পারিজাত সাহিত্য প্রতিযোগিতা পর্ব ৩৮০
বিভাগ - গল্প
বিষয় - ভয়
গল্প - পুরীতে প্রেতাত্মা
গল্পকার - শিলাবৃষ্টি
তারিখ - ১০/১২/২৪
তখন আমার ক্লাস নাইন। পুরী যাব প্রথম বার, ভীষণ উত্তেজনা। মাসীমণিরাও যাবে। জগন্নাথ এক্সপ্রেসে টিকিট কাটা হয়েছে। কয়েকদিন আগে থেকেই গোছগাছ শুরু করে দিয়েছি। অবশেষে যাওয়ার দিন এসে গেল, আমরা ট্রেনে খুব মজা করতে করতে ভোর বেলায় পুরী পৌঁছে গেলাম। একজন পাণ্ডার সাথে মেসোর আলাপ ছিল, সেই পাণ্ডাই আমাদের স্টেশনে এসে রিসিভ করে নিয়ে গেল! অটোয় উঠে সমুদ্র দেখতে দেখতে আমরা
হোটেলে গেলাম। সমুদ্রের কাছেই আমাদের হোটেল। নাম সোনালী। দোতালায় দুটো বড় বড় রুম আমাদের জন্য খুলে দিল। ঝাঁ চকচকে নতুন হোটেল না হলেও, বেশ আভিজাত্যে মোড়া। আমার তো খুব পছন্দ হয়ে গেল!
ব্যাগপত্র রেখে আমরা সীবিচে চলে গেলাম। কচুরি, ঘুগনী, চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারা হলো। মাসীর মেয়ে ফুচুদি আমার থেকে তিন বছরের বড়ো। ফুচুদি আর আমি সমুদ্র স্নানে নেমে পড়লাম। বাবা মা মাসী মেসো সবাই নামলো। তবে আমার আর ফুচুদির
আনন্দটা যেন সবাইকে ছাপিয়ে গেল।
হোটেলে ফিরে চেঞ্জ করে খেতে গেলাম বিখ্যাত মাসীর হোটেলে। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল, তাই সারা দুপুর ঘুমালাম আমরা। সন্ধের দিকে বীচে গেলাম, একের পর এক এটা ওটা খাওয়া চলতে লাগলো। অবশেষে ডিনার সেরে সোনালী হোটেলে ফিরলাম।
এতক্ষণে আমরা খেয়াল করলাম হোটেলে আমরা ছাড়া আর তেমন কেউ নেই! ফুচুদিই বললো ~" একটা জিনিস নোটিশ করেছ তোমরা? পুরীতে এত ভিড়, অথচ এই হোটেলে আমরা ছাড়া কেউই নেই বোধহয়!"
হ্যাঁ তাইতো সকাল থেকে এতবার বেরোলাম ফিরলাম, তেমন কারো সাথেই দেখা হয়নি! শুধু ম্যানেজার বা হোটেলে কাজ করা দু একটা লোক ছাড়া!
যাইহোক আমরা ফ্রেস হয়ে গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। ফুচুদি আর আমি একটা বেডে, আর মা বাবা আরেকটা বেডে। মাসীমণিরা পাশের রুমে।
গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কে জানে!
ঘুমটা ভেঙে গেল বাবা মায়ের গলার আওয়াজে। মা বলছে " তুমি দরজাটা লক করোনি?"
বাবার উত্তর " কেন করবোনা! দেখো দরজাটা লক আছে এখনো!"
আমি আর ফুচুদিও উঠে বসলাম -
"কি হয়েছে বাপী? "
মা বললো যে মা স্পষ্ট কাউকে রুমের ভেতর চলাফেরা করতে দেখেছে! "কে? কে তুমি?" বলার পরে আর দেখতে পায়নি। বাবারও তখন ঘুম ভেঙে গেছে!
আমি বললাম " দরজাটা খুলে একবার দেখো।! আবার মায়ের মনের ভুলও হতে পারে! " মা এ কথা শুনে খুব রেগে গেল।
বাবা ইতস্তত করছে দেখে আমি আর ফুচুদি রুমের লাইট জ্বেলে দরজা খুলতে এগোলাম। পেছনে বাবা। লম্বা বারান্দার অল্প আলোয় তাকিয়ে দেখলাম আমরা তিনজনেই- টুপি পরা একটা সাহেব গোছের লোক এগিয়ে আসছে পায়ে পায়ে।
কাছাকাছি আসতেই লোডশেডিং হয়ে গেল গেল মানে ঘরের আর বারান্দার আলোগুলো নিভে গেল। কিন্ত সেই সাহেবটার চোখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এক অদ্ভুত রশ্মিতে হালকা আলোয়
ভরে গেল টানা বারান্দাটা। লোকটা বিকট ভাবে হাসতে থাকলো।আর আমরা কাঁপতে থাকলাম। বাবা তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে দিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে ফুচুদি মোবাইলের টর্চ জ্বেলে খাটে গিয়ে বসলো। বাবা আমাকে বললো" এ হোটেলে থাকা যাবেনারে টুলটুল।" আমরা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম। "বেশ কয়েকবছর আগে পেপারে মনে হয় এই সোনালী হোটেলের কথাই পড়েছিলাম! এই হোটেলে নাকি আত্মা ঘুরে বেড়ায়! " শুনে আমরা তো ভয়ে কাঠ। সবাই একটা বেডেই জড়ো হয়ে বসে আছি। এমন সময় কারেণ্ট এলো। মা তাড়াতাড়ি ঘরের বড় আলোগুলো জ্বেলে দিলো। সবাই শুয়ে পড়লাম। বাবা বললো ভোর হলেই হোটেলের খোঁজে বেরোবে। আর কয়েক ঘণ্টা এখানে এভাবেই কাটাতে হবে!
সবাই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে বা তন্দ্রাচ্ছন্ন! আমার চোখে কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছেনা। আবার লোডসেডিং হয়ে গেল! খানিক বাদে দরজার বাইরে পায়ের আওয়াজ আর ফিসফিসানি শুনতে পেলাম। ভয়ে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল, চোখ খুলতে পারছিলাম না। তবু অন্ধকারে সাহস করে চোখটা খুলতেই দেখি ফ্যানের সাথে একটা বডি ঝুলছে! রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে আমার গলা থেকে একটা চিৎকার শুধু প্রতিধ্বনিত হলো..., বাবা গো.....
আর কিছু মনে নেই আমার। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন ভোরের আলো ফুটে গেছে আর আমার চারিদিকে সকলে ভিড় করে আছে।
হোটেল চেঞ্জ করে আমরা আর ওমুখো হইনি। ম্যানেজার বিশ্বাস না করলেও, পরে আলোচনা প্রসঙ্গে অনেকের কাছেই শুনেছিলাম সোনালী হোটেলে অনেক বছর আগে এক সাহেবকে কেউ খুন করে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল ওই ১৬নং রুমেই। তারপর থেকেই মাঝে মাঝে সাহেবের ভুত নাকি ওখানে দেখা যায়! আর বড় একটা কেউ জেনেশুনে ওই হোটেলে ওঠেনা।
এখনো সেই দৃশ্য আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে!!!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন