স্থাবর সম্পত্তির দখল পুনরুদ্ধার সম্পর্কিত মামলার আদ্যোপান্ত
আইনের সাধারন নীতি হলো কোনো সম্পত্তি যিনি দখলে আছেন তিনি ই দখলে থাকবেন। দখল মালিকানার নয়-দশমাংশ বলে অনেকেই মনে করেন। কোনো ব্যক্তি কোনো সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা ক্রয়,দান,বন্ধক,ইজারা বা বিনিময় মূলে হস্তান্তর গ্রহন করলে, দীর্ঘদিন দখল দ্বারা স্বত্ব অর্জন করলে তিনি দখলের অধিকারী ব্যাক্তি। অর্থাৎ স্বত্ববান ব্যাক্তি দখলে থাকবেন, এটাই আইনের সাধারন নিয়ম। তবে এর কিছুটা ব্যাতিক্রম নীতি আছে। সেটা হল স্বত্বহীন ব্যক্তিও তার দখলীয় স্থাবর সম্পত্তির দখলে থাকবেন। অর্থাৎ উত্তম মালিকানা স্বত্বহীন ব্যক্তি শান্তিপূর্নভাবে দখলে থাকলে তাকে গায়ের জোরে বেদখল করা যাবে না। কী একটু খটকা লাগছে? আসুন বেপারটা ক্লিয়ার করা যাক।
কেউ তার দখলীয় সম্পত্তি হতে বেদখল হলে বা দখলচ্যুত হলে তাকে যথাযথ দেওয়ানী আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ অথবা ৯ ধারায় প্রতিকার চাইতে হবে। সহজ কথায় বলতে গেলে স্বত্ববান ব্যক্তি যদি বেদখল হন তবে তাকে ৮ অথবা ৯ ধারায় এবং স্বত্বহীন ব্যক্তি বেদখল হলে তাকে শুধুমাত্র ৯ ধারায় মামলা করতে হবে। এখন আসুন ৮ ধারা এবং ৯ ধারার মামলার বিষয়ে জেনে নিই।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারায় স্বত্ববান বা স্বত্বহীন ব্যক্তি তার সম্মতি ছাড়া, যথাযথ আইনগত পন্থা ব্যতীত তার দখলীয় স্থাবর সম্পত্তি হতে দখলচ্যুত হলে শুধুমাত্র খাস দখল পূনরুদ্ধার এর জন্য মামলা দায়ের করতে পারেন। দখলচ্যুত ব্যক্তি বা তার মাধ্যমে দাবীদার যেকোনো ব্যক্তি অথবা একাধিক ব্যক্তি বেদখল হলে যেকোনো একজন মামলা দায়ের করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে স্বত্বের প্রশ্ন বিবেচিত হবে না। যিনি দখলে আছেন তার পক্ষে স্বত্বের কোনো দলিল না থাকলেও উত্তম স্বত্ববান ব্যক্তিকে মামলা দায়ের করে যথাযথ পন্থায় দখল পূনরূদ্ধার করতে হবে। গায়ের জোরে বেদখল করতে পারবেন না।
আদালতের তদন্তের পরিসরঃ- খুব ই সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আদালত শুধুমাত্র দখল সংক্রান্ত বিষয় বিবেচনা করবেন, মালিকানা ও স্বত্ব সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারেন না। বাদী দখলচ্যুত সম্পত্তির দখল কিভাবে পেয়েছে তা ও অনুসন্ধান করতে পারেন না।
❏ এক্ষেত্রে বিচার্য বিষয়ঃ-
১) দখলচ্যুত বাদী সম্পত্তির দখল ছিল কিনা
২) তাকে জোর পূর্বক সম্পত্তি হতে বেদখল করা হয়েছে কিনা
৩) তার সম্মতি ব্যতিরেকে দখলচ্যুত করা হয়েছে কিনা
৪) যথাযথ আইনগত পদ্ধতি ব্যতীত বেদখল করা হয়েছে কিনা
৫) দখলচ্যুত হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করেছে কিনা
❏ কোর্ট ফিঃ- মামলার সম্পত্তির মূল্যানুপাতে এডভেলোরাম কোর্ট ফি যা আসবে তার অর্ধেক কোর্ট ফি দিতে হবে। (Section 35A & Article 2 of Schedule 1, Court Fees Act)
❏ তামাদির মেয়াদঃ- দখলচ্যুতির তারিখ হতে ৬ মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। (Article 3, Schedule 1, Limitation Act)
❏ সীমাবদ্ধতাঃ- বেদখলকারী বিবাদী সরকার হলে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দখল পূনরুদ্ধার করা যাবে না। (Act viii of 1973)
❏ আপীল-রিভিউ-রিভিশনঃ- ৯ ধারার মামলার ডিক্রী বা আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপীল বা রিভিউ চলবেনা। তবে রিভিশন চলবে। মামলার মূল্য ৫ লক্ষ টাকার কম হলে জেলা জজ আদালতে আর ৫ লক্ষ টাকার বেশি হলে হাইকোর্ট ডিভিশনে রিভিশন দায়ের করতে হবে।
❏ জারী কার্য্যক্রমঃ- মামলায় শুধু ডিক্রী পেলে তো চলবে না। জারী মামলা করে ডিক্রী জারীতে দিয়ে দখল পুনরুদ্ধার করতে হবে। (সিপিসি, আদেশ ২১, নিয়ম ৩৫ মতে)
❏ রেফারেন্সঃ-
(বাদী পক্ষে)
১) যখন কোনো ব্যক্তি স্থাবর সম্পত্তি হতে দখলচ্যুত হয় তখন সে তার দখল উদ্ধারের জন্য মামলা দায়ের করতে পারে এবং এরুপ মামলার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বত্বের প্রশ্ন বিবেচিত হতে পারে না। (16 BLD(AD),277_49 DLR(AD),133_39 DLR(HC),8_18 DLR(HC),691_16 DLR(HC), 599)
২) The Court is quite competent to pass a decree in favor of the plaintiff for recovery of possession of the suit land, notwithstanding any claim of title that may be set up in defense. (20 BLD(AD),183)
৩) When it is proved that the plaintiff was in possession of the suit land wherefrom he has been dispossessed and the suit has been instituted within 6 months of such dispossession, the court is bound to restore the possession in favor of the plaintiff. (13 MLR(AD),69_XI BSCD,128)
(বিবাদী পক্ষে)
১) বিবাদী দখলচ্যুত বাদী বা বাদীর কিছু সহশরীকের কাছ থেকে জমি কিনলে এবং দখলে থাকা অন্যান্য সহশরিককে হটিয়ে ক্রয়কৃত সম্পত্তির দখল নিতে পারেনা, সেক্ষেত্রে তাকে বিভাগের মামলা করতে হবে। (13 MLR(AD), 196 _ XI BSCD, 128)
২) স্বত্ববান বিবাদীর বিরুদ্ধে দখলচ্যুত স্বত্বহীন বাদী ডিক্রী পেলে বিবাদী-দায়িক স্বত্ব ঘোষনার মামলা করে ডিক্রী পেয়ে দখল পূনরূদ্ধার করতে পারে। (40 DLR(AD), 251)
৩) স্বত্ববান মালিক স্বত্ব ঘোষনাপূর্বক খাস দখলের মামলা দায়েরের মাধ্যমে দখল পূনরূদ্ধার করতে পারে।
দখল উদ্ধারের সময় আদালতকে বিরোধীয় ভূমিতে অবস্থিত বসতঘর বা অন্যান্য স্থায়ী কাঠামো ভেঙ্গে ফেলার বা অপসারন করার আদেশ প্রদানের ক্ষমতা দেয় না যেহেতু স্বত্বের বিচার হয় না। (39 DLR, 8 _ 50 DLR, 271)
No injunction can be granted on the plea of title to restrain the execution proceeding.
(40 DLR(AD), 251) সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৮ ধারায় দখলচ্যুত স্বত্ববান ব্যক্তিকে স্বত্ব সাব্যস্তপূর্বক খাস দখল পূনরূদ্ধারের জন্য মামলা দায়ের করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে তাকে তার স্বত্ব বা মালিকানা প্রমান করতে হবে।
❏ তামাদির মেয়াদঃ- যে দিন থেকে বিবাদীর দখল বাদীর বিরুদ্ধে প্রতিকূল হিসেবে গণ্য হবে সেদিন থেকে বা বেদখল হওয়ার তারিখ থেকে ১২ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে। (Article 144, Limitation Act)
❏ কোর্ট ফিঃ- মামলার সম্পত্তির মূল্যের উপর এডভেলরাম কোর্ট ফি দিতে হবে।
❏ আপীল-রিভিউ-রিভিশনঃ- সব করা চলবে, সিপিসি অনুসারে।
❏ সীমাবদ্ধতাঃ- নেই। সরকারের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা যাবে।
জারী কার্য্যক্রমঃ- সিপিসি, আদেশ ২১, নিয়ম ৩৫ মতে জারী মামলা করে দখল লাভ করতে হবে।
❏ পাদটীকাঃ-
Practically আদালতে স্বত্বসাব্যস্তে খাস দখল পূনরূদ্ধারের মামলা ই বেশি করতে দেখা যায়। এক্ষেত্রে সুবিধা হল এই মামলার তামাদির মেয়াদ ১২ বছর। অর্থাৎ মামলা করার জন্য ১২ বছর সময় পাওয়া যায়। তাছাড়া এতে স্বত্বের প্রশ্ন নির্ধারিত হয় বলে এটি একটি স্থায়ী ব্যবস্থা। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে ৯ ধারার বিধান কেন? আসলে ৯ ধারার কার্য্যধারা একটি সংক্ষিপ্ত ব্যবস্থা। কেউ বেদখল হলে তাকে দ্রুত তার পূর্বাবস্থায়, দখলে স্থাপনের জন্যই এই ব্যবস্থা। এতে এডভেলরাম কোর্ট ফি দিতে হয় কম অর্থাৎ অর্ধেক। আপীল-রিভিউ এর বেবস্থা নেই বলে এবং মূল মামলায় স্বত্বের প্রশ্ন বিবেচিত হয় না বলে দ্রুত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই ধারার মামলা খুব একটা হতে দেখা যায় না। ঊল্লেখ্য, বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে আইনগত পন্থা ছাড়া দখল বঞ্চিত করলে যে সকল ব্যক্তি Tenant বা বর্গাদারের মাধ্যমে দখল দাবী করে তারাও এই ধারা অনুসারে মামলা দায়ের করতে পারে। (21 DLR, 929 _ AIR 1954 Bom., 358). অর্থাৎ ভাড়াটিয়া কর্তৃক ৯ ধারার মামলা হতে পারে। তাতে কী? বাড়ীওয়ালা তখন ৮ ধারার মামলা করতে পারবে। বাধা নেই। তবে বাড়ীওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন রয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন