খুব রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। কিন্তু বিয়ে করেছিলেন পালিয়ে। বয়স তখন মাত্র সতেরো। কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। মেয়ের দুঃসাহস বাবা মানলেন না। বাড়ি থেকে একপ্রকার বের করে দিলেন। সদ্যবিবাহিত দুই তরুণ তরুণী উঠলেন নাজিরবাগানে একটা এক কামরার ঘরে। শুরু হল দারিদ্রের সাথে লড়াই।
একটা অদ্ভুত স্বভাব ছিল তাঁর। বিয়ের পর থেকেই কিছু বান্ধবীর সাথে গিয়ে প্রত্যেক দিন শ্মশানে বসে থাকতেন। জীবন মৃত্যুকে দেখতেন কাছ থেকে। কিছুদিনের মধ্যেই কেমিস্ট্রি নিয়ে লেডি ব্রেবোর্ন ভর্তি হলেন। কিন্তু মাতৃত্ব সামলাতে গিয়ে কলেজ ছাড়তে হল। পরে যোগমায়া দেবী কলেজে ভর্তি হলেন বাংলা নিয়ে। ১৯৭৯ সালে উত্তীর্ণ হলেন ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায়। যোগ দেন ‘ওজন ও পরিমাপ’ দপ্তরে। লেখালিখির শখ তাঁর ছোট থেকেই। ইউনাইটেড মিশনারি গার্লস হাইস্কুলের স্কুল ম্যাগাজিনে বেরোয় তাঁর প্রথম লেখা। ছড়া, ‘চড়ুই’। তার দু’টো লাইন...‘‘কিচিরমিচির তোমার ডাকে মুগ্ধ হয়ে থাকি,/বড় ভাল লাগে আমার তোমাদের এই দল।’’
সাহিত্যিক বিমল কর এক বার ‘গল্পপত্র’ পত্রিকায় তাঁর লেখা দেখে বলেছিলেন, ‘‘তোমার কলমের জোর আছে। নিজের চেনা জগৎটা নিয়ে লেখো।" তিনি পরে বলেছিলেন ওটাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল | জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখতেন। চাকরি সূত্রে পরিচয় হয়েছিল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, চিনা, তিব্বতী মেয়েদের সঙ্গে। কাছ থেকে দেখেছিলেন তাদের জীবনযুদ্ধের গল্প। সেই অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছিলেন ‘আমি রাইকিশোরী’। তাঁর প্রত্যেকটা লেখার মধ্যে জড়িয়ে আছে বাস্তবের কোন অভিজ্ঞতা।
সাহিত্যের বাইরেও একটা জগত ছিল তাঁর। ভালোবাসতেন গীতা দত্তের গান। গন্ধরাজ, জুঁই ফুল। আর সমুদ্র। রান্নার হাতটিও ছিল চমৎকার। মটন, চিংড়ি, বিরিয়ানি, রাবড়ি, চাইনিজ সব রান্নাতেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। অভিনয়ও করতেন। গীতা দে'র পরিচালনায় অভিনয় করেছিলেন শাহজাহান নাটকে - পেয়ারি বাঈয়ের চরিত্রে। এর পর থেকে গীতা দে বলতেন, ‘‘ও আমার ছাত্রী।’’
লিখেছিলেন ২৪ টি উপন্যাস ও দুশোর উপর ছোটগল্প। গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘কাছের মানুষ’, ‘দহন’, ‘হেমন্তের পাখি’, ‘নীলঘূর্ণি’, ‘অলীক সুখ’, ‘ভাঙনকালে’, ‘তিনকন্যা’, ‘এখন হৃদয়’, ‘অন্য বসন্ত’, ‘ভালো মেয়ে খারাপ মেয়ে’, ‘পালাবার পথ নেই’, ‘অচিন পাখি’, ‘জোনাথনের বাড়ির ভূত’, ‘মেঘ পাহাড়’, ‘প্রেম-অপ্রেম’, ‘অর্ধেক আকাশ’, ‘গভীর অসুখ’, ‘চার দেয়াল’, ‘১০১ প্রেমের গল্প’, ‘কেরালায় কিস্তিমাত’, ‘পরবাস’, ‘ঝাও ঝিয়েন হত্যারহস্য’, ‘জলছবি’, ‘আয়নামহল’, ‘একা’, ‘শেষবেলায়’। মিতিনমাসি তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দাচরিত্র। একসময় লেখালিখির জন্যে নিজের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে তাঁর লেখা।
২০১৫ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৫ বছর বয়সে ঢাকুরিয়ার বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।
আজ জন্মদিনে সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্যকে জানাই শ্রদ্ধা।
![]() |

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন