⭕⛔পিয়নের সাইকেল: দ্বিতীয় অধ্যায় - শূন্য ঠিকানার চিঠি⛔⭕
(একটি ভুল চিঠির উত্তর দিতে হয় জীবন দিয়ে…)
কালিগাঁও গ্রামের নিঃসঙ্গতা এখন কেবল ভূতের গল্পে বেঁচে আছে।
৮ বছর আগে পরিত্যক্ত হওয়ার পর থেকে সেই পুরনো ডাকঘরটাও যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে—নীরব, জমাট ধুলোময় এবং প্রতীক্ষাময়… ঠিক এমন একটা কিছুর জন্য যা শেষ হয়নি, শুধু বিলম্বিত।
গ্রামের বাইরে যারা এখনও বেঁচে আছে, তারা ঘুমের আগে জানালা বন্ধ করে রাখে, আর একে-অপরকে চুপিচুপি বলে—
“রাত ২টায় সাইকেলের শব্দ শোনা গেলে, পরদিন সকাল হবে না… অন্তত, সবার জন্য না।”
ঢাকার খ্যাতিমান অনুসন্ধানী সাংবাদিক তৌহিদুল ইসলাম সিদ্ধান্ত নেন এই কালিগাঁও রহস্যের নথিভুক্ত প্রমাণ আনবেন। তার সঙ্গী হয় রোহান (ক্যামেরাম্যান) ও তৃষা (সাউন্ড টেকনিশিয়ান)—তিনজনেই আধুনিক প্রযুক্তি ও যুক্তির মানুষ। ভূত-প্রেত বিশ্বাস করে না, কিন্তু রহস্য তাদের টানে।
তারা কালিগাঁও পৌঁছে গভীর রাতে ক্যাম্প বসায় পরিত্যক্ত ডাকঘরের ভেতরেই।ঘড়ি তখন রাত ১:42। বাতাস নিস্তব্ধ, আকাশজুড়ে কুয়াশা ঘুরপাক খাচ্ছে—হঠাৎই যেন পুরনো দেয়ালগুলো কেঁপে ওঠে।
“চক্র… চক্র… কিচ কিচ…”
সাইকেলের সেই বিখ্যাত শব্দ, একটানা এগিয়ে আসছে যেন দূর থেকে। তৃষা ক্যামেরা তাক করে ফ্রেমে যা দেখতে পান, তা চোখে দেখা নয়—অভিজ্ঞতা।
একটা ছায়ামূর্তি —চোখহীন মুখ, পোড়া গলার নিচে পচা দাগ, কাঁধে চিঠির ব্যাগ, আর ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে হাঁটছে, যেন বহু পুরনো সময় থেকে উঠে আসা কোনো আত্মা।
তৌহিদ হঠাৎই দরজা খুলে বাইরে তাকান — কেউ নেই। কিন্তু মেঝেতে পড়ে থাকে একখানা চিঠি, অর্ধপোড়া, ছাইয়ের গন্ধমাখা।চিঠির গায়ে কিছুই লেখা নেই, শুধু এক লাইন:“যার পাপ অজানা, তার ঠিকানাও শূন্য…”
চিঠি হাতে নিয়েই তৃষার শরীর কেঁপে ওঠে, সে বলে, “আমার নাম… চিঠির মধ্যে…”রোহান কিছু বলতে চায়, কিন্তু তখনই তার নাক দিয়ে গাঢ় কালো রক্ত পড়তে শুরু করে। চোখের মণি গলে যায় অন্ধকারে।
তৌহিদ চিঠিতে আঙুল রাখতেই—চারপাশে গড়িয়ে যায় সময়।
তিনি দেখতে পান:একটা মেয়ে, প্রায় ১২ বছরের, মাটির নিচে কবরের মতো গর্তে বন্দী। গফুর আলী সেই মেয়ের শেষ চিঠিটা পেয়েছিলেন—তাকে বাঁচানোর মিনতি ছিল তাতে। কিন্তু তিনি সেই চিঠি গোপন করে ফেলেছিলেন…
কারণ সে মেয়েটি ছিল এক অভিশপ্ত বংশের সন্তান। তার জন্মেই মৃত্যু নির্ধারিত ছিল, আর তাকে বাঁচাতে গেলে পুরো গ্রাম অভিশপ্ত হতো।গফুর চেয়েছিলেন নিজেকে রক্ষা করতে…কিন্তু চিঠি হারানোর সেই অপরাধে সে নিজেই হয়ে যায় চিঠির নরকদূত।
রাত ৩টা বাজে।
ডাকঘরের দেয়ালগুলোতে হঠাৎ লেখা ভেসে ওঠে—
“হারিয়ে যাওয়া পাঠক: তৌহিদ”
“অপ্রাপ্ত ঠিকানা: তৃষা”
“অজানা পাপ: রোহান”
ঘড়ির কাঁটা উল্টো ঘুরছে…চিঠির ব্যাগ নিজে নিজেই খুলে যাচ্ছে, একে একে বেরিয়ে আসছে তিনটি চিঠি—তিনজনের নাম লেখা সেই ঠিকানাহীন কাগজে।
তৃষা দরজার দিকে দৌড় দিলে দেখে, ডাকঘরের বাইরে আর গ্রাম নেই… বরং চারপাশে অসংখ্য কবর—প্রতিটা কবর থেকে হাত বেরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে, যেন কোনো পুরনো পাঠক তার চিঠি ফিরে নিতে চায়।
তাদের গলা দিয়ে একে একে শব্দ বের হয় না… বরং ধোঁয়া, পোড়া ছাই আর অভিশপ্ত ঠিকানার চাপা কান্না।তারা বোঝে—এখানে এসে ফিরে যাওয়া যায় না।গফুর এখন একা না, ওদেরকে সাথী করে নিয়েছে।সকাল ৬টা ৩ মিনিট।একদল পর্যটক ডাকঘরের সামনে থেমে যায়। ভিতরে তারা পায়। একটি ক্যামেরা, ভাঙা ট্রাইপড, আর চিঠির ব্যাগ।
তিনজনের কোনো চিহ্ন নেই।কিন্তু ক্যামেরার ভিডিওতে শেষ রেকর্ডিং —একটা ছায়ামূর্তি, যার পেছনে তিনটি ছায়া ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে, আর মুখ থেকে একসাথে উচ্চারণ:“তোমার চিঠি এখনো পৌঁছায়নি… তুমি কি পরবর্তী পাঠক?"
আজ রাত ২টা।
যদি অজানা সাইকেলের শব্দ শুনতে পাও, জানলা বন্ধ করলেও লাভ নেইগফুর শুধু চিঠি বিলি করে না,সে খুঁজে বেড়ায় “পাপী পাঠক” — যার ঠিকানা এখনও অনির্ধারিত… হয়তো এবার…তোমার ঠিকানাই ব্যাগে লিখে ফেলেছে কেউ…
শেষ লাইন:
“⛔যে চিঠির প্রাপক মরে যায়, সেই চিঠি কখনো ফেরত যায় না…⛔”
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন