এখনকার মতন পেসমেকার থাকলে হয়তো আরও অনেকদিন বাঁচতেন তাঁর মা, আক্ষেপ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়..💫🌻
সত্যজিৎ রায় যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর ডকুমেন্টারি তৈরি করছেন তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তাঁর মা সুপ্রভা দেবী,ছবিটা তিনি দেখে যেতে পারেন নি, সত্যজিৎ রায়ের ভাষায় গানকে ভালবাসা আর কাজকে ভালবাসা এ দুটো মা তাঁকে দিয়েছেন৷
সত্যজিৎ রায়ের বাবা সুকুমার রায় কে আমরা চিনি তাঁর মৃত্যুহীন সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে৷ তিনি সরস ও সজীবতার মূর্ত প্রতীক৷ আড়াই বছর যমে মানুষে টানাটানি হয়েছে,কালাজ্বরের তখন চিকিৎসাও ছিল না৷ নিজের প্রথম বই 'আবোলতাবোল' বই আকারে প্রকাশিত হওয়া তিনি দেখে যেতে পারেন নি,যদি পারতেন নিশ্চিতভাবে বলা যায় অসম্ভব খুশিই হতেন কি অনবদ্য সৃষ্টি তিনি করেছেন৷
আবালবৃদ্ধ বনিতা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী,সুকুমার রায়,সত্যজিৎ রায়,লীলা মজুমদার কে যতটা চেনেন, হয়ত সত্যজিৎ জননী সুপ্রভা দেবী কে একই ভাবে চেনেন না! কালীনারায়ণ গুপ্তর নাতনি সুপ্রভা দেবী অসাধারণ গাইতেন৷ মাসি কণক দাশের থেকে সুপ্রভা দেবীর ভাল গলা ছিল,কিন্তু অকালবৈধব্য ও দারিদ্র্য সব নষ্ট করে দিয়েছিল এই বক্তব্য তাঁর কিংবদন্তি পুত্রের৷
মানিকবাবুদের ব্যবসা তখন উঠে গিয়েছে,পৈত্রিক বাড়ি ছেড়ে সুপ্রভা দেবী ছেলে কে নিয়ে ছোট ভাইয়ের আশ্রয়ে এলেন৷ লেডি অবলা বসু কে ধরে নিজে চাকরি নিলেন বিদ্যাসাগর বাণীভবনে৷ সেলাইটা জানতেন,এমব্রয়ডারি করে সত্যজিৎ রায় কে বড় করেছেন, পরিশ্রম করতেন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত৷
বহুমুখী প্রতিভার নারী সুপ্রভা দেবীর গুণের শেষ নেই৷ ১৪বছর বয়সে মানিকবাবু ম্যাট্রিক পাশ করেছেন, ৯বছরে তাঁকে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি করা হয়৷ এর আগে তাঁর পড়াশোনা শেখা সবটাই মায়ের কাছে৷ অভাব থাকলেও সুপ্রভা দেবী ছেলেকে ভাল স্কুল, কলেজে পড়িয়েছেন৷
মা অবশ্য শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়েছিলেন, সত্যজিৎ রায় মহাশয় ডি জে কিমারে চাকরি পাওয়ার পর আর তাঁকে আর চাকরি করতে দেন নি৷ প্রথম পদ জুনিয়র ভিসুয়ালাইজার বেতন ৬৫টাকা সঙ্গে ১৫টাকা ডি এ৷
চাকরি জীবনে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে থাকেন,বাড়তে থাকে বেতন,'পথের পাঁচালী'-এর পরে যখন চাকরি ছেড়ে দিলেন তখন বেতন দু'হাজার টাকা৷
১৯৫৫সালে 'পথের পাঁচালী' মুক্তি পাবার পরে সত্যজিৎ রায় বিজ্ঞাপন জগতের কাজ ছেড়ে দেন৷নেপথ্যের কারণ হল বিজ্ঞাপন করতে গেলে ক্লায়েন্টদের চাহিদা অনুযায়ী জিনিস তৈরি করতে হত.আর ঠিক সেই ব্যাপারটায় ক্রমশ আস্থা হারাতে শুরু করেছিলেন৷
কিন্তু ছেলে সায়েব কোম্পানির ভাল চাকরি ছেড়ে ফিল্মের নেশায় মেতে ওঠায় প্রথম দিকে সুপ্রভা দেবী মোটেও প্রসন্ন হন নি,তারপর সাফল্য যখন এল ততদিনে মায়ের মন নিশ্চিন্ত হয়েছে ৷ ছেলের সব খবরের কার্টিং একটা লাল খাতায় এঁটে রেখে দিতেন৷ একটু চাপা প্রকৃতির ছিলেন,কিন্তু 'পথের পাঁচালী' দেখে তাঁর চোখেও অশ্রুধারা...🌿
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর ডকুমেন্টারি যখন ছেলে তৈরি করছেন তখন অসুস্থ হলেন সুপ্রভা দেবী,ছবিটা তিনি দেখে যেতে পারেন নি বলে বড় আপশোস ছেলের৷ একই সঙ্গে ছিল আরও বড় আক্ষেপ৷ সেই আক্ষেপের কথা আমরা শুনি মানিকবাবুর নিজের মুখেই -----
“শেষ বয়সে মায়ের ডায়াবিটিস হল সেই সঙ্গে হার্টের গোলমাল৷ এখনকার মতন পেসমেকার থাকলে হয়তো আরও অনেকদিন বাঁচতেন...”🌷
কলমে ✒️ অরুণাভ সেন
♦️তথ্যসূত্রঃ সত্যজিৎ রায় সাক্ষাৎকার সমগ্র (সন্দীপ রায়)
ফেইসবুক থেকে নেওয়া
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন