শিক্ষানীয় গল্প
আমাদের দেশে খুব কম স্বামীই আছেন যারা ওয়াইফের পিরিয়ডের সময় তাদের প্যাড পাল্টে দেওয়ার মতো মনোভাব পোষন করেন।
সিজারের ঘন্টা দুই কি তিন পর। একজন আয়া এসে সবাইকে বললেন,
'কেবিন থেকে বের হোন রোগীকে ফ্রেশ করতে হবে।'
আমি তখন যন্ত্রণায় কাতর। তা-ও জিজ্ঞেস করলাম,
'কী রকম ফ্রেশ?'
মহিলা বলল,
'প্যাড বদলাতে হবে।'
আমি অসহায় চোখে তাকিয়ে বললাম,
'আপনি চেইঞ্জ করবেন?'
'হ্যাঁ।'
আমি বেশ অস্বস্তি বললাম,
'আমি নিজে করে নিব। আপনি প্লিজ চলে যান।'
মহিলা শক্ত কণ্ঠে বলল,
'আপনি চেয়েও এখন নিজের পা-ও নাড়াতে পারবেন না। পাল্টাবেন কী করে? সিজারের পর তো আমিই আপনাকে চেইঞ্জ করে দিয়েছিলাম।'
'আমি সেটা দেখিনি। আপনি প্লিজ যান। আমি নিজে করে নিব। আমার শরীরে অন্য কেউ হাত দিলে রাগ লাগে। হোক সে মেয়ে মানুষ।'
মহিলা কিছু বলতে গেলে আজমীর সাহেব বললেন,
'আন্টি, আপনি যান। আমি দেখছি। ওর কোনো কাজ আপনাদের করতে হবে না। আমি আছি সারাক্ষণ ওর সাথে। ওর সব কাজ আমি করব।'
বোঝা গেল মহিলা বেশ বিরক্ত হয়ে চলে গেছিলেন আজমীর সাহেব দরজা বন্ধ করে বলল,
'এটা কীভাবে পাল্টায় বলে দাও। আমি পাল্টে দিচ্ছি।'
আমি প্রচণ্ড লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম,
'তুমি আমাকে ধরে দাঁড় করাও, ওয়াশরুমে নিয়ে চলো। বাকিটা আমি করে নিব।'
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বলল,
'চুপ করে শুয়ে থাকো।'
সে সময় আমাকে ফ্রেশ করিয়ে দেওয়ার পর ওকে কিছু বলতে পারিনি। লজ্জায় ওর দিকে তাকাতেই পারিনি। শুধু আস্তে করে বলেছিলাম,
'তোমার ঘৃণা লাগছে না?'
সে তার চিরাচরিত দুষ্টু মিষ্টি হাসি হাসল। সে সময় তাকে কিছু বলতে পারিনি। পরের দুই বারেও বলতে পারিনি। বিকালে আবার চেইঞ্জ করার পর বললাম,
'তোমার সত্যি ঘৃণা লাগে না?'
ভদ্রলোক আমার পাশে বসে মাথাটা আমার বুকে রেখে অনেকটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
'কতক্ষণ পর তোমাকে একা পেলাম। সারাক্ষণ তোমার আশেপাশে লোকজন মাছির মতো ভিনভিন করে। যেন তুমি আর আমার মেয়ে গরমের দিনের পাকা আম। তার জন্য এতো মাছি ভনভন করছে। এতো কেন দেখতে হবে? বউ আমার, বাচ্চা আমার অথচ আমি একটু একা তাদের পাচ্ছি না।'
আমি মৃদু হেসে বলেছিলাম,
'আমার প্রশ্নের জবাব কিন্তু পাইনি।'
ভদ্রলোক আমার গালে চুমু এঁকে বলেছিলেন,
'তুমি এতো বছরেও বুঝতে পারোনি, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি!'
আমি চুপ করে শুধু তার মাথায় হাত বুলাচ্ছিলাম। কিছু বলার মতো খুঁজে পাইনি। সুখের কান্নাগুলো চোখ বেয়ে নিচে পড়ার আগেই আমি আটকে দিয়েছিলাম। সে বলেছিল,
'তোমার এই যন্ত্রণার জন্য তো আমিই দায়ি।'
'কীভাবে?'
ফাজিল লোক দুষ্ট হেসে বলেছিলেন,
'মা তো আর একা একা হতে পারোনি। আমারও কন্ট্রিবিউশন আছে। জানো কতটা ভয়ে ছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল বাবা হতে চাওয়াটা ঠিক হয়নি। যদি তোমাকে হারিয়ে ফেলি! তোমরা মেয়েরা সত্যি অনবদ্য। একটা বাচ্চার জন্য নিজের জীবনটার কথাও ভাবো না। তোমার প্রতি আগে যা সম্মান ছিল, এখন আরও হাজার লক্ষগুণ তা বেড়ে গেছে।'
আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সেই পুড়ানো ডায়লগ বলেছিলা,
'তুমি কি সত্যি এতোটা ভালো? নাকি অভিনয় করছো এতগুলো বছর যাবত?'
সে হেসে বলেছিল,
'তুমি জানো না, আমি কতো বড়ো মাপের অভিনেতা।'
উক্ত লাইনটি আমি তাকে প্রায়ই বলি। কারণ সে কাজগুলোই এমন করে। বারবার ভাবি, একটা মানুষ সত্যি কী এতটা ভালো হতে পারে?
সেদিন সন্ধ্যার পর আমি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি। জীবন নিয়ে টানাটানি হয়েছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি ঐ মুহূর্তে আমার মাথায় দুটো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল,
'আমি না থাকলে এই পাগলাটা নিজেকে সামলাতে পারবে তো? আর ভাবছিলাম, আমার সদ্য জন্ম নেওয়া মেয়ের কথা।'
সেদিন তার পাগলামির গল্প না হয় আরেকদিন বলব।
আজমীর সাহেবকে যত জেনেছি, তত তার প্রতি মুগ্ধ হয়েছি, আকৃষ্ট হয়েছি। তত সম্মান, শ্রদ্ধা বেড়েছে তার প্রতি। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থণা আমার ভদ্রলোকটা সবসময় খুব ভালো থাকুক। আমার লেখায় পোস্টগুলো কখনো যদি ভুল হয় তাহলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন সবাই প্লিজ।
____________________সমাপ্ত______________________