⛔গ্রীস্মের দুপুর ⛔
(✍️ নিজের দাদার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ভয়ংকর বাস্তব ঘটনাটি শেয়ার করেছেন জুথী ঝিনাইদহ থেকে লিখছি দাদার ভাষায়✍️)
আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া আমি জুথী ঝিনাইদহ থেকে বলছি অনেকদিন ধরে ভাবছি আপনাদেরকে আমাদের পরিবারের অর্থাৎ দাদার সাথে ঘটে যাওয়া একটি ভয়ংকর ঘটনা শেয়ার করব জানিনা আপনারা ঘটনাটি কিভাবে বিশ্বাস করবেন তবে যা ঘটে তাহাই রটে।
১৯৭৪ কিংবা ৭৫ সালের কথা। তখন গ্রামে গ্রীষ্মকালের দুপুর যেন আতঙ্ক ছড়ানোর নিঃশব্দ সময়। জনমানবহীন বিস্তীর্ণ মাঠ, ঝাঁ ঝাঁ করে পড়া রোদ আর পায়ের নিচে ফেটে যাওয়া মাটি—সেই সময়েই আমি আর আমার বন্ধু কালী মিলে গরু চরাতে গিয়েছিলাম গ্রামের এক প্রান্তের মাঠে। আমাদের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। মাঠে তখন কিছু জমি খালি, আবার কিছু জমিতে ধইঞ্চা গাছের সারি, যা দেখতে অনেকটা পাট গাছের মতো। ধইঞ্চাগুলো লম্বা, ঘন, আর কিছুটা গা ছমছমে। ঠিক যেন কারো লুকিয়ে থাকার উপযুক্ত জায়গা।
আমরা তখন যুবক, শরীরে রক্ত টগবগ করছে, ভয় বলে কিছু অনুভব করতাম না। মাঠের একপাশে ধইঞ্চার ভুইয়ের আইলে বসে ছিলাম। আমি আর কালী মিলে তর্কে জড়িয়ে পড়ি এক সময়। সে রাগ করে তার গরুগুলো নিয়ে অন্য পাশে চলে গেল। আমি একা পড়ে রইলাম। দুপুরের রোদে মাঠ ফাঁকা, কোথাও কোনো লোকজন নেই। একা বসে থাকতে থাকতে অস্বস্তি লাগছিল, যেন চারপাশের নিস্তব্ধতা কিছু একটা লুকিয়ে রাখছে।
তখনই হঠাৎ একটা শব্দ পেলাম—“কুক...” বাচ্চারা যেমন লুকোচুরি খেলায় লুকিয়ে থেকে শব্দ করে, তেমন কিছু। আমি ভাবলাম কালী হয়তো মজা করছে। কয়েক মিনিট পর আবার শব্দ হলো। আমি জোরে বললাম, “এই কালী, আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস নাকি? আমি বুঝতেছি!” কোনো উত্তর নেই। আবার নিস্তব্ধতা।
এরপর হঠাৎ সেই একই শব্দ আরও জোরে। এবার আমি একটু রেগে গিয়ে বললাম, “তুই কি বাইরে আসবি না আমি গিয়ে তোকে ধইঞ্চার ভেতর থেকে টেনে বের করব?” এইবারও নিরবতা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, বাতাস একেবারে থেমে গেল। একমুহূর্ত আগেও ধইঞ্চা গাছের ফাঁকে সামান্য বাতাস ছিল, এখন চারপাশ একেবারে স্তব্ধ। শরীর ভারী লাগতে শুরু করল। বুকের ভেতরে অজানা একটা শঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছিল।
ঠিক তখনই সেই শব্দটা আবার, কিন্তু এবার অনেক জোরে। সেই আওয়াজে যেন কোনো পশুর গর্জনের সুর ছিল। আমি আর থাকতে পারলাম না। হামাগুড়ি দিয়ে ধইঞ্চার গাছের ফাঁক দিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম—আর তখনই আমি যা দেখলাম, তা আমার আজীবনের দুঃস্বপ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
দুইটা বিশাল মোটা পা, পশুর মতো দেখতে, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মতো। পা দুটো পুরোটাই কালো লোমে ঢাকা। এত লম্বা ছিল সে, আমি নিচ থেকে কোমর পর্যন্তই দেখতে পেলাম। মুখ দেখতে পাইনি। আমি তো ভয়ে জমে গেলাম, আর ঠিক তখনই সে একটা আওয়াজে বলল, “কিরে, আমার কাছে আইসোস? তুই কি আমাকে দেখে ভয় পাস না? তোর অনেক সাহস!” গলা ছিল যেন খোঁচা খোঁচা পাথরের মতো, গলা দিয়ে ঘষে ঘষে আওয়াজ বের হচ্ছে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। আমি আর দেরি করলাম না। সোজা দৌড়ে মাঠ পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় উঠে এলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, ধইঞ্চার ভুইয়ের মধ্যে হঠাৎ প্রবল বাতাস বইছে, অথচ আশেপাশে এক চিলতে পাতাও নড়ছে না।
আমি তখনো দৌড়াতে থাকি। গরুগুলো ফেলে রেখেই বাড়ি ফিরি। মা আমাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কি রে, এত তাড়াতাড়ি চলে এলি? গরুগুলা কই?” আমি কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। বুক ধকধক করছিল, শরীর ঘেমে ভিজে গেছে। সেদিনের পর আমার টানা ৩-৪ দিন জ্বর। গরুগুলোর মধ্যে একটা বড় গাভি—যেটা সবচেয়ে শক্ত আর দামী ছিল—সেই ধইঞ্চার ভুইয়ের পাশেই মরে পড়ে ছিল।
আমার মা পরে এক কবিরাজের কাছে নিয়ে গেল। সে আমার শরীর দেখে বলল,
“এই ছেলেটা একখান দেও’র সামনে পড়ে গেছিল। ওর সাহস দেখে দেওটা রেগে গেছিল। ওর বলার ধৃষ্টতা—‘আমি কাউকে দেখে ভয় পাই না’—এই কথাটাই দেওটা শুনে ফেলেছিল। তাই ওকে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু এই ছেলে বেঁচে যায়, আর ওর জায়গায় গরুটা মারা পড়ে।”
সেদিন জ্বরের চতুর্থ দিন। আমার মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে, রাতের ঘুম নেই। ঘুমালেই অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি—একটা কালো ছায়া আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে ডাকে, “আয়... তুই সাহসী না? তুই আমাকে দেখে ভয় পাইস না... আয়...” আমি চিৎকার দিয়ে উঠে বসি, গলা শুকিয়ে কাঠ।
তখন মা ও বাবা আমাকে গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার এক বিখ্যাত কবিরাজের কাছে নিয়ে গেল। তিনি ছিলেন অল্পবয়সী, কিন্তু তার চোখদুটো এত তীক্ষ্ণ ও গভীর ছিল, যেন কারো ভিতরের চিন্তাও পড়ে ফেলতে পারেন। নাম ছিল তার হুজুর কবিরাজ কাদির আলী। যমুনার পারে দীর্ঘ সময়修ফিল বাস করেছেন, জ্বিন ও দেও-দাওয়াদের ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা বিস্তর।
আমি ওখানে পৌঁছানোর পরই তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ ছেলেটা কারে গিয়ে ডিস্টার্ব কইরা আইছে? ওর গায়ে ঘোরত লাগছে, ঠিক যেন কেউ ওর চারপাশে হাঁটতেছে...” মা তখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “হুজুর, বাঁচান! আমার ছেলে মরে যাবে।”
তিনি এক দমকা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, “ভয়ের কিছু নাই, তবে কাজটা সহজ না। দেওটা খুব রেগে আছে। ওরে বোঝাইতে হবে।”
তারপর তিনি একটা পুরোনো কাঠের সিন্দুক খুলে ভেতর থেকে কয়েকটা পুরোনো আরবি হরফ খচিত পুঁথি, কিছু শুকনো হরিয়াল পাতা, আর একটি কালি-জল মেশানো বোতল বের করলেন। ধূপ জ্বালালেন, তারপর আমার কানের পাশে ফিসফিস করে কিছু পড়তে লাগলেন— “আউযু বিঝি রব্বিন্নাস, মালিকিন্নাস, ইলাহিন্নাস...”
তার কণ্ঠে ছিল একধরনের কম্পন। আমি অনুভব করলাম আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। আচমকা তিনি একটা লম্বা হাঁপ ছেড়ে বললেন, “ও এখন আমাদের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছে। আমি যখন ওরে নাম ধইরা ডাকবো, তখন কিছু একটা ঘটবে। তোমরা ভয় পাইও না।”
তারপর তিনি পুঁথি থেকে কিছু আরবি শব্দ উচ্চারণ করলেন, গলার স্বর ধীরে ধীরে চড়ে উঠল। হঠাৎ করে বাতাস বন্ধ হয়ে গেল ঘরের মধ্যে। ধূপের ধোঁয়া ঘনীভূত হয়ে একটা কালো চক্রের মতো আমাদের চারপাশে ঘুরতে লাগল।
ঠিক তখনই আমি একটা বিকট শব্দ শুনলাম—ঘরের জানালার কাঁচে খটাস করে কিছু একটা লাগলো। আমি লাফ দিয়ে উঠে পড়তে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কবিরাজ হঠাৎ আমার কপালে ঠান্ডা কালিজল ছিটিয়ে বললেন, “নড়বি না! ওরে তুই একবার সাহস দেখাইছিলি, এখন ও তোকে নিয়ে যেতে চায়।”
এরপর তিনি ছোট এক টুকরো তামার পাতায় কিছু লিখে সেটা আগুনে পুড়িয়ে ধোঁয়া আমার মুখের দিকে ছেড়ে দিলেন। গন্ধটা ছিল অদ্ভুত—কাঁচা রসুন, পুরনো বই আর ধূপের মিশ্রণে একধরনের তীব্র ঘ্রাণ।
এক মুহূর্তে আমি দেখলাম, ঘরের এক কোণে যেন কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে—ছায়াময়, অস্পষ্ট, কিন্তু চোখদুটো লালচে... যেন আগুন।
আমি চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু কবিরাজ বললেন, “চোখ বন্ধ রাখ, মুখে বল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’!”
আমি তখন নিজেও পড়তে লাগলাম। কাঁপতে কাঁপতে। তারপর যেন একটা ধাক্কা লাগলো পেছন থেকে, আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
পরদিন সকালে, চোখ খুলে দেখি, আমি কবিরাজের ঘরের বারান্দায় মাদুরে শুয়ে। মা পাশে বসে আছে, চোখে জল। কবিরাজ ধীরে ধীরে এসে বললেন, “তুই বাঁচছিস, কিন্তু সাবধান। এরপর কখনো কারো অজানা ভুইয়ে দাঁড়িয়ে সাহসী হইস না। কারা কোথায় থাকে, সেইটা জানিস না।”
তিনি আমাকে একটা তাবিজ দিলেন, আর বললেন, “এইটা গলায় রাখিস। তোর ওপর নজর এখনও আছে। রাতে একা বাইরে যাইবি না।”
সেই দিনের পর থেকে আমি বদলে গেছি। আগে যেখানে সাহস দেখাতাম, এখন জায়গা বুঝে নত হই। জীবনে একবার যার চোখে অতল অন্ধকার পড়ে, সে আর সহজে আলো নিয়ে গর্ব করতে পারে না।
আমি তখনই বুঝলাম, সাহস দেখাতে গিয়ে জীবনের বড় ভুল করে ফেলেছিলাম। সেই দিনের পর আমি আর কোনোদিন একা মাঠে গরু চরাতে যাইনি। সেই ধইঞ্চার ভুইয়ের পাশ দিয়ে গেলেও বুকটা কেঁপে ওঠে।
ভয় না পাওয়া এক জিনিস, আর অকারণে সাহস দেখানো আরেক জিনিস। কারণ কেউ কেউ আছে, যাদের দেখা মাত্রই মানুষ বোঝে—এরা এই জগতের নয়। তারা চুপচাপ দেখছে, শুনছে... শুধু অপেক্ষায় থাকে, কে তাদের ডাক দিল, কে তাদের অপমান করল—আর তারপর ঘটে এমন কিছু যা মানুষের বুদ্ধির বাইরে।
_____________________________________________
_সমাপ্ত_
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন