সঙ্গীতশিল্পী ইমনকে আমি চিনি না। গান শুনেছি। তাঁর গানে তিনি বহুবার আমাদের গর্বিত করেছেন। সম্প্রতি তাঁর কোনো অনুষ্ঠানে ‘বাংলা গান শুনব না’ বলে একজন দর্শক দাবি জানানোর প্রত্যুত্তরে কড়া ভাষায় তিনি দুচার কথা শুনিয়ে দিয়েছেন। বেশ করেছেন।
এই বাংলায় বাংলা ভাষার দুর্দশা চোখে দেখা যায় না। আমাদের ছেলেমেয়েরা বাংলায় কথা বলার চেয়ে হিন্দী বা ইংরেজিতে কথা বলায় স্বচ্ছন্দ শুধু নয় তারা সেটাতে শ্লাঘা বোধ করে। যখন বাংলায় তারকাদের কোনো সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় কতটুকু বাংলা তাঁরা বলেন। নিজের ভাষায় ভালো করে কথা বলতে পারছেন না এ নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত কিংবা লজ্জিত নন তাঁরা, সেটাই তাঁদের কাছে স্বাভাবিক। বাংলা লালু-পাঁচু, সাধারণদের ভাষা। যাঁরা তারকা, যাঁরা অভিজাত তাঁদের বাংলায় বেশি কথা বললে অবনমন হয়! আমার মেডিকেল কলেজের বাঙালী সহপাঠীদের দেখেছি। তারা সবসময় আন্তর্জাতিক! সোস্যাল মিডিয়ায় ভুলেও একবর্ণ বাংলা লেখে না কেউ। আমার ভারি জানতে ইচ্ছে করে এরা ঘুমিয়েও কি ইংরেজি বা হিন্দীতে স্বপ্ন দেখে?
আমি আমার অনেক অবাঙালী রোগীকে দেখেছি হিন্দীতে কথা বলেন। আমি হিন্দী ভালো বুঝি না বলাতে তখন বাংলায় কথা বলেন। অনেকে আবার দশ বছর বাংলায় বসবাস করছেন কিন্তু কাজ চালানোর মত বাংলা শেখার চেষ্টাটুকুও করেন না। অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে কমিউনিকেট করতে হলে আপনাকে হিন্দী বলতেই হবে। এ জিনিষ ভরতবর্ষের অন্য কোনো প্রদেশ কেন পৃথীবীর আর কোথাও কল্পনা করা যায়?
কীভাবে প্রতিদিন আমরা বাংলা ভাষাকে ভুলে যাচ্ছি একটু চোখ মেললেই বোঝা যায়। আরজিকর আন্দোলনে একটা জনপ্রিয় শ্লোগানের শেষটুকু ছিল ‘লজ্জা করো প্রশাসন‘, কিংবা দেখবেন এখন অনেকেই ‘আমাকে ভোট দিন‘-এর বদলে বলে, ‘আমাকে ভোট করুন’! দেখলাম ইউটিউবে এক চ্যানেলের সঞ্চালিকা বলে চলেছেন, ‘প্রমাণ সিবিআই-এর হাতে এসে লেগেছে’। এগুলো আসলে হিন্দীর একেবারে আক্ষরিক অনুবাদ। এটা বেশ চলছে এখন। এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায় যা থেকে বোঝা যায় কীভাবে আমরা বাংলা ভাষার বলাৎকার করছি। আর হিন্দীভাষীরা যেভাবে বাংলা বলেন সেটাকে অনুকরণ করে শ্লাঘা বোধ করছি। বিজ্ঞাপনেও মাঝে মাঝে এরকম ভাষার প্রয়োগ আজকাল তাই চোখে পড়ে। কারণ এটা লোকে নিচ্ছে। নিজের মাতৃভাষাকে এভাবে ধর্ষণ করা যায়? অন্য কোন ভাষাার কেউ করবে?
ইমন আপনি আমাকে গর্বিত করেছেন। আমি টুপি খুলে আপনাকে নমষ্কার করছি। আর প্রশ্ন করছি শাসকপক্ষকে কেন বাংলা একমাত্র রাজ্য যেখানে ইংরেজি বা হিন্দি মাধ্যমের ইস্কুলে বাংলা না শিখে দিব্যি পাশ করে বেরিয়ে যাওয়া যায? কেন বাংলার সব স্কুলে বাংলা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে না? কেন এই বাংলায় সরকারী চাকরীর ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার একটা বাধ্যতামূলক পরীক্ষা থাকবে না? এখানে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে প্রসারিত করার চেষ্টা হবে না কেন? এসব করলেই দেখবেন বাংলা ভাষার মর্যাদা কেমন বেড়ে যাচ্ছে। বাংলা মিডিয়ম স্কুলগুলোর গুরুত্ব কমছে না একটুও। আমরাও বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা বলে ভালোবাসতে, আদর করতে, যত্ন নিতে শিখছি। বাংলা ভাষার জন্য গর্বিত হতে শিখছি।
অন্য কোনো ভাষাকে আমি কিন্তু ছোট করছি না। প্রত্যেকের কাছে তাঁর মাতৃভাষা সমান আদরের। কিন্তু এই বাংলায় বাংলা ভাষার অনাদর, অবহেলা, অপমান সইতে পারিনা।
তারকা, অভিজাত, অতিশিক্ষিত বাঙালীদের বলি বাংলায় কথা বললে, কিংবা বাংলায় সই করলে বা দরখাস্ত লিখলে হীনমন্যতায় ভোগেন বুঝি? ভুগবেন না। কারণ বাংলায় আজন্ম বেড়ে উঠে অন্য ভাষায় কথা বলতে পারা যতটা গৌরবের মাতৃভাষায় কথা কইতে বা লিখতে না জানাটা তার চেয়ে ঢের বেশি লজ্জার!
ইমন আপনি ভালো থাকুন।
__ পল্লব কীর্ত্তনীয়া ওয়াল থেকে
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন