⛔⛓️ মাহার জবানবন্দি⛓️⛔
(✍️একজন নার্সের বাস্তবিক জিন-আক্রান্ত জীবনের রক্তজমে যাওয়া সাক্ষ্য✍️)
আমি মাহা আক্তার। মুন্সীগঞ্জের মেয়ে, এখন ঢাকায় নার্সিং পড়ি। আমি চাই, আমার এই কথা গুলো তোমরা মন দিয়ে শোনো। কারণ এটা কেবল একটা গল্প না—এটা আমার নিঃশ্বাস, আমার আতঙ্ক, আমার জীবন।
সবকিছু শুরু হয় যখন আমি ক্লাস সেভেন-এইটের ছাত্রী। আমার বড়ো চাচি প্রায়ই কবিরাজ বাড়ি যেতেন। শরীর ঝাড়ফুঁক করাতেন। আম্মু আর আমি সেইসব দেখে হাসতাম, বলতাম, “এই আধুনিক যুগে কে আর জিন-ভূতে বিশ্বাস করে!” চাচি একদিন শুধু বলেছিলেন, “বুঝবি একদিন, জিন আছে কি নাই।”
বুঝেছিলাম। খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলাম।
আমার আব্বু সিদ্ধান্ত নেন, আমরা মুন্সীগঞ্জ সদর চলে যাব, যেন পড়াশোনার পরিবেশ পাই। তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে উঠলাম। তখন সব ঠিকই চলছিল। কিন্তু একদিন আমার ছোট ভাই সাহাদ অসুস্থ হয়ে পড়ে। কাকি দেখতে আসে। হুট করে সে নামাজ পড়ে পাশের রুমে, নামাজ শেষে অদ্ভুতভাবে শরীর ঝাঁকায়, তারপর চুপচাপ চলে যায়।
সেদিন সন্ধ্যায় আম্মু রুমের জানালা বন্ধ করতে যায়, যেই রুমে কাকি নামাজ পড়েছিল। জানালা বন্ধ করতেই চোখে পড়ে—তিনটা ছায়ামূর্তি রুমে ঢুকছে। পর মুহূর্তে আমি হঠাৎ দরজার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যাই। আমার শরীর কাপছে, মুখে আওয়াজ নেই, চোখ স্থির।
আমার মধ্যে তখন কিছু একটা ঢুকেছে।
পরদিন থেকে আমার শরীর নীল-কালো হতে থাকে। আমার চোখে এক ভয়াবহ চাহনি। বাচ্চারা আমার পাশে আসত না, বড়রাও ভয় পেত। ডাক্তার ওষুধ দেয়, ঘুমের, ডিপ্রেশনের, কিন্তু কিছুতেই কাজ হয় না। ঘরে ছায়া দেখি, রাত হলে পায়ের আওয়াজ, ফিসফাস, শীতল বাতাসের ঘ্রাণে ঘর জমে যায়।
এক রাতে আমি ঘুমাচ্ছি। হালকা ঘুমে বুঝি, কেউ আমার হাত ধরে আছে। চোখ মেলে দেখি—একটা মোটা, লোমে ঢাকা, দানব সদৃশ কালো ছায়া আমার পাশে বসে আছে। আমি চিৎকার করি, লাইট জ্বলে ওঠে। আম্মু এসে দেখে বুকসেল্ফের পেছনে কিছু একটা লুকিয়ে আছে। আমি বলি, “সেইটা দেখলাম!” কিন্তু কেউ বিশ্বাস করে না।
আমাকে এক কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি জানান, আমার কাকি যখন ছোট ছিল, পুকুরে গোসল করতে গিয়ে এক অদৃশ্য সত্তার নজরে পড়ে। তখন থেকেই সেই জিন তার মধ্যে আছে। এখন সেটা আমার দিকে নজর দিয়েছে।
পরিবারের শত্রুরা আমাদের নিচে ১৪টা তাবিজ পুঁতে রেখেছে। সেইসব তাবিজ থেকেই জিনদের আনাগোনা। তারা রক্ত চায়, আত্মা চায়।
একদিন আম্মু সাহাদকে আনতে যায়, আমাকে রুমে লক করে দেয়, ছুরি, বটি, ধারালো কিছু লুকিয়ে রাখে। কিন্তু আমি তো পেন্সিল কাটার ব্লেড পেয়ে যাই। নিজের হাত কেটে ১০০টা দাগ দিই। মুখ কালো, চোখ বেরিয়ে আসে, আমি আর আমি নেই। আম্মু এসে দেখে, আমি একটা দানবের মতো রূপ নিয়েছি।
মামা এসে আমাকে নানুবাড়ি নিয়ে যায়। এরপর আরেক কবিরাজকে পাই। উনি বলেন, “তিনটা জিন তোমার সাথে যুক্ত, তাদের আলাদা করে বোতলে ভরে নদীতে ফেলে দিতে হবে।” ছাগল জবাই, মিলাদ, কালো তাবিজ—সব করানো হয়। ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকি। এরপর ঢাকায় চলে আসি নার্সিং পড়ার জন্য।
কিন্তু, এই যাত্রা শেষ হয়নি।
ঢাকায় হোস্টেলের ৪ তলায় উঠি। কেউ সেই তলায় থাকতে চায় না। রাতে ছাদ থেকে শব্দ আসে। কেউ বলে, আমরা নাকি নাচি। অথচ আমরা কিছুই শুনি না, শুধু ছাদের কড়কড় শব্দ, আর ঘন রাত্রিতে হঠাৎ কড়া গন্ধ।
একদিন রাত ২টার দিকে আমার এক বান্ধবীর গলায় কণ্ঠ শুনি—“মাহা, এইদিকে আয়।” দরজা খুলি, কেউ নেই। মোশারির ভেতরে ঢুকে পড়ি। দেখি—কে যেন মোশারির উপর থেকে উঁকি দিচ্ছে! আমি চিৎকার করি। সবাই ভয়ে এক বিছানায় এসে কুঁকড়ে থাকে।
পরে জানতে পারি, সেই রুমে আগে এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তখনই বুঝি, আবার শুরু হয়েছে।
পরবর্তী বাসায় এক রাতে দেখি, এক শাড়ি পরা মহিলা আমার পাশে শুয়ে পড়ে। মুখ ফিরিয়ে আছি। কবিরাজ বলেছিলেন, কথা বললেই বিপদ। কিন্তু আমি একটু সাহস করে মুখ ফিরিয়ে দেখি—এক পুড়ে যাওয়া, বিকৃত, চোখ গলতে থাকা মুখ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমার হুঁশ থাকে না।
আমাকে আবার তাবিজ পড়তে হয়, কালো কাইতন কোমরে বাঁধতে হয়। অনেকদিন ভালো থাকি। হুট করে কিছুদিন আগে কাইতনটা হারিয়ে যায়। তখনই জানালায় এক বিকট আওয়াজ। জানালা খুলে দেখি—পাশের বিল্ডিংয়ের দেয়ালের উপরে বসে আছে সেই দানবটা, যেটা এক রাতে আমার পাশে বসেছিল। এবার সে পেছন ফিরে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়।
সেই চোখ, সেই ছায়া, সেই লোমে ঢাকা কালো শরীর।
আজ এতদিন পরও আমি জানি না—এইটা কি একজন? নাকি একাধিক? এরা কি চাচির মধ্য থেকে আমার মধ্যে এসেছে, নাকি আমাদের পরিবারের উপরই এই ছায়ার অভিশাপ?
শেষ কোথায়, আমি জানি না।
তবে এখনো ঘুমাতে গেলেই বুক ধড়ফড় করে, বাতি নিভলেই ছায়া নড়ে ওঠে, আয়নায় তাকালে মনে হয়—আমি ছাড়া আরেকজন আমার ভিতরেই আছে।
এই লিখতে লিখতে আমার বুক কাঁপছে।
আমি এখনো পেছনে তাকাই না।
⛓️শেষ নয়⛓️
(জিনের দৃষ্টি পড়লে জীবন বদলে যায়। কেউ বিশ্বাস করুক আর না করুক, কেউ কেউ এই অভিশাপের বোঝা বয়ে চলে আজীবন। মাহা এখনো লড়ছে—নিজের ছায়ার বিরুদ্ধে।)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন