কাকেইবো: টাকা জমানোর জাপানি কৌশল
(১ম পর্ব)
টাকাপয়সা সামলানো জটিল কাজই মনে হয় আমাদের বেশিরভাগের কাছে। কেউ কেউ এ বিষয়ে সারাজীবনও সংগ্রাম করে যান। এর একটা কারণ, বেশিরভাগ সময়ই আমরা কাজটা করি কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছাড়াই।
অর্থাৎ, আপনার কাছে যদি এর কোনো কার্যকর কৌশল থাকে, মানি ম্যানেজমেন্ট অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। এই কাজকে সহজ করে তোলার অনেক উপায় আছে। তার মধ্যে একটি হল, জাপানি ‘কাকেইবো’ পদ্ধতি।
জাপানিরা জীবনে শৃঙ্খলা আনতে নানান কৌশল অবলম্বন করে। এরকম কিছু কৌশলের কথা আমরা শুনে থাকবে। যেমন গত কয়েক বছরে আমরা ‘ওয়াবি-সাবি’ নামের জাপানি ধারণার কথা শুনেছি, যেটা শেখায় দৈনন্দিন জীবনের অপূর্ণতাকে মেনে নিতে।
এই তালিকায় নতুন সংযোজন হিসেবে দেখে নিতে পারেন টাকা সঞ্চয়ের জাপানি কৌশল কাকেইবো। টাকা পয়সা সামাল দেওয়া বা গুছিয়ে তুলতে হিমশিম খেলে কাকেইবো আপনাকে সহজ পথ দেখাতে পারে।
.
# কাকেইবো কী?
জাপানি ভাষায় কাকেইবো (Kakeibo) এর অর্থ ‘পরিবারের আর্থিক হিসাব’। এই ধারণাটি তৈরি করেছিলেন জাপানের প্রথম নারী সাংবাদিক হানি মোতোকো, ১৯০৪ সালে। মোতোকোর বানানো এই ধারণাটি পাঠকদের অনেক পছন্দ হয়েছিল। এই পাঠকদের একটা বড় অংশ ছিলেন গৃহিণীরা, পরিবারের বাজেট বানানো যাদের দায়িত্ব ছিল।
লেখক ফুমিকো চিবা ২০১৮ সালে যখন ‘কাকেইবো: দ্য জাপানিজ আর্ট অফ সেভিং মানি’ লেখেন, তখন এই ধারণাটি বাদবাকি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
চিবা ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঞ্চয়ের ব্যাপারে জাপানি সমাজে প্রচলিত প্রথাগত ধ্যানধারণা ও বিশ্বাস তুলে ধরে। জাপানি সমাজে টাকার সাথে উৎসবের বেশ ভাল সম্পর্ক আছে। বাচ্চারা ছুটির উপহার হিসেবে টাকা পায়। পছন্দের জিনিস কেনার জন্য এই টাকা জমিয়ে রাখার শিক্ষা দেওয়া হয় তাদের। ছোটবেলা থেকেই টাকাপয়সাকে গুরুত্ব দিতে শেখে তারা।
বড়দের কাছেও টাকার গুরুত্ব কোনো অংশে কম না। অন্যান্য দেশের তুলনায়, জাপানে নগদ টাকার ব্যবহার বেশি।
কাকেইবো পদ্ধতিতে একটা ডায়েরিতে সব রকমের আয় ও ব্যয়ের হিসাব লিখতে হয়, যাতে করে কোথায় অপ্রয়োজনীয় টাকা খরচ হচ্ছে তা দেখা যায়। বাজেটিং-এর অন্যান্য উপায়ের তুলনায় এই পদ্ধতি অনেকটা অভিনব। এটা আপনাকে টাকা খরচের আগে ভাবতে বাধ্য করে, কেন এই ক্ষেত্রে খরচ করছেন।
এই পদ্ধতিতে সচেতনভাবে খরচের দিকে মনোযোগ দেয়া হয়, ফলে অপ্রয়োজনে খরচের পরিমাণ কমে। এখানে ধীরেসুস্থে নিজের ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র না কিনে পছন্দের ও প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার দিকে গুরুত্ব দেয়া হয় বেশি।
কাকেইবো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা টাকাপয়সার সাথে আপনার সম্পর্ক কী তা ভাবতে উৎসাহ দেয়, কিছু কেনার আগে তা কেন কিনছেন, বুঝতে সাহায্য করে।
তাহলে কাকেইবো কীভাবে কাজ করে?
.
১. একটি হিসাবের খাতা খুলুন
আমাদের হাতের কাছেই কাগজ-কলম থাকে। কাকেইবোর উৎপত্তি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, তাই হাতে লেখাকেই এই পদ্ধতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বুলেট জার্নালেও কাজ হবে, তবে যেকোনো ধরনের খাতা বা ডায়েরি ব্যবহার করলেই চলবে।
.
২. মাসিক আয় হিসাব করুন, পূর্ব নির্ধারিত খরচ বাদ দিন
এই ধাপে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন। পরিবারের হিসাব করার সময় পরিবারের সদস্যদের সাহায্য নিতে পারেন। কারণ অনেককিছুই আমাদের মনে থাকে না, তখন পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য পেলে হিসাব পরিপূর্ণভাবে করা যাবে।
.
৩. প্রতি মাসে সঞ্চয়ের একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
বাসা ভাড়া ও বাজার খরচের পর যে টাকা বাকি থাকবে, তা থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সঞ্চয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।
.
৪. ব্যয়গুলিকে ক্যাটেগরিতে ভাগ করুন
কাকেইবো ৪ ধরনের ব্যয় নির্ধারণ করে:
• প্রয়োজন: এখানে বাড়িভাড়া, বাজার খরচ, যাতায়াতের খরচ বা ঋণের কিস্তির মত বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত।
• চাহিদা: পছন্দের কিছু, যার আসলে তেমন প্রয়োজন নেই তা যাবে এই শ্রেণিতে। যেমন, বাইরে খাওয়া, শখের কাজ, বিনোদন ইত্যাদি।
• সংস্কৃতি: সাংস্কৃতিক কাজে যেকোনো ধরনের ব্যয়, যেমন: বই, জাদুঘর বা কনসার্টের টিকেট, অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস ইত্যাদি এই খাতের অন্তর্ভুক্ত।
• অপ্রত্যাশিত: মেডিকেল বিল বা বাড়ি রিপেয়ারের খরচ ইত্যাদি এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
.
৫. যা কিনছেন সবই আলাদা ক্যাটেগরির অন্তর্ভুক্ত করুন
যখন যা কিনছেন, সবই উপযুক্ত ক্যাটেগরির নিচে লিখে ফেলুন। কত টাকা দিয়ে কিনেছেন তাও লিখুন। অনেকে মনে করেন, বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে সব ধরনের ব্যয় ভাগ করে নেওয়াটা কাকেইবোর সবচেয়ে কার্যকর দিক।
কোনো কিছুকে ক্যাটেগরি অনুযায়ী আলাদা করতে গেলে তা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবতে হয়, যা হয়ত এমনিতে করা হত না। তাছাড়া চাহিদাকে প্রয়োজন থেকে আলাদা করতে অনেকেই হিমশিম খান। কোন ক্যাটেগরিতে টাকা বেশি খরচ হচ্ছে, তা যখন চোখের সামনে দেখতে পাবেন, তখন অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সহজ হয়ে যাবে।
.
৬. প্রতি সপ্তাহে বা মাসে ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিন
প্রতি মাসের শেষে নিজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করুন। মাসের শুরুতে নির্ধারণ করা লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছেন কিনা দেখুন।
এতে করে কোন বিষয়গুলির দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে তা বুঝতে পারবেন। লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলেও চেষ্টা করার জন্য নিজেকে বাহবা দিন। কোন দিকগুলিতে পরিবর্তন আনতে হবে তা বুঝতে নিজেকে এই প্রশ্নগুলি করুন।
• এখন আমার কাছে কত টাকা আছে?
• আমি কত টাকা সঞ্চয় করতে চাই?
• এই মাসে কত টাকা ব্যয় করেছি?
• কীভাবে আরও ভাল করা যায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হয়ত আপনার চোখে ধরা পড়ল, প্রতি মাসে বাইরের খাবারের পেছনে অপ্রয়োজনীয় অনেক টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে!
.
নিজের অগ্রগতি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করলে কোথায় নগদ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে তা সহজেই বুঝতে পারবেন, ফলে কোনো পরিবর্তন আনা দরকার হলে তা করতে পারবেন।
.
শেষ প্রশ্নটি ছিল, “কীভাবে আরও ভাল করা যায়?” এই প্রশ্নটি একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন। নিজের ব্যয়ের অভ্যাস পর্যালোচনা করে এই প্রশ্নটির উত্তর দিন।
আরো ভাল করা বা উন্নতি করার অর্থ এই না যে, ব্যয় কমানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে। বরং পছন্দের জিনিসের পেছনে বেশি টাকা খরচও আরো ভাল করার উদাহরণ হতে পারে। অথবা পছন্দের কিছু কিনতে বেশি সঞ্চয় যদি করেন সেটাও এক ধরনের অগ্রগতি।
একই ভাবে, অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে বেশি টাকা ব্যয় না করাটা আরো ভাল করার উদাহরণ। কিংবা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির প্রস্তুতি হিসেবে কিছু টাকা জমিয়ে রাখাকেও অগ্রগতি হিসাবে দেখতে পারেন।
এই পদ্ধতিতে টাকা কোথায় যাচ্ছে তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। যদি টাকা সঞ্চয় করা আপনার লক্ষ্য হয়, তাহলে বাজেটের কোন খাতগুলির জন্য তা সম্ভব হচ্ছে না তা বুঝতে পারবেন।
তারপর, যা কিছু কিনছেন, সব লিখে রাখুন। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে কষ্টসাধ্য বলে মনে হতে পারে, তবে এই কাজটিকে সহজ করার জন্য নানারকম অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি এক্সেল শিটও ব্যবহার করতে পারেন। প্রতিদিন অন্তত একবার ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে আপনার কাজ একদম সহজ হয়ে যাবে। তাছাড়া সহজেই নিজের ব্যয়ের ধরনও বুঝতে পারবেন।
এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হল সঞ্চয় বাড়ানো। জাপানি কাকেইবোর হিসাবের খাতায় ‘সেভিংস পিগ’ ও ‘এক্সপেন্স উলফ’ এর লড়াই এর চিত্র আছে। নিজের হিসাবের খাতায়ও সৃজনশীল কোনো ছবি এঁকে নিতে পারেন, যা দেখে সঞ্চয়ের আগ্রহ বাড়বে।
২য় পর্ব: https://tinyurl.com/3xnk2phv
কাকেইবো টাকা বাজেট
![]() |
ফেইসবুক থেকে নেওয়া

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন