিলো তারা আর এই পুরোটা সময় আমি কাঠ হয়ে বসে ছিলাম।
আর এতক্ষণে আমি বুঝে গিয়েছিলাম আসলে সমস্যা টা কোথায়। আসলেই তারা কি বুঝাতে চাচ্ছে বা ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছে!
বিশ্বাস কর আমি মানতে পারছিলাম না, কোনভাবেই না। এসব ও কখনো আমাকে ফেইস করতে হতে পারে আমার কল্পনাতেও আসেনি একবারের জন্যও।
এসবের দরুণ ৪ দিনের ট্যুর আপু ২ দিন শেষেই ফিরে এসেছেন।
খুব দুঃখ নিয়ে আপু বললেন অন্যান্য দেশের কথা জানি না তবে এই দেশে একা ট্রাভেল মেয়েদের জন্য না রে।
আপুকে বিদায় দিলাম একরাশ মন খারাপ নিয়ে , মনে পরে গেলো আপুর এবারের ট্যুরের সময় ও মনে মনে একটু ঈর্ষা'ই করেছিলাম কিন্তু কখনো ভাবিনি নিজের দেশে তার এসব অভিজ্ঞতার শিকার হয়ে আসতে হবে।
আসলে আমরা যারা ট্যুর দেই সবার আসল উদ্দেশ্য থাকে মনের শান্তি অথচ মেয়েদের জন্য কতটা কঠিন এই মনের শান্তি টুকু উপলব্ধি করা ! ভেবে দেখেছেন কখনো! না ভেবে থাকলে ভাবুন , অন্তত ভাবার প্রাক্টিস শুরু করুন।
কপি
পেস্ট
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন