বাংলাদেশ টেলিভিশনে গেলাম চেক আনতে। অনেকদিন আগে একটা নাটক লিখেছিলাম ওটার সম্মানী। ১১ জুলাই ১৯৮১'র ঝিনুক নীরবে সহো - লিখে পেয়েছিলাম ছয়শ টাকা। অতো টাকা খরচ করবো কিভাবে মাথা নষ্ট! তখন রাজশাহী থেকে ঢাকার বাসভাড়া ছিল ১৭ টাকা। আমি তখন জানতাম না নাটক লিখলে টাকা পাওয়া যায়। আমাকে কন্ট্রাক্ট সই করার জন্য ডেকেছিলেন প্রযোজক জিয়া আনসারী। মা পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ঢাকা পাঠালেন। কিন্তু জিয়া আনসারী আমাকে দেখে মহাবিরক্ত, কেন উনি নিজে আসতে পারলেন না! আমরাতো ওনাকে আসা-যাওয়ার খরচও দিতাম। আর তুমি কিনা তাঁর হয়ে কন্ট্রাক্ট করবে! কই অথারাইজেশন কোথায়?
আমি তাঁর কথা বুঝতে পারি না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি।
ঘোড়ার মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন,অথারাইজেশন বের করো, উনি ধমকান।
আমার অবস্থা দেখে সহকারি প্রযোজক নূর হোসেন দিলুর মায়া হয়। তিনি বলেন, আখতার ফেরদৌস রানার চিঠি এনেছ?
ভাই, আমিই তো আখতার ফেরদৌস রানা।
এ্যাঁ, চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়েন জিয়া আনসারী, আপনি আখতার ফেরদৌস রানা?
জি ভাই।
বয়স কত?
বলি।
জিয়া ভাই আর দিলু ভাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন।
প্রবেশ করেন মনোজ সেন গুপ্ত, তিনিও সহকারী প্রযোজক।
এই মনোজ দ্যাখ তুই কার পান্ডুলিপি আমাকে গছিয়েছিস! তুই বললি ওটা ইউনিভার্সিটির প্রফেসরের লেখা...
সেই জন্যই ওটা সেই রকম স্ক্রিপ্ট স্যার, দুর্দান্ত ছিল,না? ডাকে যতগুলো পান্ডুলিপি এসেছে ওটাই সেরা মনোনীত হয়েছে কী সাধে - মনোজ বলেন।
এই নে তোর আখতার ফেরদৌস রানা!
আমাকে দেখান জিয়া আনসারী। ভিরমি খান মনোজ। দিলুভাইয়ের মাথায় হাত।
আপনি কি ছাত্র, মনোজ প্রশ্ন করেন।
ইউনিভার্সিটি প্যাডে লিখেছিলেন কেন? আমরা তাই মনে করেছি আপনি শিক্ষক, দিলু ভাই বলেন।
অফসেট কাগজতো বাজারে পাওয়া যায় না, তাই একজন স্যারের কাছ থেকে প্যাড চেয়ে নিয়ে লিখেছি, যেন সুন্দর হয়।
এখন যান জিএম'কে গিয়ে বোঝান আপনি সেই মদ্দ...
জিয়া ভাই ওনার কী দোষ, মনোজ প্রতিবাদ করেন।
তাহলে তুই ওরে জিএম এর সামনে নিয়ে যা, গিয়ে বল সে প্রফেসর না স্টুডেন্ট। আমার সম্পর্কে কামাল ভাইয়ের ধারণা কী জানিস না?
খুব খারাপ!
এখন নাক টিপলে যার দুধ বাইর হয়- তারে সামনে নিয়া ক্যামনে কই সে-ই ঐ রানা...
স্যারের কাছে আমি নিয়া যামু?
তোরা দুই হারামজাদাই আমার চোখের সামবে থেকে দূর হ!
দিলু ভাই আর মনোজ কেটে পড়ে।
এখন তো কেউ নাই সত্যি সত্যি বলেন তো ঐটা কি আপনার লেখা?
জি ভাই আমার লেখা...
কিরা কাটো!
আল্লাহর কসম
তুই এই বয়সে এতো ভারি জিনিস ক্যামনে লিখলি... শোন আমি অক্ষন তোরে জিএম এর সামনে নিমু। আমারে যেমনে যেমনে যা যা কইলি তাই তাই কইবি...
জি
যদি উল্টাপাল্টা কিছু কস আমার পি-তে বি! পি-তে বি মানে জানস?
পোঁদে বাঁশ ভাই...
হা হা হা...
তিনি তাঁর ভয় তাড়াবার জন্য অট্টহাসি দেন। তারপর আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলেন জি এম এর রুমে...
আমি জিয়া ভাইয়ের সে-ই দরজার সামনে আজ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। চল্লিশ বছর আগে দাঁড়ালে তাঁর প্রাণখোলা হাসির অর্ধেকটা শুনতে পেতাম। বন্ধ দরজার জন্য।
তারপর যেন শুনতে পাই আলীমুজ্জামান দিলু ভাই ডাকছেন, অ্যাই রানা স্ক্রিপ্ট কবে দিবি?
রিয়াজ উদ্দিন বাদশা আমাকে দেখে ছুটে আসছেন।
হাবীব আহসান এসে হাত বগলদাবা করে আঁতেলের মতো বললেন,অতিরিক্ত মানুষ মানে এক ধরণের অপচয় রানা!
কিংবা আতিকুল হক চৌধুরী দূর থেকে মনে হয় আমার ঘামের গন্ধ পাচ্ছেন বলে নাকে রুমাল নিচ্ছেন।
খ. ম হারূন এসে বললেন,আপনার আক্কেল এতো কম কেন? কার্ফুর মধ্যে আপনি কেন বাড়িতে এলেন স্ক্রিপ্ট দিতে! শোনেননি শ্যুট এ্যাট সাইট চলছে...
ভাই আমি তো আপনার মতো সুন্দর মানে ফর্সা না, কালো বলে আর্মি আমাকে দেখতেই পাবে না।
উনি রাগে উল্টোদিকে হাঁটা দিলেন।
মোস্তফা কামাল সৈয়দ এসে বললেন, ফেরা ধারাবাহিকের প্রধান চরিত্রে কে?
কেশব চট্টোপাধ্যায়।
তিনি কী করবেন?
পন্ডিতমশায়।
কামাল ভাই নাক ডললেন। তাঁর ভয়, উল্টোপাল্টা কিছু যদি লেখি। তখন কলকাতার নাটকে মসুলমান মানে আবদুল। আর আবদুুল মানে চাকর। আমি আবার তেমন কিছু করি কি-না!
মোস্তাফিজুর রহমান কাছে এসে চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললেন, রানা খুব ভালো লেখে তোমার চিন্তা নেই কামাল!
আবদুল্লাহ আল মামুন এলেন। শুধু দাঁড়ালেন। আমাকে দেখলেন। ঠোঁট টিপে হাসলেন। গালে টোল পড়লো!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন