|| লজিক্যাল ফ্যালাসি ||
আপনি যখন কারোর সাথে বিজ্ঞান বা সমসাময়িক কোনো বিষয়ে তর্ক করছেন৷ তখন তর্কের ভেতর আপনি যেসব যুক্তি দিচ্ছেন, তাতে স্বচ্ছতা থাকা জরুরী। এতে করে আলোচনাটার মাধ্যমে কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে কিংবা আপনার তর্কে জিততে পারাটা সহজ হবে৷
অনেকেই আছে যে তর্কের ভেতর যুক্তির অপপ্রয়োগ বা Fault reasoning করে। কোনো দাবিকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য অসঙ্গত বা অপ্রাসঙ্গিক যুক্তি ব্যবহার করা করে। এটাই Logical fallacy বা কুযুক্তি।
আজকের লেখায় ওসব কুযুক্তি নিয়েই আলোচনা করব।
১. Ad Hominem
এক কথায় বললে ব্যক্তিগত আক্রমণ। যুক্তি প্রমাণের জোর না থাকলে অনেকেই গা|লি দেয় , কটুক্তি করে কিংবা খোঁচা মারে । এটাই Ad hominem fallacy।
উদাহরণ ১ : সে যেই নতুন আইনটির প্রস্তাব করলো, সেটা হাস্যকর৷ কারন সে নিজেই একটা গ|দর্ভ।
উদাহরণ ২: তোমার যুক্তি ভুল, কারণ তুমি নিজেই জীবনে কোনো সফলতা অর্জন করতে পারোনি।
[ এখানে ব্যক্তিকে আক্রমণ করে মূল প্রসঙ্গটিকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে । ]
২. Straw Man
এই কুযুক্তিটা হয় , যখন মূল প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গিয়ে সেই প্রসঙ্গের সাথে অনেকটা সাথে মিল রেখে ভিন্ন প্রসঙ্গ টানা হয়। মূল বক্তব্যকে বিকৃত করে আরেকভাবে উপস্থাপন করা হয় , এতে করে যুক্তিতে বিরোধী পক্ষ নিজের মতন করে জিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
উদাহরণ ১: সে বলছে, আমাদের পরিবেশ রক্ষা করা উচিত। মানে সে মনে করে মানুষকে শিল্পায়নের থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।"
উদাহরণ ২: যে ব্যক্তি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পক্ষে, তার মতে - আমাদের সবাইকে পুরোপুরি নিরামিষ ভোজী হতে হবে।
৩. Appeal to Ignorance
এই কুযুক্তিটির দুটি অংশ। যথা - একটা বিষয় সত্য, কারন সেটা কেউ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেনি। একটা বিষয় মিথ্যা, কারন কেউ সেটা সত্য প্রমাণ করতে পারেনি।
তবে সাধারণত প্রথম অংশটাই বেশি ব্যবহার করা হয়। কারন জগতের সবকিছুর অস্তিত্ব প্রথমে দাবি করা, পরে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়। কিন্তু ধার্মিকরা কোনো কিছুর অস্তিত্বের দাবি করার পর অনস্তিত্বের প্রমাণ করতে বলে। এতে করে নাকি তাদের অস্তিত্বের দাবিটা প্রমাণিত হবে, যেটা হাস্যকর।
উদাহরণ ১: কোনো প্রমাণ নেই যে জ্বীন নেই , তাই অবশ্যই জ্বীন আছে।
উদাহরণ ২: আমি প্রমাণ করতে পারবো না যে উড়ন্ত ঘোড়ার অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন যে উড়ন্ত ঘোড়ার অস্তিত্ব নেই?
[ এখানে দাবিটা আপনার, সুতরাং সেটা প্রমাণ করার দায়িত্বটাও আপনার। ]
৪. False Dilemma
যেকোনো বিষয়ে দুটি বিকল্প দেখানো হয়, অথচ সেখানে অনেকগুলো বিকল্প থাকতে পারে।
উদাহরণ ১: আপনি হয় আমাদের দলের সমর্থক , নয়তো আমার শত্রু।
[ এখানে আপনি চাইলে ওই দলের শত্রু বা সমর্থক কোনোটাই না হয়ে বিকল্প হিসেবে নিশ্চুপ থাকতে পারেন। অথচ আপনাকে কেবল দুইটা বিকল্প দেখানো হচ্ছে, যেন আর কোনো বিকল্প নেই। ]
৫. Slippery Slope
এটা অনেকটা বাস্তবে পিছলে পড়ার মতনই কুযুক্তি। একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কি কি ঘটতে পারে, সেসব বলতে বলতে একটা চূড়ান্ত ফলাফলে পৌঁছে যাওয়া। অথচ সেসব ঘটার পিছনে ভালো কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনা।
উদাহরণ ১: যদি ছেলে-মেয়েদের একসাথে মেলামেশা বা বন্ধুত্ব করার অনুমতি দেই। তবে তারা স|ঙ্গম করবে। একসাথে জুয়া খেলবে, মদ খেয়ে পার্টি করবে।
উদাহরণ ২: শিক্ষার্থীদের একদিন ছুটি দিলে, পরবর্তীতে পুরো বছর ছুটির দাবি উঠাবে।
৬. Circular Reasoning / Begging to the question
বক্তার বক্তব্য ঘুরেফিরে একই কথাতে চলে আসে, কিন্তু উপসংহারে পৌছাতে পারেনা। এটা করা হয়, যখন বক্তার কাছে যুক্তি প্রমাণের অভাব থাকে।
উদাহরণ:
-ধর্মগ্রন্থের প্রতিটা কথা সত্য।
-ধর্মগ্রন্থের কথাগুলো যে সত্য, এটার প্রমাণ কি?
- এসব কথা ইশ্বর নিজে বলেছেন, তাই সত্য।
-ইশ্বরের কথা সত্য, এটার প্রমাণ কি?
-কারন ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে যে ইশ্বরের কথা সত্য। তাই সত্য।
৭. Hasty Generalization
ছোট একটা ঘটনার উপর ভিত্তি করে বড় সিদ্ধান্তে আসা।
উদাহরণ ১: আমি দুজন নারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিগারেট পান করতে দেখেছি। সুতরাং দুনিয়ার সব বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীগণ সিগারেট পান করে।
উদাহরণ ২: আজ একজন রিক্সাওয়ালা আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। সুতরাং, দুনিয়ার সব রিক্সাওয়ালা খারাপ।
৮. Red Herring
মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে আনা, যেখানে দুটো প্রসঙ্গের কোনো মিল নেই।
উদাহরণ ১: আপনি কেন সবসময়ই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন, যেখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা গংগীবাদ।
উদাহরণ ২: পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু আসলে আমাদের সুশাসন নিয়ে চিন্তা করা উচিত।
এই কুযুক্তিটির সাথে অনেকেই Straw man fallacy এর সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারেন। তাই পার্থক্যটা বলে দেওয়া ভালো। Red herring কুযুক্তিতে দুটো প্রসঙ্গের কোনো মিল থাকেনা। একদম সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়।
কিন্তু Straw man কুযুক্তিতে দুটো বিষয়ে সামান্য মিল থাকে। বক্তা মূলত মূল বক্তব্যকে বিকৃত করে নিজের মনমত। তখন বিকৃত করা প্রসঙ্গের সাথে মূল প্রসঙ্গের সামান্য মিল রয়ে যায়৷
আরেকটু উদাহরণ দিয়ে বলি।
রেড হেরিং ফ্যালাসী -
একজন ছাত্র বলেন, আমি বাড়ির কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
এর উত্তরে শিক্ষক বলেন, তুমি কি জানো বিশ্বে হাজার হাজার শিশু ক্ষুধার্ত আছে?
[ এখানে ছাত্র বললেন, বাড়ির কাজের কথা। কিন্তু শিক্ষক হাজার হাজার ক্ষুধার্ত শিশুর কথা বলে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে আনলেন। এখানে দুটি প্রসঙ্গের কোনো মিল নেই। ]
স্ট্রম্যান ফ্যালাসী -
এক পক্ষ বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় সুলভ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
অপর পক্ষ তার যুক্তিকে বিকৃত করে বলে , তার মানে, তুমি চাইছো যে সরকার পুরোপুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করে সব ব্যক্তিগত হাসপাতাল বন্ধ করে দিক।
[ এখানে বক্তার হাসপাতালের প্রসঙ্গের সাথে মিল রেখে আরেকটা প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। প্রথম প্রসঙ্গটা বিকৃত করে একটা ভিন্ন রূপের প্রসঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। প্রথম প্রসঙ্গের মূল বক্তব্যকে এড়িয়ে গেছে, যাতে করে মূল প্রসঙ্গের কথাটাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করা যায়। ]
৯. Appeal to Authority
একটা বিষয় সত্য৷ কারন অমুক লোক বলেছে, এটা সত্য।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরী। অমুক লোকটি মূল প্রসঙ্গের সাথে প্রাসঙ্গিক কিনা! যেমন একজন বিজ্ঞানী একটা কথা বললে , সেটার একরকম জোর থাকে। বিজ্ঞানী অবশ্যই নানান গবেষণার ভিত্তিতেই বলেন উনার কথাগুলো। কিন্তু একই কথা যদি আপনার বড় ভাই ইলিয়াস বলে এবং আপনি সেই বলার ভিত্তিতে বিষয়টাকে সত্য বলে ভেবে নেন, তখন সেটা হবে Appeal to authority fallacy । কেবল বলেছে বলেই সেটা সত্য হবেনা, সেটার জন্য প্রমাণ দেখাতে হবে। এখানে বিজ্ঞানীর কথাটা চাইলেই প্রমাণ করা যাবে। কিন্তু আপনার বড় ভাইয়ের কথাটা প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। তবে যদি প্রমাণসহ কথাটা বলে, তাহলে আর ফ্যালাসী হবেনা।
উদাহরণটা আলাদা করে আর দিচ্ছি না, যেহেতু লেখার ভেতরেই দিলাম।
১০. Appeal to Emotion
আবেগের আশ্রয় করে যুক্তিতে জিততে চাওয়া।
উদাহরণ ১: আপনি যদি গরীব মানুষদের দান না করেন, তার মানে দাড়ায় আপনি একজন স্বার্থপর মানুষ।
[ একজন মানুষের দান না করার পিছনে অনেক কারন থাকতে পারে। ]
১১. Non Sequitur
বক্তা কথা বললো একরকম , কিন্তু উপসংহার দিলো আরেক রকম।
উদাহরণ ১: সে অনেক বই পড়েছে, তাই সে ভালো দৌড়াতে পারে।
[ এখানে বই পড়ার সাথে ভালো দৌড়ানোর কোনো সম্পর্ক নাই। ]
১২. Tu Quoque
বক্তার ব্যক্তিগত আচরণ বা অভ্যাসকে তুলে ধরে তার যুক্তির প্রতি আক্রমণ করা হয়।
উদাহরণ - তুমি সিগারেট খাও, তাই তোমার বক্তব্য যে সিগারেট খাওয়া ভালো নয় —এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
১৩. Bandwagon
কেবল জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে কোনো বিষয়কে সঠিক ভাবা।
উদাহরণ ১: ইসলাম ধর্মের জনপ্রিয়তা অনেক বাড়ছে, সুতরাং এটাই সঠিক ও সহনশীল ধর্ম।
উদাহরণ ২: ওই সিনেমাটা ভালো। কারন সিনেমাটা প্রচুর মানুষ দেখেছে।
[ নোংরা জিনিসেরও অনেক জনপ্রিয়তা থাকে। তাই বলে সেটা ভালো জিনিস হয়ে যায়না। ]
১৪. False Analogy
দুটি বিষয়ের মধ্যে তুলনা করে উপসংহার টানা , যেখানে ওই দুটি বিষয়ের মধ্যে আদতে সমতুল্য কোনো বৈশিষ্ট্য নেই।
উদাহরণ ১: গাছের পাতা ঝরে গেলে গাছ মারা যায়, তাই মানুষের যদি কোনো অভ্যাস পরিবর্তন না হয় তবে জীবনে সফলতা অর্জন করা যাবে না।
উদাহরণ ২: একজন চিত্রশিল্পী ও একজন সংগীতজ্ঞের কাজ তুলনা করা যায়। একজন ভালো চিত্রশিল্পীর কদর না করলে একজন সংগীতজ্ঞের সুরও সঠিক হবে না।
১৫. Appeal to Nature
প্রকৃতিতে আছে বলেই একটা কাজ সঠিক, এমনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
উদাহরণ ১: এই ঔষধটি ১০০% প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি, তাই এটি অবশ্যই নিরাপদ এবং কার্যকর।
পরিশেষে,
তর্ক করার সময় খেয়াল করে প্রতিটা কথা বলবেন। যাতে করে আপনার কথাবার্তায় কোনোরকম কুযুক্তি না চলে আসে । উল্লেখিত কুযুক্তিগুলো মাথায় ভালোমত গেঁথে নিন। ভবিষ্যতে কাজে আসবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন