ঊষা মঙ্গেশকরঃ
l ভুবনে শুকতারা
----------l-l------------------------------
ঊষা মঙ্গেশকর ভারতীয় সংগীতের সুরের ভুবনে জ্বলজ্বলে অন্যতম এক শুকতারা। বিভিন্ন গানের সুরের সম্মোহনী যাদুতে মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন সারা ভারত জুড়ে। প্লেব্যাক গানে মাতিয়েছেন সিনেমাহলের দর্শক ও শ্রোতাদের। পেয়েছেন প্রচুর পুরস্কার।
তিরিশের দশকের মধ্যভাগ। মুম্বইয়ের এক মধ্যবিত্ত মারাঠি পরিবারে বেড়ে উঠছিল পাঁচ ভাইবোন। পড়াশোনা, খেলা, খুনসুটি সবই আছে; সেইসঙ্গে রয়েছে আরও একটি জিনিস— গান।
সেই সুরেই বাঁধা পড়েছে পাঁচ ভাইবোন। দেখতে দেখতে সঙ্গীতের বিশাল এক বড়ো জগত খুলে গেল তাঁদের সামনে। লতা, আশা, মীনা, ঊষা আর হৃদয়নাথ— মঙ্গেশকর। সবাই যার যার ক্ষেত্রে অনন্য প্রতিভার অধিকারী।
পরিবারের এই পাঁচ রত্ন যেন গোটা ভারতকেই সুরের যাদুতে মাতিয়ে রাখলেন। প্রথম দুজন তো আজ জীবন্ত কিংবদন্তি; তবে দুই দিদির পাশে কখনোই একেবারে ফিকে নন বোন ঊষা মঙ্গেশকরও।
বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছ থেকেই প্রাথমিক সঙ্গীতশিক্ষার শুরুয়াৎ। পরবর্তীকালে দেখেছেন বড়ো দিদিকে মহীরুহ হয়ে উঠতে। এসবের মধ্যে থেকেই নিজের রাস্তাটি খুঁজে বার করে নিয়েছিলেন ঊষাও।
গানই ছিল তাঁর জীবন, তাঁর জীবনের ধ্যান জ্ঞান আর সাধনা। ১৯৫৪ সাল। ভি সান্তারামের পরিচালনায় মুক্তি পেল ‘সুবাহ কা তারা’। ঊষা তখন কুড়ি বছরের ফুটফুটে তরুণী।
দিদি লতা মঙ্গেশকর ততদিনে পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন। পঞ্চাশের দশক থেকেই নিজের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি। আর এমন পটভূমিতে অভিষেক ঘটল তাঁর বোন, ঊষা মঙ্গেশকরেরও।
ভি সান্তারামের সিনেমার হাত ধরেই বলিউডের মাটিতে পা রাখলেন ঊষা মঙ্গেশকরে। প্রথম প্লেব্যাক গানেই দর্শক ও বোদ্ধা মহলে প্রচুর প্রশংসিত ও সমাদৃত হলেন। আর পিছু তাকাতে হয়নি, বাকি রাস্তা কেবল গান আর গান…।
দিদিদের ছায়ায় ঢেকে যাওয়ার ভয় বা শঙ্কা কি ছিল না? হয়তো ভেতরে ভেতরে সামান্য হলেও ঝলক দিয়ে উঠত সেই চিন্তা। কিন্তু গানের দিকেই নিজের সমস্ত চিন্তা ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি।
১৯৫৫ সালে মুক্তি পেল ‘আজাদ’, অভিনয়ে স্বয়ং দিলীপ কুমার। বক্স অফিসে সুপার ডুপার হিট। দর্শক— সবাইকে মাতিয়ে দিল এই সিনেমা। সেইসঙ্গে সাক্ষী থাকল ঊষা মঙ্গেশকরের গানেরও।
দুটো গান গাইলেন এই ছবিতে- ‘আপলাম চাপলাম’ ও ‘বালিয়ে ও বালিয়ে’। দুটো গানে সঙ্গত দিয়েছিলেন দিদি লতাও। সেই গানও রীতিমতো সুপার হিট…।
সত্তরের দশকে এসে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরলেন ঊষা মঙ্গেশকর। ১৯৭৫ সাল। পরিচালক বিজয় শর্মার কাছ থেকে একটি হিন্দি সিনেমায় গান গাওয়ার প্রস্তাব এল। নায়ক-নায়িকাধর্মী নয়; বরং ভক্তিমূলক ছবি।
নাম, ‘জয় সন্তোষী মা’। এই সিনেমার অধিকাংশ গানেই গলা মেলালেন ঊষা মঙ্গেশকর।এবং দেখতে দেখতে এই সিনেমার সবকটি গানই সুপারহিট!
বাজেটের হিসেবে দেখলে খুব ঝাঁ-চকচকে ছবি কখনই বলা যাবে না একে। কিন্তু বক্স অফিসের হিসেব সেই কথা বলে না। সর্বকালের সবচেয়ে হিট সিনেমাগুলির মধ্যে ‘জয় সন্তোষী মা’-কে না রাখলে বোধহয় অন্যায় হবে।
আর এই সিনেমাই প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিল ঊষা মঙ্গেশকরকে। আজও সন্তোষী দেবীর পুজো উপলক্ষে গোটা দেশজুড়ে যে গান চালানো হয়, সেখানে উপস্থিত হয় এই সিনেমার গানগুলিও।
আজও সন্তোষী দেবীর পুজোর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন ঊষা মঙ্গেশকরও। ১৯৭৫-এ গাওয়া সেই সিনেমার গানগুলি আজও সমানভাবে জনপ্রিয় ভক্তদের মধ্যে…
এই সিনেমার দৌলতেই প্রথমবার ফিল্মফেয়ারের জন্য মনোনয়নও পান ঊষা। ১৯৭৫-এর বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সেরা গায়িকার পুরস্কারও পান তিনি।
এরপর কাজও বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে প্রচন্ড ব্যস্ততাও। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, নেপালি— বহু ভাষায় গান গেয়েছেন ঊষা। আজও গেয়ে যাচ্ছেন সমান তালে। ‘
ঊষা মঙ্গেশকর ইনকার’, ‘নসিব’, ‘ডিস্কো ডান্সার’, ‘খুবসুরাত’ একের পর এক ছবির প্লেব্যাক গানে অংশ ছিলেন তিনি। তবে চাকাটি পূর্ণতা পেল গতবছর ২০২০ সালে।
যখন মহারাষ্ট্র সরকার এই বছরের ‘লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার’-এর জন্য মনোনীত হলেন ঊষা মঙ্গেশকর। নিজের দিদি, যাকে দেখে এগিয়ে গেছেন তিনি, তাঁরই নামাঙ্কিত এই পুরস্কার! ঊষা মঙ্গেশকর থামেননি। আজও সুরে, ছন্দে বেঁধে রেখেছেন নিজেকে।
ভারতীয় সংগীতের সুরের ভুবনে জ্বলজ্বলে অন্যতম এক শুকতারা ঊষা মঙ্গেশকরকে গভীর শ্রদ্ধা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন