হেলেন কেলারের আঁধার জীবনের আলো হয়ে হঠাৎ এলেন রবীন্দ্রনাথ:
১৯২১ সালের ৪ জানুয়ারি। বিশ্ববিখ্যাত কবির সঙ্গে দেখা হবে বলে এক মেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। মেয়েটি কি মনে মনে অস্ফুটে উচ্চারণ করছেন কোনো গান? নীরব উচ্চারণে বলছেন কি—
“Yes Master, I forget,
I ever forget, that the
Gates are shut every
Where in the house
Where I dwell alone!”
মেয়েটির তিনটি ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ। তবু কোন এক আলোর পথে যেন তাঁর বুকের ভিতর জেগে ওঠে শব্দ ভ্রমর— “কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার সেকথা যে যাই পাশরি”! দিনটা ছিল সেই আলোর সঙ্গে সাক্ষাতের দিন। মেয়েটি হেলেন কেলার আর সেই আলোর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজকের কথকতায় রইল একটি মেয়ের অন্ধকারের উৎস থেকে আলোর পথে যাত্রার কাহিনি এবং তাঁর পথপ্রদর্শক এক ভারতীয় কবির গল্প।
হেলেন কেলার জন্মেছিলেন আর পাঁচটি স্বাভাবিক শিশুর মতোই। উনিশ মাস বয়সে এক অসুখে হারিয়ে গেল তাঁর দৃষ্টিশক্তি এবং শ্রবণশক্তি। কিছুদিন পর বন্ধ হল কথা বলাও। এক মৌন, নিঃশব্দ, অন্ধকার পৃথিবীতে কেউ যেন তাঁকে জোর করে আটক করল। অথচ এমনটা হওয়ার কথাই ছিল না। সেই আঁধারে পথ হারিয়ে ফেলাটাই মনে হয় ভবিতব্য ছিল হেলেনের। কিন্তু আসল রূপকথা শুরু হল ঠিক তখনই। মায়ের সাহায্য আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে হেলেন বিশ্ববিখ্যাত হলেন। চব্বিশ বছর বয়সে তিনি আমেরিকার রাডক্লিফ কলেজ থেকে কোনো সংরক্ষণ ছাড়াই পরীক্ষা দিলেন এবং ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হলেন। হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও তাঁর টাইপ করা উত্তরপত্রগুলি রয়েছে। মার্ক টোয়েন হেলেন কেলারকে উনিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ বলেছিলেন। তাঁর অষ্টআশি বছরের দীর্ঘ জীবন কত মানুষকে আলোর নিশানা দিয়েছে। অথবা তিনি নিজেই ছিলেন একটি দীপশিখা।
হেলেনের কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত লেখাপড়ার জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষদের জন্য পথে নেমেছেন। নারীমুক্তি আন্দোলন, কালো মানুষদের জন্য লড়াই, শিশুশ্রমিকদের শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী জনসভা— সবক্ষেত্রেই দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসেছেন এই মেয়েটি। যুদ্ধ শেষে অন্ধ সৈনিকদের কাছে ছুটে গিয়েছেন প্রেরণা হয়ে। এই মেয়েটির আঁধার জগতের আলো হয়ে একদিন এলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রথমে শব্দের অবয়বেই এলেন।
রবীন্দ্রনাথের লেখা ব্রেইলের হরফে পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন হেলেন কেলার। তাঁর নীরব ভাবনার জগতে তোলপাড় হল। আলোর মতো, শব্দ ব্রহ্মের মতো রবীন্দ্রনাথ এলেন হেলেনের কপাট দেওয়া হৃদয়ের কুঠুরিতে। হেলেন নিজের ভাবনার সঙ্গে মিল খুঁজে পেলেন রবীন্দ্রভাবনার। প্রতীক্ষায় রইলেন সেই নিভৃত প্রাণের দেবতার সঙ্গে দেখা করার জন্য। তারপর সেই দিন এল। হেলেন সেই মূল্যবান দিনটির বর্ণনা লিখে রেখেছেন তাঁর লেখা ‘মিড স্ট্রিম মাই লেইটার লাইফ’ বইয়ের ‘ভ্যারিড কর্ডস’ অধ্যায়ে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় আলোচনা পড়ে হেলেন কেলার তাঁর প্রতি কৌতূহলী হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ সেই সময় এসেছেন বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। বড়ো পৃথিবীর প্রাণের জোয়ার শান্তিনিকেতনের প্রাণধারার সঙ্গে মেলানোর জন্য। সাক্ষাতের দু-দিন আগে কমিউনিটি হলে ‘The meeting of East and West’ প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথ পড়েছিলেন। এই প্রবন্ধের কথাগুলিও হেলেনকে মুগ্ধ করে। হেলেন কেলার ‘গীতাঞ্জলি’ এবং ‘গার্ডেনার’ দুটি বই গভীরভাবে পড়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই উৎসাহী ছিলেন হেলেন কেলারের সঙ্গে দেখা করার জন্য। রবীন্দ্রনাথকে দেখে হেলেন কেলার উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। গানে, কবিতায়, আলোচনায় আসর জমে উঠল। রবীন্দ্রনাথের মুখ, ঠোঁট ও কণ্ঠ স্পর্শ করে হেলেন যেন আসলে স্পর্শ করলেন রবীন্দ্রনাথের হৃদয়কে।
পরে এই মেয়েটিই লিখবেন, “Serene. Gracious. He saluted me in a monotone. Almost like a prayer…”। রবীন্দ্রনাথকে স্পর্শ করে ‘খাঁচার পাখি’ কবিতা শুনতে শুনতে আনমনে তিনি বলেছিলেন, তাঁর পৃথিবী অন্ধকার প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। রবীন্দ্রনাথ গান শোনালেন, “আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী...” আর শোনালেন, “আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী...”। তখন বুঝি একটি অন্ধকার ভুবনে আটকে থাকা চঞ্চল মেয়ে মনে মনে নীরবে উচ্চারণ করেছিল— “ওগো সুদূর, বিপুল সুদূর, তুমি বাজাও ব্যাকুল বাঁশরি—/কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার সেকথা যে যাই পাশরি...”। রবীন্দ্রনাথ হেলেনের কাছে সুদূর বিপুলের সঙ্গে এক হয়ে যান। রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনটি শব্দের অর্থ জানতে চেয়েছিলেন হেলেন কেলার— God, light, love! রবীন্দ্রনাথ ও হেলেন কেলার দুজনেই আলো বলতে বন্ধুত্ব বুঝতেন। হেলেন অন্ধকারে বন্ধুর হাত ধরে হাঁটতে ভালোবাসতেন। তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি ছিল। ছিল ল্যাটিন, ফরাসি, জার্মান ও গ্রিক ভাষায় ব্যুৎপত্তি।
দুঃখ সহ্য করেছিলেন তিনি গীতাঞ্জলির শব্দকে আঁকড়ে ধরে। মায়ের মৃত্যুর পরেও তিনি যে ঔপনিষদিক ভাবনার খড়কুটো আগলে বাঁচলেন, তাও রবীন্দ্রনাথের শব্দের সঞ্চয় থেকেই নেওয়া। হেলেন কেলার কর্মী। তাঁর দীর্ঘজীবনে ঈশ্বরনির্ভরতা ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথের প্রতি মগ্নতায় পরিণত হয়। ছায়াপথে আবার দেখা হবে, এই ইচ্ছেটুকুকে ভর করে এগিয়ে চলেছিলেন হেলেন কেলার, অন্ধকার থেকে আলোর পথে।
দুটি অসমবয়সী বন্ধুত্ব ছিল রবীন্দ্রনাথ ও হেলেন কেলারের। রবীন্দ্রনাথের ভুবন আলোর ভুবন, সেখানে এক বিস্ময় ছিলেন হেলেন কেলার। কিন্তু হেলেনের আঁধার পৃথিবীতে প্রতিদিন সূর্যোদয় হত রবীন্দ্রনাথের লেখা শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে। মনে হয় হেলেন ছিলেন এক গুপ্ত যোগী। তিনটি ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ করে নীরবে করে গিয়েছেন সত্য ও সুন্দরের উপাসনা।
সময় গড়িয়ে গিয়েছে নিজস্ব নিয়মে। ভাবতে ইচ্ছে করে, যেন ছায়াপথের ওপারে বসে হেলেন নামের একটি মেয়ে নীরবে চিঠি লিখছেন প্রিয় কবিকে— “My poet friend, Please look for me in the
nurseries of Heaven...”
সময় স্তব্ধ হয়ে আছে।
লেখা: মহুয়া দাশগুপ্ত (১৫ নভেম্বর, ২০২২)
তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ও হেলেন কেলার,
স্বপন মুখোপাধ্যায়, কোরক সাহিত্য
পত্রিকা
*******
হেলেন কেলারের একটি উক্তি—
“প্রত্যেক মানুষেরই মনের অতলে রয়ে গেছে সবুজ
মাটি আর টলটলে পানির স্মৃতি। অন্ধত্ব কিংবা
বধিরতা আমাদের পূর্ব পুরুষের দেয়া এ অধিকার
লুট করে নিতে পারে না। উত্তরাধিকার সূত্রে লব্ধ এ
ক্ষমতা অনেকটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মতো— আত্মার
ইন্দ্রিয়, যা একই সঙ্গে দেখে, শোনে এবং অনুভব
করে।”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন