🔷 বাদশাহ জুলকারনাইনের ইতিহাস: (২য় পর্ব)
🔶রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা
ইমাম ইবনে জরীর তাবরী (র) হযরত ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, যখন মক্কা ভূমে রাসূলুল্লাহ (স) এর নবুয়তের বেশি বেশি আলোচনা হচ্ছিল। আর ইসলাম দিন দিন প্রসার লাভ করছিল। ইসলামের অগ্রগতি রোধ করতে মক্কার কুরাইশরা অক্ষম হয়ে পড়েছিল। তখন তারা ইসলামের জয়যাত্রা ব্যাহত করবার মানষে বিভিন্ন সুযোগের সন্ধান করেছিল। বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেও বার বার ব্যার্থতার গ্লানি টানতে হচ্ছিল। এমনই এক পরিস্থিতিতে তারা নয়র বিন হারিস এবং ওকবা বিন আবূ ময়িত নামক দুজন কুরাইশকে মদিনায় ইহুদীদের নিকট পাঠাল। কেননা, ইহুদীদের মধ্যে অনেকেই আলেম ছিল। তাদের প্রশ্ন ছিল ইহুদীরা তো পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থ তৌরাত ও ইঞ্জিলের আলেম। তারা এ নবী সম্পর্কে কি মতামত ব্যক্ত করে। ইহুদী আলেমরা তাদেরকে তিনটি প্রশ্ন শিখিয়ে দিল যে, তোমরা তোমরা নবুয়তের দাবীদার ব্যক্তিটিকে তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন কর। তিনি যদি এসব প্রশ্নের সদ উত্তর দিতে সক্ষম হন তবে যেনে রেখো, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবী বা রাসূল। আর যদি সদ উত্তরে অক্ষম হন, তবে যেনে রাখ যে, তাঁর এ দাবী মনগড়া। তিনি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল নন। প্রথম তাঁর কাছে কয়েকজন যুবক সম্পর্কে প্রশ্ন কর। অতি প্রাচীন কালে যাদেরকে নিজ শহর ত্যাগ করতে বাদ্য করা হয়েছিল। তাদের ঘটনা যেন তোমাদেরকে বর্ণনা করে শুনান। তাদের ঘটনা অতি বিস্ময়কর। দ্বিতীয় এমন এক ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে যিনি দুনিয়া হতে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত এমন কি সমগ্র দুনিয়া ভ্রমণ করেছিলেন। তৃতীয় রূহ কি? কুরাইশদের প্রতিনিধিদ্বয় মক্কায় ফিরে এসে কুরাশদেরকে বলল, আমরা এমন এক বিষয় নিয়ে এসেছি যা আমাদের বিতর্কিত সমস্যার সমাধান করে দিবে। অতঃপর ইহুদী আলেমদের কাছ থেকে তারা যে তিনটি প্রশ্ন শিখে এসেছে তা কুরাইশদের সামনে তুলে ধরল।
তারা পরামর্শ করে রাসূলুল্লাহ (স)-কে এ প্রশ্নগুলো করল। রাসূলুল্লাহ (স) তাদের প্রশ্নগুলো শুনে বলেন যে, আমি আগামীকল্য এ প্রশ্ন সমূহের উত্তর প্রদান করব। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) তখন 'ইনশাআল্লাহ্' বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবার হতে ঘরে ফিরল। রাসূলুল্লাহ (স) ওহীর অপেক্ষায় থাকলেন যেন ওহীর মাধ্যমে এ সকল প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়। কিন্তু পরের দিন পর্যন্ত কোন ওহী নাযিল হয়নি। শুধু তাই নয় বরং পনর দিন পর্যন্ত এ অবস্থায় কেটে গেল। হযরত জিবরাঈল (আ) ও আসেননি আর ওহীও নাযিল হয়নি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরের দিন যখন কোন উত্তর পেল না তখন কুরাইশরা হাসি তামাসা ও ঠাট্টা বিদ্রূপ শুরু করে দিল। এতে রাসূলুল্লাহ (স) খুব দুঃখ পেলেন। পনর দিন পর হযরত জিবরাঈল (আ) সুরায়ে কাহাফসহ অবতরণ করেন। অত্র সুরাতে ওহী বিলম্বের কারণও বর্ণনা করে দেয়া হল যে, ভবিষ্যতে যখন কোন কার্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করবেন তখন যেন ইনশাআল্লাহ্ বলে প্রতিশ্রুতি দেন। যেহেতু উল্লেখিত প্রতিশ্রুতি প্রদানের সময় তিনি (রাসূলুল্লাহ (স)) ইনশাআল্লাহ বলেননি তাই ওহী আসতে বিলম্ব হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ্
পাক ইরশাদ করেন- উচ্চারণ: অলা-তাকুলান্না লিশাইয়িন ইন্নী ফা-ই'লুন যা-লিকা গাদান। ইল্লা-আই ইয়াশা-আল্লা-হু
অর্থ: এবং আপনি কোন বিষয় সম্পর্কে এমন বলেন না যে, আমি আগামীকাল এটা করব। তবে আল্লাহ্ চাহে তো সাথে যোগ করে বলবেন।" (কাহাফ)
অত্র সূরাতে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে তা বর্ণিত হল-
🔶যুলকারনাইনের উত্থান
যুলকারনাইন এক আশ্চর্যজনক দিন্দ্বীজয়ী বীরের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তাঁর জন্মের পূর্বেই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শরু হয়েছিল। এমনকি তাঁর নানা সে ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা ছিল। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানীতে তিনি সে ষড়যন্ত্রের করাল ছোবল হতে এক বিশ্বয়কর উপায়ে রক্ষা পেয়েছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি 'বন-জঙ্গলে, পাহাড়-পর্ব্বতে লুকিয়ে লুকিয়ে জীবন রক্ষা করে ছিলেন। সেখানে থেকে নিজের জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলেন যে, দুনিয়ার এক অসাধারণ ব্যাক্তিত্বে পরিণত হন। পরে তিনি জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়েন। জনসাধারণ তার অনুপম চরিত্র ও স্বভাব এবং অসাধারণ ব্যক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তার সমর্থক হয়ে পড়ল। এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করল। সিংহাসনে আরোহনের পর থেকে তার বিজয়ের পালা শুরু হয়। একের পর এক দেশ জয় করা শুরু করেন। তাঁর দেশ জয় করার পিছনে উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণকে অত্যাচারী শাসক চক্রের অত্যাচার হতে মুক্তি দেয়া। কিন্তু তাঁর এ বিজয় অত্যাচারী ও দুর্ধর্ষ ব্যক্তিদের ন্যায় রক্তারক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়নি। বরং মানবতা ও উত্তম চরিত্রাবলীর প্রভাবে সম্পন্ন হয়েছিল।
কোরআনে যুলকারনাইনের এ বিস্ময়কর উত্থানের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন إِنَّا مُكَّنَّا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَأَتَيْنُهُ مِنْ كُلِّ شَيْ سَبيا .
(ইন্না মাক্কান্না লাহ্ ফিল আরদি অ আ-তাইনা-হু মিনকুল্লি শাইয়িন সাবাবা-) অর্থঃ "আমি তাকে দুনিযার বুকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিলাম এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়েছিলাম।"
আল্লাহ কাউকে উন্নতি ও সাফল্য দিতে চাইলে নিজের প্রতি সম্পর্কিত করেন আর এর দ্বারা তার উন্নতি ও সফলতাকে আল্লাহ্ পাকের বিশেষ অনুগ্রহ বলে বুঝানো হয়। যেমন আল্লাহ হযরত ইউসুফ (আ) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন- কাযা-লিকা মাক্কান্না লিইউসুফ। ফিল আরদ্বি) অর্থঃ "অনুরূপভাবে আমি ইউসুফকে দুনিয়ার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিলাম।"
এ সম্পর্কে পরে বিস্তারিত আলোচনা আসবে। অনুরূপভাবে প্রতিকূল অবস্থার ভিতর দিয়েও আল্লাহ যুলকারনাইনকে সমগ্র দুনিয়ার অধিপতি করেছিলেন। এমন কি আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত ভ্রমণ করার ও দেশজয় করার সর্ব প্রকার প্রয়োজনীয় সামগ্রী, জ্ঞান, বুদ্ধি এবং বিভিন্ন ভাষায় কথা বলার ক্ষমতা প্রদান করেছিলেন।
(৩য় পর্ব আসিতেছে ইনশাআল্লাহ)
(রেফারেন্স: কাসাসুল আম্বিয়া)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন