🌹কিংবদন্তি সুরকার ও সংগীত শিল্পী শ্যামল মিত্রের জন্মদিনে তাঁকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই 🙏🌹🙏🌹 (১৪ জানুয়ারি ১৯২৯)
♦️ইংরেজিতে যাকে বলে “লাভার বয় সং তা বাংলায় যদি কেউ কখনও গেয়ে
থাকে তবে সেই শিল্পীটি শ্যামল মিত্র। 'লাভ সং" বা প্রেমের গানের সঙ্গে লাভার বয় সং-এর চমৎকার দুরত্ব আছে এবং দুটিকে কোনো মতে গুলিয়ে ফেলা যায় না।
ন্যাট কিং কোল, ফ্ল্যাঙ্ক সিনট্রা বা জিম রিভজ যা গাইতেন তাকে লাভ সং বলা হয়, কিন্তু ক্লিফ রিচার্ড, প্যাট বুন, এঙ্গেলবার্ট হাম্পারডিষ্ক বা কেরিয়ারের একেবারে প্রথম দিকে, 'লাভিং ইউ' পর্যাযের এলভিস প্রেসলি?
উচ্ছল প্রথম যৌবন, খেয়ালখুশিতে ভরা, উষ্ণ প্রেমের মিঠে-নোনতা ওই গান কখনও প্রিয়ার কণ্ঠ জড়িয়ে গাওয়া হয়, কখনও প্রিয়াকে বিব্রত, রক্তিমাভা করার জন্য দুনিয়াকে শুনিয়ে ।
হিন্দিতে এরকম কিছু গান গেয়েছিলেন কিশোরকুমার, আরে “ও! ও!
বার্নাডিন” জাতীয় গানের নকলে হেমন্তকুমার।
কিন্তু বাংলা গানে এই চলনের একমাত্র ধারক ও বাহক ছিলেন শ্যামল মিত্র।
➤রূপকথা
শ্যামলের আরও বড়ো কৃতিত্ব যে কিশোর বা হেমস্তরমতো বিদেশি ছাদে এই গান তাঁকে গাইতে হয়নি, বাংলা ভাষার জন্য লাভ বয় সং তিনি নিজেই উদ্ভাবন করেছিলেন।
বাংলা ছায়াছবিতে প্রেমের গানে
ক্ষেত্রে যে-চাহিদা ও মর্যাদা ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ঠিক সেই চাহিদা ও মর্যাদা ওই বিশেষ ধরনের প্রেমের গানে তৈরি করে নিয়েছিলেন শ্যামল মিত্র।
➤রূপকথা
কিন্তু এটাই তাঁর একমাত্র গুরুত্ব ছিল না।
১৯৫৬-৫৭ থেকে ১৯৬৪-৬৫ অবধি নন-ফিল্মিক বাংলা গানে শ্যামল
মিত্রর জনপ্রিয়তা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের
সমতুল্য ছিল।
➤রূপকথা
সেই সময়ে অত্যন্ত ভালো গাওয়া ছাড়া হেমন্তবাবুর একটা বাড়তি গ্ল্যামার ছিল বোম্বাই ফিল্মের সঙ্গে সংযোগ, যা শ্যামল মিত্রর ছিল না। অথচ “সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা”
“সারা বেলা আজি কে ডাকে', "গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে ভেবেছিল একটি
পাখি”, “আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে” “কার মনদ্রির বাজে রিনি ঝিনি
ঝিনি', তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর”, “দোলে দোদুল দোলে
দোলনায়” “ডেকো না মোরে, ডেকো না গো আর" ইত্যাদি অসংখ্য ফিল্ম ও বেসিক রেকর্ডের গান যে কী ভীষণ জনপ্রিয় ছিল এক সময় তা বলে বোঝানো অসম্ভব।
➤রূপকথা
পঞ্চাশের দশকে যখন শ্যামল জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখন
জলসা আলো করার মতো এক অসাধারণ রম্য, রোমান্টিক চেহারাও ছিল ওর। টিকলো নাক, কোঁকড়া চুল, আয়ত ভাসা-ভাসা চোখ ও আকর্ষণীয়
মাজা গায়ের রঙের সঙ্গে ওঁর ব্যক্তিগত সম্মোহন কাজ করত একটা গম্ভীর
আনুনাসিক কণ্ঠধ্বনিতে। যে-ধবনি তাঁর গানেরও মহৎ সম্পদ ছিল। শুনলেই
মনে হত ভদ্রলোক বোধহয় নস্যি নেন। তা তিনি নিতেন কি নিতেন না জানা
না থাকলেও এইটুকু সারাক্ষণ টের পেতাম যে ওঁর ওই নেজাল টোনে জাদু
আছে। আমাদের পুরোনো ক্রিক রো পাড়ায় ভানু বোসের বিখ্যাত জলসায়
শ্যামল ছিলেন স্টার আ্যট্রাকশন নাম্বার ওয়ান। অত্যত্ত রক্ষণশীল বাড়ির
সুন্দরী মেয়েরাও সারারাত শাল মুড়ি দিয়ে জলসা শুনত শ্যামলকে শুনবে ও
দেখবে বলে। তাঁর কালো হিন্দুস্থান ফোর্টিনটা পারতপক্ষে ঘেরাও হয়ে যেত ফ্যানদের দ্বারা। আমি নিজেও একবার, মনে আছে, হ্যারিসন রোডের এক প্যান্ট পরা বয়সে নির্নিমেষ দাঁড়িয়েছিলাম বহুক্ষণ। কিছুমাত্র অত্যুক্তি না করে আজ বলতে পারি (এবং বিন্দুমাত্র ন্যাকামির প্রশ্রয় না দিয়েই) যে, শ্যামল মিত্রর মধ্যে কোথায় যেন একটা কৃষ্ণ-কৃষ্ণ ব্যাপার ছিল যা ঠিক সেইভাবে স্বয়ং উত্তমকুমারের মধ্যেও ছিল কি না সন্দেহ। ষাটের দশকের এক সময় একটা মোটর গাড়ির অ্যাক্সিডেন্টের পর ওঁর শরীর বেশ ভেঙে যায়। এরপর পূর্বের সেই সুন্দর চেহারা পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি নিজেও যে বিশেষ চেষ্টা
করেননি তার জন্য ওর অগণিত নারী ও পুরুষ ভক্তের মতো আমারও কিছু অনুযোগ থেকে গেছে।
➤রূপকথা
আসলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো শ্যামল মিত্রর বিপুল সাফল্যের সেতু ওর সহজ ও সরল অ্যাপ্রোচ। সুর নিয়ে অনাবশ্যক প্যাচ পয়জারে বিশ্বাস ছিল না শ্যামলের, তিনি ওর রোমান্টিক কণ্ঠের রোমান্টিকতা যতখানি সম্ভব বাঁচিয়ে রেখে আলতো করে সুর দিয়ে বাণীকে স্পর্শ করতেন। কিন্তু ওঁর গলা ছিল খোলা, যেটা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও উল্লেখ করেছেন, এবং ক্লিফ রিচার্ড, টোনি ব্রেন্ট জাতীয় লাভার বয় সং-স্টারদের মতো তিনি ক্রুনিং বা শিল্পিত চাপা ধ্বনির চর্চা করতেন না। সুরের ধ্বনির রেশ অনেকক্ষণ ধরে রাখতে পারতেন যদিও তা অনুপ জালোটার মতো কালোয়াতি ঢঙে করতেন না।
গানের প্রথম স্বর থেকে শেষ স্বর অবধি শ্যামল থাকতেন আপসহীনভাবে রোমান্টিক।
ওঁর গলার খাদের আওয়াজটা ছিল চমৎকার, ওপরের সপ্তকে প্রবেশ ঘটত আনুনাসিক ধ্বনির এবং দুইয়ে মিলে '“প্যাথস" বা বিষাদ সৃষ্টির সুন্দর ব্যবস্থা হত। প্রেমিকের গানকে এত সরল ভাবে তিনি বরাবর গেয়ে গেছেন যে আজ তাঁর চলে যাওয়াকে এক প্রেমিকের প্রস্থান বলে মনে হচ্ছে। ➤রূপকথা
জীবন ও গান উভয় ক্ষেত্রেই শ্যামল ছিলেন প্রেমিক। রবীন্দ্রসংগীতও
এত দরদ দিয়ে গাইতেন যে ঠিক সেই মুহূর্তে ভাবা যেত না যে তিনি প্রধানত
একজন আধুনিক গাইয়ে। আর আধুনিক গাইয়ে বলে যে তাঁর গানের তালিম
কিছু কম ছিল তাও মোটেই নয়। ছিল যে না, তার প্রমাণ ওর তৈরি বহু
গানের সুর এবং গাওয়া বেশ কিছু গান। “অমানুষ” ছবিতে কিশোরকুমারের
গলায় যে একটি গান তিনি দুর্মূল্য সাফল্যে বসিয়েছিলেন—'কী আশায় বাঁধি
খেলাঘর'—তা সর্বকালের একটি শ্রেষ্ঠ বাংলা আধুনিক গান হিসেবে স্বীকৃত
হবে। শ্যামল সরল, রসালো, মন ভরানো সুর সেসব। তবে আপাতদৃষ্টে যত
সরল তত সরল আদৌ নয়। সেসব সুর তালিমের ফসলও নয়, এক চমৎকার
ব্যক্তিত্বের আন্তরিকতার ফসল।
➤রূপকথা
বহু সার্থক শিল্পী আছেন যাঁরা শিল্পী না হলেও সুরকার, গীতিকার, সমালোচক, রসজ্ঞ, এমনকি ডাক্তার-বৈদ্য, ইঞ্জিনিয়র
হতে পারতেন। কিন্তু শ্যামল মিত্রর পথ মনে হয় ছিল দুটো—রোমান্টিক
গায়ক কিংবা রোমান্টিক নায়ক। তিনি একই সঙ্গে দুটোই হতে চেয়েছিলেন।
➤রূপকথা
প্লেবয় ইমেজের ছবিতে উত্তমকুমার শ্যামল মিত্রকে কণ্ঠ হিসেবে নিয়ে দারুণ
ফল পেয়েছিলেন। হালকা মিষ্টি ছবির ক্ষেত্রে “দেয়া-নেযা” একটি ক্লাসিক।
কিন্তু উত্তমকুমারই শ্যামলের একমাত্র ঠোঁট নন। পঞ্চাশের দশকের শেষাংশ
ও ষাটের দশকের একটা বড়ো অংশ জুড়ে গোটা বাঙালি যুব সম্প্রদায়ই ছিল
শ্যামলের “লিপ” । শ্যামলের গান গেয়ে মেয়েদের মন জয় করা খুব সহজ ও
করণীয় কাজ ছিল তখন। পরে বাংলা আধুনিকের অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে
আরও অনেকের মতো শ্যামলের যুগও শেষ হয়ে যায়। ফের এতদিন পর
যখন সেই পুরানো গানের নতুন জোয়ার এল, ঠিক তখনই প্রেমিকের
অভিমান নিয়ে এক ও অদ্ধিতীয় শ্যামল মিত্র চলে গেলেন। মৃত্যুর দিন কুড়ি
আগে গলফ গ্রিনে এক জলসায় যখন বসলেন তাঁর ভাঙা শরীর দেখে আমার
চোখে জল আসছিল। যখন পূর্বের সেসব গান গাইছেন আমি মনে মনে তখন
একটা দশ বছরের বালক হয়ে গেছি আর শুনছি এমন এক লোকের গান যার
বুকপকেট থেকে ফাউন্টেন পেন পড়ে গেলে অন্তত তিরিশটি বালিকা, যুবতী, মহিলা গিয়ে তা তুলে দেবে তার হাতে।
— লেখক শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
@রূপকথা @রূপকথা
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন