⛔ ভাসমান কবর ⛔
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আমাদের পেজের ইনবক্সে আসে একটি ইমেইল। সেন্ডারের নাম ছিল না, ইমেইল অ্যাড্রেসটাও ছিল এমন—shadow.of.ocean1781@… সাথে ছিল কিছু পুরনো স্ক্যান কপি—একটা ডায়েরি, কয়েকটা অস্পষ্ট নোট, আর একটি লিঙ্ক—যেটি নিয়ে যেত এক ডার্ক ওয়েব পেজে আপলোড করা ভয়ানক ফুটেজে।
প্রথমে আমরা এটিকে বানানো কনটেন্ট ভেবেছিলাম। কিন্তু যখন আমরা সেই তথ্য অনুসরণ করে কক্সবাজারের স্থানীয় দুজন ভিডিও ক্রিয়েটরের সাথে কথা বলি, তখন তারা বললেন— “হ্যাঁ ভাই, ওই পুরনো কাঠের জাহাজ সত্যিই ভেসে এসেছিল। আর একজন ছেলেও এসেছিল ইউটিউব ভিডিও করতে… কিন্তু পরে তার কোনো আপডেট পাইনি।” তার পেজ আজো চালু, কিন্তু কোনো নতুন ভিডিও নেই, লাস্ট পোস্ট ৯ মাস আগে।
এই সবকিছু যাচাই করে আমরা বুঝি—গল্পটা হয়তো গল্প না… বরং এমন কিছু, যা কেউ চায় না আপনারা জানুন।
বালুচরের উপর আধা পচা এক খুলি পড়ে আছে। পাশেই মাটি থেকে উঁকি দিচ্ছে দুটি হাতের হাড়। আশেপাশে আরও কয়েকটা খুলি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। একটু দূরে, সাগরের ঢেউ ছুঁয়ে যাচ্ছে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের অর্ধডোবা কাঠামো। বাতাসে ভেসে আসছে স্যাতসেতে গন্ধ, যেন মাটির নিচে এখনও কিছুর উপস্থিতি বেঁচে আছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে, কক্সবাজার সমুদ্রতীরে ঘূর্ণিঝড়ের পরে ভেসে আসা এই দৃশ্য দেখে প্রথমে সবাই ভেবেছিল হয়তো পুরনো কোনো জাহাজডুবির চিহ্ন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন জাহাজের কাঠের ভাঙা অংশ থেকে একটি ধাতব বাক্স উদ্ধার করা হয়। বাক্সটা ছিল তালাবদ্ধ, আর তার গায়ে খোদাই করা ছিল: "La tombe flottante – 1781"—ফরাসি ভাষায় যার মানে “ভাসমান কবর”।
কেউ জানতো না, বাক্সটি খোলার পরই একটা অভিশপ্ত চক্র আবার শুরু হয়ে যাবে।
একজন তরুণ অভিযাত্রী, নাম রাহাত, এই ঘটনাগুলো প্রথম ফেসবুক লাইভে তুলে ধরতে গিয়ে নিজের চোখে দেখেছিল বাক্সের ভেতর থেকে গা-ছমছমে বাতাস বেরিয়ে আসতে। ভিডিওর শেষ লাইনে সে বলেছিল, “আব্বা… কেউ একজন এখানে হাঁটছে… কিন্তু কেউ নেই… কেউ নেই…”
তারপর সে নিখোঁজ।
তদন্তে উঠে আসে এক পুরনো নাবিকের ডায়েরি। তার নাম ছিল আজিম আলী। ১৭৮১ সালের মার্চ মাসে সে ছিল "এম্প্রেস অফ দ্য হ্যাভেন" নামের এক ব্রিটিশ বাণিজ্য জাহাজের নাবিক। জাহাজটি দক্ষিণ চীন সাগর পাড়ি দিয়ে আরব সাগর হয়ে বাংলা উপকূলে আসছিল। বহন করছিল অদ্ভুত কিছু পণ্য: তিব্বতের এক প্রাচীন কঙ্কাল, মরোক্কোর এক লোহার জলপাত্র, আর একটি ছোট লোহার বাক্স—যার ভিতরে কী ছিল, কেউ জানত না।
সপ্তাহখানেকের মধ্যে শুরু হয় অদ্ভুত ঘটনা। নাবিকরা রাতে স্বপ্নে দেখত সাগরের নিচ থেকে কেউ ডাকে। কেউ কানে ফিসফিস করে বলে, “তুমি যদি ফিরে যাও, তবু আমরা তোমাকে ছাড়বো না।”
জাহাজের মাঝখান দিয়ে উঠে আসত কুয়াশার মতো ধোঁয়া, যার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকত মানুষের মতো কিছু অবয়ব। তাদের চোখ ছিল না, কিন্তু তারা হাঁটত। সোজা রুমে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকত মাথার পাশে। কেউ ঘুমালে তাকে ডেকে বলত, “তোমার ঘুম দরকার নেই আর।”
এক এক করে সব নাবিক অদৃশ্য হতে লাগলো।
আজিম আলী তার ডায়েরিতে লিখেছিল—“আজ ক্যাপ্টেন রিড নিচে গিয়েছিল। ওর পায়ের নিচে যেন কাঠ নড়ে উঠলো। জাহাজ কাঁপলো হালকা করে, তারপর চিৎকার। কেউ বলল, 'এখানে আসো… নিচে সবাই আছে…' এরপর আর রিড উঠে আসেনি।”
ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় লেখা ছিল— “যদি কেউ এই ডায়েরি পায়, দয়া করে ফিরে যাও। এই জাহাজ ভাসে না। এটা কবর। আর আমরা সবাই এখানে বন্দি।”
তারপর ডায়েরিটা থেমে যায়।
রাহাতের নিখোঁজ হওয়ার পর দিন পাঁচেক কেউ কিছু বলেনি। তারপর একদিন তার ফোনের লোকেশন আচমকা দেখা যায় সমুদ্রের অনেক ভিতরে, যেখানে জাহাজটি ডুবে ছিল বলে অনুমান করা হয়।
তদন্তকারী দল একবার ডুব দেয়। কিন্তু তাদের হেলমেট ক্যামেরায় দেখা যায়—জলের নিচে ভাসছে পুরো জাহাজটা। অক্ষত। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে ১৮-১৯ জন হাড়ের মতো দেখতে অবয়ব, তাদের চোখ নেই, কিন্তু তারা সবাই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর কেটে যায় সংযোগ।
জলের নিচে কেউ কথা বলেছিল সেই মুহূর্তে—"তোমরা ওদের ফেরত চাও… ওরা তো আমাদের হয়ে গেছে…"
তারপর আর কেউ ডুব দেয়নি।
কিন্তু সমুদ্র কখনও কিছু গিলে ফেলে না। সে শুধু সময় মতো ফেরত দেয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আবার এক ঝড়ে জাহাজের আরও অংশ ভেসে আসে কক্সবাজারে। এবার মানুষজন দেখতে পায় অদ্ভুত দাগ—বালির ওপর যেন কেউ হেঁটেছে, কিন্তু কোনো পা নেই। খুলি আর হাড়গুলো ছিল গরম, ছুঁয়ে দেখা যায়নি।
গল্পটা এখানেই থেমে যায় না।
রাহাত কোনো পেশাদার অভিযাত্রী ছিল না। ও ছিল একজন স্রেফ ইউটিউবার আর ফেসবুক লাইভার, “সিনিস্টার বাংলা” নামে তার পেজে নানা ভৌতিক কন্টেন্ট বানাতো। ২০২৩ সালের শেষ দিকে এক ঝড়ে কক্সবাজারে ভেসে আসা পুরনো কাঠের জাহাজের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে সে চরম কৌতূহলী হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে সে নিজেই যায় স্পটটিতে।
প্রথম ভিডিওটা ছিল রাত ১১টার দিকে। সে বলছিল— “এই বাক্সটা আসলে কি? এত পুরনো, কিন্তু তালাটা এমনভাবে লাগানো যেন কেউ এর ভেতর থেকে কিছু বের হতে না চায়।” তার সাথের লোক বলেছিল— “ভাই, খুলবেন না… লোকজন বলতেছে আগেও নাকি এমন বাক্স ভেসে এসেছিল। তারপর এক গ্রাম উধাও হইছিল।”
রাহাত হেসে বলে— “ভাই ভাইরাল তো হতে হবে!”
আর সেদিনই সে একটা ভুল করে। সে সেই বাক্স খুলে ফেলে লাইভে। ক্যামেরায় দেখা যায় কালচে ধোঁয়ার মতো কিছু বের হচ্ছে। হঠাৎ লাইভ হ্যাং করে যায়।
২৪ ঘণ্টা পর, সেই পোস্টে একটা কমেন্ট আসে— “রাহাত এখন আর তোমাদের মাঝে নেই। সে এখন আমাদের।” কমেন্টটা ছিল ঠিক সেই পেজের মডারেটর আইডি থেকে, অথচ সে তখনই জানায় যে ওর আইডি হ্যাকড।
আজিম আলীর ডায়েরির অনুবাদ অংশ
২২ মার্চ, ১৭৮১
আজ রাত্রে জাহাজের ডেক কেঁপে উঠলো। এক সঙ্গী বলল, "কেউ যেন জলের নিচ থেকে তাকাচ্ছে আমাদের দিকে।" আমি লণ্ঠন নিয়ে নিচে যাই। কাঠের তলায় অদ্ভুত দাগ… যেন কারো পায়ের ছাপ, কিন্তু উল্টো দিকে—পায়ের আঙুল সামনে না, পেছনে।
২৩ মার্চ, ১৭৮১
একজন নাবিক আজ নিজেই ঝাঁপ দিলো। কিছু বলছিল না। শুধু হেঁটে গিয়ে লাফ দিয়ে পড়লো জলে। কেউ দেখেছিল তার কানে কেউ ফিসফিস করছিল।
২৫ মার্চ, ১৭৮১
জল থেকে উঠলো কিছু... পচা হাত, কিন্তু সে হাঁটতে পারে। ক্যাপ্টেন বলছিল—এই বাক্সটায় কিছু ছিল… যেটা ওরা ‘সমুদ্রের দাফন’ বলে।
শেষ এন্ট্রি: ২৯ মার্চ, ১৭৮১
আমাদের সবাইকে ওরা ডাকছে। ডেকে উঠলে দাঁড়িয়ে থাকে এক সারি মৃত চোখহীন অবয়ব। আমরা পলাতে পারি না। কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে বলছে—"তোমরা ভেবেছিলে সমুদ্র গিলে ফেলে… না, সমুদ্র সংরক্ষণ করে… মৃত্যুকে চিরকাল ভাসিয়ে রাখে।"
শেষ পাওয়া ভিডিওর ট্রান্সক্রিপ্ট
রাহাত (ঘেমে গেছে, কণ্ঠ কাঁপছে): “এই বাক্স খুলেছি… একটা ঠান্ডা বাতাস লাগলো মুখে… কেউ হাঁটছে… হ্যাঁ, আমি শিওর কেউ হাঁটছে… অথচ কেউ নেই… ভাই, দরজা বন্ধ হয়ে গেল… কেউ দরজা… বন্ধ করছে…”
(ভিডিও ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। শব্দ শোনা যায়—জলের মতো ফিসফিসানি)
(✍️আমরা আর কোন তথ্য উদ্ধার করতে পারিনি যতটুকু উদ্ধার করেছি ততটুকুই লিখতে পেরেছি গুছিয়ে কেমন হয়েছে আশা করছি কমেন্ট করে আপনার মূল্যবান মন্তব্য আমাদের জানাবেন✍️)০
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন