প্রবীর মিত্র স্মরণে: ঋত্বিক ঘটকের 'তিতাস একটি নদীর নাম' ( ১৯৭৩) 🖼️
ঋত্বিক চাইছিলেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ নিয়ে ছবি করতে বাংলাদেশে এসে। চিত্রনাট্যও তৈরি ছিল। সে সময়ের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান খান যিনি ঋত্বিকের অনুগত একজন অনুরাগী, তিনিও চাইছিলেন তাঁর প্রযোজনায় ঋত্বিক বাংলাদেশে একটি ছবি করুন। তাঁর একটাই শর্ত, ছবির সকল অভিনয় শিল্পী ও কলাকুশলী হবেন বাংলাদেশের। ঋত্বিক সে শর্ত মেনে ঢাকা আসেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ করার পরিকল্পনা নিয়ে। পরে ঘটনাচক্রে তাঁর হাতে পরে অদ্বৈত মল্লবর্মনের ২৯৫৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাদ ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। উপন্যাসটি তাঁকে এতটাই অভিভূত করে, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিকল্পনা পরিবর্তন করে রাতারাতি তিতাসের চিত্রনাট্য রচনা করে ফেলেন। ঋত্বিকের কথায়, ‘পদ্মা ছেড়ে আমি তিতাসে চলে গেলাম’। তিতাস একটি নদীর নাম তৈরি হয় ১৯৭২ এর মার্চ থেকে ১৯৭৩ এর জুন পর্যন্ত সময়ে। ছবিটি বাংলাদেশে মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই এবং কলকাতায় মুক্তি পায় ১৯৯১ সালের ১১ মে তারিখে।
সিনেমাটি নদী তীরবাসী কিছু মানুষের সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতনের রূপময় আলেখ্য। তিতাসের ওপর নির্ভরশীল মালো সমাজের সমস্ত দ্বন্দ্বের রূপায়ণ। সিনেমাটির নিয়ন্ত্রণী শক্তি রক্ত-মাংসের চরিত্রের মতো পরিবর্তিত হয়, কখনো প্রাণদাত্রী কলস্বিনী, সংবরিত স্রোত-উদাসিনী। এই নদীর ওপর মালো সমাজের জীবন-মরণ বাঁধা ছিল। ফলে নদী যখন শুকিয়ে গেল, তখন মালোদের যৌথ জীবনও ভেঙে গেল। অবশ্য সিনেমাটি শেষ হয়েছে নতুন জীবনের ইঙ্গিত দিয়ে।
তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রটি বহুবিধ অর্থজ্ঞাপক বিশাল পরিসরে নির্মিত। উপন্যাসের ব্যপকতা পুরো এক সিনেমায় ধারণ করা সম্ভব না হলেও ঋত্বিক তার কাজের নিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন। ঋত্বিক নৃতাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সভ্যতার বিবর্তনের সমাজপাঠ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এ চলচ্চিত্রকে। একটি সমাজে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালিয়ে সাম্রাজ্যবাদ কায়েমের যে বিশ্বজনীন অশুভ তৎপরতা, তা একটি ছোট্ট কৌমের ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক এবং চলচ্চিত্রকার দুজনেই যুগপৎ তুলে ধরেছেন।
এই সিনেমা তৈরিতে খরচ হয়েছে তখনকার সময়ের ৮ লাখ টাকার কিছু বেশি। তবে তখন বাংলাদেশে একটি সিনেমা তৈরিতে খরচ হতো এক বা সোয়া লাখ টাকায়। পরবর্তীতে সিনেমাটি কাল্ট ক্লাসিকের মর্যাদা পায়।
এতে অভিনয় করেছেন- কবরী, প্রবীর মিত্র, রোজী সামাদ, খলিল, আবুল খায়ের, গোলাম মুস্তাফা, ঋত্বিক ঘটকসহ অসংখ্য কিংবদন্তী অভিনেতা ও অভিনেত্রী। রাজার ঝি চরিত্রে কবরীর অভিনয় বহুল প্রশংসিত হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন