এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৪

নাইন টেন টাইস্কোপ সুলতানা বিবিয়ানা

 উপেনটি বাইস্কোপ

নাইন টেন টাইস্কোপ

সুলতানা বিবিয়ানা

সাহেব বাবুর বৈঠকখানা।

বাবু বলেছেন যেতে

পান সুপারি খেতে।

পানের ভিতর মৌরি বাটা

ইস্কাপনের ছবি আঁটা। 

আমার নাম যদুমণি 

যেতে হবে অনেকখানি।


- একটি ছড়া, এক টুকরো শৈশব। বাঙালি ছেলেমেয়েদের স্মৃতিতে জায়গা করে নেওয়া এই ছড়া একসময় সবার মুখে মুখে ছিল। খেলার নিয়ম একদম সাদামাটা— দুজনের হাত ‘ভি’-এর মতো খুলে রেখে অন্যরা বৃত্তাকারে ঘুরত। ছড়াটি আবৃত্তি করতে করতে যখন থামা হতো, তখন এক ব্যক্তি ধরা পড়ত ফাঁকে। এই খেলায় শিশুরা যেমন মজা পেত, তেমনি অজান্তেই মুখস্থ করে ফেলত বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের কথা।


ছড়ার মাঝেই উঠে আসে একটি লাইন—“সাহেব বাবুর বৈঠকখানা।” এই বৈঠকখানা ছিল বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসকদের এক বিশেষ সংস্কৃতির কেন্দ্র। ইংরেজ ও পর্তুগিজ সাহেবরা তাঁদের বিশ্রাম ও আনন্দ-উল্লাসের জন্য তৈরি করেছিলেন এই বৈঠকখানাগুলো। তবে এগুলো শুধুই সাহেবদের বৈঠকখানা ছিল না, এখানে ছিল শোষণের এক নির্মম চিত্র। 


“বাবু বলেছেন যেতে, পান সুপারি খেতে।” এই আমন্ত্রণ ছিলো নারীদের প্রতি। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সহজ আমন্ত্রণ মনে হলেও, এই লাইনটি বাংলার মেয়েদের প্রতি সাহেবদের ব্যবহার এবং সামাজিক নিপীড়নের গভীর চিত্রকে ইঙ্গিত করে। ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, সেই সময় বাংলার গ্রামীণ মেয়েরা সাহেবদের লালসার শিকার হতেন। “পান সুপারি খেতে” ডাকা মানে সাহেবদের বৈঠকখানায় ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়া। কখনো গ্রামবাসীদের বাধ্য করা হতো তাঁদের মেয়েদের সমর্পণ করতে। এই কাজ বলপূর্বকও করা হতো। মেয়েদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রিও করা হতো। সাহেবদের এই বৈঠকখানাগুলো যেন বাংলার নারীদের জন্য লাঞ্ছনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।  


“পানের ভিতর মৌরি বাটা, ইস্কাপনের ছবি আঁটা”-এই লাইনটি সাহেবদের বৈঠকখানার বিলাসবহুল পরিবেশের কথা বলে। পান ও মৌরি ছিল তৎকালীন উচ্চশ্রেণির বিলাসিতার প্রতীক। “ইস্কাপনের ছবি” সাহেবদের দ্বারা আনা বিদেশি জিনিসপত্র, যেমন– শিল্পকর্ম বা বৈঠকখানার সজ্জাকে নির্দেশ করে। সহজেই অনুমিত হয় বৈঠকখানা পরিবেশটি সম্পূর্ণরূপে স্থানীয় দেশীয় সংস্কৃতির বাইরে ছিল।


যদুমণি / মণিমালা (যার নাম মণিমালা তারে দেব মুক্তার মালা) - তৎকালীন বাংলার নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে। “যদুমণি” আসলে সেই সব নারী, যাঁরা সাহেবদের বৈঠকখানায় যেতে বাধ্য হতেন। “যেতে হবে অনেকখানি” বলতে বোঝানো হয়েছে নারীদের পাড়ি দিতে হওয়া মানসিক ও সামাজিক দূরত্ব।  


ছড়াটির মূল রূপে “বাইস্কোপ” শব্দটি ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এটি সম্ভবত পরবর্তী সংযোজন, যখন হীরালাল সেনের হাত ধরে বাংলার সংস্কৃতিতে বায়োস্কোপ বা চলমান ছবির আবির্ভাব ঘটে। সেই সময়ের জনপ্রিয় বাইস্কোপ শব্দটি হয়তো ছড়াটির মূল ছন্দে নতুন সংযোজন হিসেবে যোগ হয়। যা ছড়াটিকে আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। তবুও, বাইস্কোপ শব্দের সংযোজন ছড়ার মর্মার্থ বদলাতে পারেনি। বাইস্কোপ এখানে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা বাংলায় আনা বিদেশি সংস্কৃতির প্রতীক। 


“নাইন টেন টাইস্কোপ” ছন্দময় পংক্তিটি ব্রিটিশদের ইংরেজি সংখ্যার প্রতি বাংলার অভ্যস্ততার প্রতিফলন। ঔপনিবেশিক যুগে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রসার এবং বিদেশি শব্দের প্রভাব বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছিল।


সাহেবদের বৈঠকখানার চিত্র, গ্রামীণ মেয়েদের প্রতি অন্যায় আচরণ এবং তাদের রক্ষিতা হয়ে ওঠার কাহিনী যেন ছড়াটির প্রতিটি শব্দে মিশে আছে। শিশুতোষ খেলার এইসব ছড়ায় তৎকালীন সমাজব্যবস্থার নিষ্ঠুরতাকে পরিহাস করে রচিত।  খেলার ছড়া ও অভিনয়ের মাঝে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বারংবার উচ্চারিত হয়েছে নারীদের দীর্ঘ সংগ্রামের চিত্র। পূর্বনারীদের নিপীড়নের কথা মাথায় রেখে নতুন দিনে ঘুরে দাঁড়ানো নারীদের জন্য এসকল ছড়া যেন এক অলিখিত দলিল।  


লেখা ও সংগ্রহ - শ্রাবণী চক্রবর্ত্তী

কোন মন্তব্য নেই:

নড়াইল জেলার  লোহাগড়ার ইতনার পরীর খাটের ইতিহাস ---

 নড়াইল জেলার  লোহাগড়ার ইতনার পরীর খাটের ইতিহাস --- পরীর খাটটি বাংলাদেশের জাদুঘরে দেখে থাকলেও ইতিহাস আমরা অনেকেই জানি না। নাটোরের মহারানী ভব...