গল্প-“রুটির স্বাদ”p
সকাল সাড়ে সাতটা। আকাশটা আজ মেঘলা। খয়েরি রঙের ধুলা মিশে শহরের বাতাসটা আরও একটু ধূসর হয়ে আছে। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে Dutch-Bangla Bank-এর বুথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মোবারক হোসেন।
সিকিউরিটি গার্ড, বয়স পঁইত্রিশ ছুঁই ছুঁই। মাথায় নীল টুপি, হাতে লাঠি। চোখে ঘুম নেই। তবে চোখে আছে শুকনো অবসাদ।
মোবারক গত পাঁচ বছর ধরে এখানে চাকরি করছে। ঠিক এই বুথেই। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে আসে, একটা নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ এই সময়ের ভিতরেও তার শরীর বদলেছে। বদলেছে মনের ভিতরকার অনুভূতিও। এক সময় সে ছিল মিশুক, হাসিখুশি। এখন সে চুপচাপ।
সে কথা বলে না, প্রয়োজন না হলে কারো দিকে তাকায়ও না।
মুখ শুকিয়ে যায় প্রচণ্ড, গলা যেন আগুনে পুড়ে গেছে – এ রকম অনুভূতি নিয়ে সে দিনে অন্তত দশবার পানি খায়। এক একবারে পুরো বোতল শেষ করে ফেলে।
অথচ জ্বর নেই, ঠান্ডা নেই, তবুও তৃষ্ণা এত!
মোবারকের পরিবার গ্রামে। নেত্রকোনায়। একটা খুপরি ঘর, মা আর একমাত্র ছোট ভাই সুমন। সুমন স্কুলে পড়ে, ক্লাস নাইনে।
মোবারক অনেক আগেই বুঝেছে—এ শহর শুধু বেঁচে থাকার জন্য, ভালোবাসার জন্য নয়।
আজকে সকালবেলা খেয়েছে—একটা রুটি আর তিনটে খেজুর। ওর খুব প্রিয় খেজুর, শুকনো খাবার।
মোবারক দুধ খেতে পারে না। গন্ধেই গা গুলিয়ে ওঠে। বুথের পাশের চায়ের দোকান থেকে যতবার চা খেয়েছে, বলে দিয়েছে—"দুধ ছাড়া লাল চা দিও ভাই।"
আকাশ আরও ভারি হয়ে এসেছে। হালকা ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে।
বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে ব্যাংকের সামনে জমে থাকা ধুলার উপর। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে কাঁচ। কেউ একজন এসে বলে, “ভাই, বুথ খোলা?”
মোবারক মাথা নাড়ে। কথা বলে না। মুখে একটা পাতলা হাসি ফুটে ওঠে—যেটা ঠিক হাসি না, আবার দুঃখও না।
শরীরটা সকাল থেকে কেমন করছে। ঘাড়টা হালকা টান লাগা, মনে হচ্ছে পেছন থেকে কেউ টেনে ধরছে।
কিছুক্ষণ আগে চেয়ারটা একটু টেনে বসতে চেয়েছিল, ব্যাস! কোমরের ডানপাশে এমন ব্যথা উঠেছে—সে এখন আর নড়াচড়া করতে পারছে না।
মোবারকের ব্যথা শুধু তখনই বাড়ে, যখন সে নড়ে চড়ে। দাঁড়িয়ে থাকলে, শুয়ে থাকলে সহনীয়।
কিন্তু যদি মাথা ঘোরায়, হাত তুলতে যায়, বা চেয়ারটা সরিয়ে একটু হেলান দেয়—ব্যথা যেন ছুরি চালিয়ে দেয় শরীরে।
ব্যথার কথা সে কারো সাথে বলে না। বুথে এসে কাজ করে, পান খায়, গুনগুন করে গানের সুরে শব্দ করে। কেউ বোঝে না, ভিতরে সে কতটা কষ্টে আছে।
আর একটা সমস্যা আছে—কোষ্ঠকাঠিন্য।
সপ্তাহে দু’দিন মলত্যাগ করতে পারে না। খুব চাপ দিয়ে হলেও শক্ত মল নামে না সহজে।
ওষুধ কিনে খাওয়ার পয়সা কোথায়? দোকানে গিয়ে শুধু চায়ে বিস্কুট চুবিয়ে খেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে হালকা গরম পানি খায়—এই যা।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি থেমে যায়। আকাশটা স্বচ্ছ নীল হয়ে আসে। সাদা সাদা মেঘের ফালি ফালি ভেলা, গাছের পাতাগুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে চকচক করছে।
মোবারক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে—গ্রামে এখন কেমন আবহাওয়া?
মা হয়তো পেছনের উঠোনে ধান শুকোচ্ছে। সুমন হয়তো বই নিয়ে বারান্দায় বসে আছে।
শহরের এই ধোঁয়াটে বিকেলে মোবারকের মনে হয়, কেউ যদি এসে বলে—“চলো বাড়ি যাই”, সে হয়তো এক মুহূর্তও দেরি করবে না।
কারণ, Bryonia-র মতো, মোবারক সবসময় “বাড়ি যেতে চায়”।
শহর, টাকা, বুথ, চাকরি—সব কেমন যান্ত্রিক লাগে তার কাছে। এক ফোঁটা সবুজ, এক টুকরো শান্তির জন্য মন ছটফট করে।
“ভাই, আপনি সব সময় এত চুপচাপ থাকেন কেন?” – এক নতুন ক্লায়েন্ট একদিন জিজ্ঞেস করল।
মোবারক তাকাল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।
সে জানে, নিজের যন্ত্রণার কথা কাউকে বললে কেউ বোঝে না।
বরং সে চুপ থাকলে — ব্যথাটাও চুপচাপ থাকে।
কিছুক্ষণ পর সে গেটের পাশে গিয়ে বসে। কাঁধটা একটু বাঁদিকে হেলিয়ে।
পকেট থেকে একটা পুরনো চেপ্টা রুটি বের করে খেতে থাকে। সাথে দুটো খেজুর।
মুখে পানি নেই, কিন্তু গলা শুকিয়ে কাঠ।
খাওয়ার মাঝেই একবারে আধা বোতল পানি শেষ করে দেয়।
ঠান্ডা পানি ছাড়া যেন প্রাণে শান্তি আসে না।
মাথা নিচু করে বসে আছে সে।
একটা চিল উড়ে যাচ্ছে আকাশে। রোদ এসে পড়েছে তার চোখে।
এমন সময় ফোনটা বেজে ওঠে। মা ফোন করেছে।
ওপাশ থেকে মা বলে,
– “কেমন আছো বাবা?”
– “ভালো।”
– “খেয়েছো?”
– “হ্যাঁ। খেজুর আর রুটি।”
– “বুকের ব্যথা কমেছে?”
– “একই আছে। চললেই বাড়ে।”
– “ওষুধ খাও না?”
– “টাকায় কুলায় মা?”
মা চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর বলে, “এইবার ঈদের সময় বাড়ি চলে এসো। তোকে ছাড়া উঠোনটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।”
মোবারক ফোন কানে ধরে রাখে কিছুক্ষণ।
তারপর ধীরে ধীরে বলে,
“এইবারে আসব মা... হয়তো শেষবারের মতো।”
আকাশটা আবার মেঘে ঢেকে যায়।
**গল্পে ব্যবহৃত Bryonia লক্ষণ (Symptoms Covered):
লক্ষণ গল্পে কোথায় আছে
1. মুখ শুকিয়ে যায়, তৃষ্ণা অনেক বেশি বারবার পানি খায়, গলা শুকিয়ে কাঠ
2. শরীর নাড়াচাড়া করলে ব্যথা বেড়ে যায় চেয়ার টানতেই কোমরে ব্যথা উঠে, slightest motion aggravates
3. চুপচাপ একা থাকতে চায়-কারো সাথে কথা বলে না, শান্ত পরিবেশ চায়
4. কোষ্ঠকাঠিন্য, শক্ত মল-সপ্তাহে দু’দিন মলত্যাগ করতে পারে না
5. খেজুর, শুকনো খাবার, রুটি পছন্দ; দুধ অপছন্দ-সকালের খাবার খেজুর ও রুটি; দুধ ছাড়া চা খায়
6. Slightest motion aggravates মোবারক চেয়ার নাড়ালেই ব্যথা বাড়ে, স্থির থাকলে সহনীয়
⚠️ কপির জন্য নয়।
অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হলে রিপোর্ট করা হবে।
Dr. Md Nurul Afsar(D.H.M.S)
Support and stay with me
#homeopathy
#homeopathytreatment
#homeopathicmedicine
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন